ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

আসছে হাইপারসনিক ব্রাহ্মস-২

আন্তর্জাতিক ডেস্ক


প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:০৪ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৬ বার


আসছে হাইপারসনিক ব্রাহ্মস-২

ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্রাহ্মসের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন করে উন্নয়নকাজ শুরু হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রটির গতি, পাল্লা ও কার্যকারিতা উন্নত করার পাশাপাশি ছোট আকারের বিমানবাহিত সংস্করণ এবং হাইপারসনিক প্রযুক্তিনির্ভর নতুন সংস্করণ তৈরির পরিকল্পনা করছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ব্রাহ্মস অ্যারোস্পেস।

একই সঙ্গে সম্ভাব্য দীর্ঘপাল্লার সংস্করণ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি চাহিদা মেটাতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

 

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জয়তীর্থ যোশির ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যমান ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা ও পরিচালনাগত সক্ষমতা উন্নত করার পাশাপাশি নতুন সংস্করণ তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভারতের স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীতে ব্রাহ্মসের ব্যবহার আরও বিস্তৃত হতে পারে। পাশাপাশি বিদেশে ক্ষেপণাস্ত্রটির বাজার সম্প্রসারণের সুযোগও বাড়বে।

 

ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও) এবং রাশিয়ার এনপিও মাশিনোস্ত্রোইয়েনিয়ার যৌথ উদ্যোগ ব্রাহ্মস অ্যারোস্পেস। ভারতের ব্রহ্মপুত্র ও রাশিয়ার মস্কভা নদীর নামের সমন্বয়ে ক্ষেপণাস্ত্রটির নাম রাখা হয়েছে ব্রাহ্মস।

স্থলভিত্তিক ব্যবস্থা, যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য বিভিন্ন সংস্করণ রয়েছে এর।

 

গত বছর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক সংঘাতের সময় ব্রাহ্মসের ব্যবহার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। জম্মু ও কাশ্মীরে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার পর দুই দেশের উত্তেজনা বাড়ে। পরবর্তী সময়ে ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে সামরিক অভিযান চালায়।

ভারতের দাবি, ওই অভিযানে ব্রাহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানা হয়েছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসব স্থাপনার মধ্যে এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের জন্য ব্যবহৃত হ্যাঙ্গারের কথাও উল্লেখ করা হয়। ভারত আরও দাবি করে, পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্রাহ্মসের কোনো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে পারেনি। তবে এসব দাবির সবকটির স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়।

সংঘাতের পর ব্রাহ্মসের কার্যকারিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আগ্রহ বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা। কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রটি কেনার চুক্তি করেছে। অন্যদিকে আরও কয়েকটি দেশ এর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও ক্রয়ের সম্ভাবনা যাচাই করছে। তবে সামরিক সংঘাতে ব্যবহারের দাবি এবং রফতানি বাজারে আগ্রহ বৃদ্ধির মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

ব্রাহ্মসের প্রচলিত সংস্করণ শব্দের গতির প্রায় তিন গুণ বেগে চলতে পারে। প্রাথমিক সংস্করণটির পাল্লা ছিল প্রায় ২৯০ কিলোমিটার। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন উন্নয়নের মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা ও উৎক্ষেপণ সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। এতে ২০০ থেকে ৩০০ কেজি ওজনের ওয়ারহেড বহনের সক্ষমতা রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্রাহ্মস-এ সংস্করণটি সুখোই-৩০এমকেআই যুদ্ধবিমানে ব্যবহার করা যায়। ২০২৩ সালে ভারতীয় বিমানবাহিনী এ সংস্করণের প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার পাল্লার একটি সংস্করণের সফল পরীক্ষার কথা জানায়। এর ফলে যুদ্ধবিমানকে লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি না নিয়েও দূর থেকে আঘাত হানার সুযোগ তৈরি হয়।

ব্রাহ্মসের কিছু স্থল-আক্রমণ সংস্করণ নিচু দিয়ে উড়ে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যেতে পারে। এতে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পক্ষে ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও প্রতিহত করা কঠিন হতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করে ক্ষেপণাস্ত্রের সংস্করণ, উড্ডয়নপথ এবং প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর।

ব্রাহ্মস অ্যারোস্পেসের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর একটি হলো ব্রাহ্মস-এনজি। মূল ব্রাহ্মসের তুলনায় ছোট ও হালকা করে এই সংস্করণ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে আরও বেশি ধরনের যুদ্ধবিমানে ক্ষেপণাস্ত্রটি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বর্তমানে বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্রাহ্মস ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুখোই-৩০এমকেআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে ব্রাহ্মস-এনজি তৈরি হলে ভারতের দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত তেজসসহ অন্যান্য যুদ্ধবিমানে এটি ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, সুখোই-৩০এমকেআই যুদ্ধবিমান একসঙ্গে তিনটি ব্রাহ্মস-এনজি বহন করতে পারবে। এতে একটি বিমান থেকে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে। তবে এ সক্ষমতা চূড়ান্ত নকশা, পরীক্ষার ফল এবং বিমানটির সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করবে।

ব্রাহ্মস-এনজিতে দেশীয়ভাবে তৈরি যন্ত্রাংশের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য, ২০২৭-২৮ সালের মধ্যে এ সংস্করণের প্রোটোটাইপ উন্মোচন করা। প্রকল্পটি সফল হলে ভারতের সামরিক বাহিনীতে ব্রাহ্মসের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের অংশগ্রহণও সম্প্রসারিত হতে পারে।

ব্রাহ্মসের সক্ষমতা বাড়ানোর আরেকটি পরিকল্পনা হলো দীর্ঘপাল্লার সংস্করণ তৈরি। এ সংস্করণের সম্ভাব্য পাল্লা সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাস্তবায়িত হলে এটি প্রাথমিক সংস্করণের ২৯০ কিলোমিটার পাল্লার তুলনায় বড় ধরনের পরিবর্তন হবে।

তবে দীর্ঘপাল্লার এই সংস্করণ এখনো পরিকল্পনা ও আলোচনা পর্যায়ে রয়েছে। এ বিষয়ে রুশ অংশীদারের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন জয়তীর্থ যোশি। প্রকল্পটির নকশা, উন্নয়ন ও পরীক্ষার নির্দিষ্ট সময়সূচি কিংবা সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্তির সময় এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।

দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি হলে ভারতের দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়তে পারে। তবে এ ধরনের প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ, ব্যয়, পরীক্ষা এবং দুই দেশের যৌথ উদ্যোগের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

ব্রাহ্মস অ্যারোস্পেসের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উদ্যোগ, যার সম্ভাব্য নাম ব্রাহ্মস-২। লক্ষ্য হলো এমন একটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা, যা শব্দের গতির পাঁচ গুণ বা তারও বেশি গতিতে চলতে সক্ষম হবে।

প্রকল্পটির সঙ্গে স্ক্র্যামজেট প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এ ধরনের ইঞ্জিন বায়ুমণ্ডল থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে জ্বালানি পোড়ায়। তবে হাইপারসনিক গতিতে চলার সময় প্রচণ্ড তাপ, কাঠামোগত স্থায়িত্ব এবং দীর্ঘ সময় উড্ডয়ন বজায় রাখার মতো জটিল প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়।

ব্রাহ্মস-২ এখনো উন্নয়ন-পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। এর চূড়ান্ত নকশা, পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ এবং সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্তির সময় সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে প্রকল্পটি কবে বাস্তব রূপ পাবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।

ব্রাহ্মসের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের অন্যতম উদাহরণ ফিলিপাইন। ২০২২ সালে দেশটি প্রায় ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের চুক্তি করে। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের এপ্রিলে প্রথম এবং ২০২৫ সালের এপ্রিলে দ্বিতীয় চালান সরবরাহ করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চলতি বছরের জুনে ভিয়েতনামের সঙ্গে ব্রাহ্মস সরবরাহের চুক্তির বিষয়টি ভারত নিশ্চিত করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়াও ক্ষেপণাস্ত্রটি সংগ্রহের বিষয়ে অগ্রসর হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, মিসর, চিলি ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ আরও কয়েকটি দেশের আগ্রহের কথাও সামনে এসেছে।

তবে সম্ভাব্য ক্রেতার আগ্রহ, প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন এবং চূড়ান্ত ক্রয়চুক্তি এক বিষয় নয়। আগ্রহী সব দেশ যে শেষ পর্যন্ত ক্ষেপণাস্ত্রটি কিনবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। রফতানি চুক্তির বাস্তবায়নও নির্ভর করবে অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত চাহিদা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অনুমোদনের ওপর।

দেশীয় চাহিদা পূরণ ও বিদেশি ক্রয়াদেশ সামলাতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে ব্রাহ্মস অ্যারোস্পেস। ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে এ প্রকল্পকে যৌথ প্রযুক্তি উন্নয়ন ও অস্ত্র রফতানি সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন কার্যক্রম ভারতের হায়দরাবাদ, নাগপুর, পিলানি ও লক্ষ্ণৌসহ বিভিন্ন স্থানে পরিচালিত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

বর্তমানে কিছু যন্ত্রাংশ ও উপব্যবস্থার জন্য সীমিতসংখ্যক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা রয়েছে। এই নির্ভরতা কমাতে এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস করতে সর্বোচ্চ ৪৫টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।

প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানি থেকে উৎপাদন ও রফতানি বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে ভারত। দেশটির লক্ষ্য, দেশীয় প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরে ভারতের প্রতিরক্ষা রফতানি আগের বছরের তুলনায় ৬৭ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৯ সালের মধ্যে বার্ষিক প্রতিরক্ষা উৎপাদন ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রফতানি থেকে ৫৫০ কোটি ডলার আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ লক্ষ্য অর্জনে ব্রাহ্মস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে নতুন সংস্করণগুলোর উন্নয়ন, পরীক্ষার ফল, উৎপাদন সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ বাস্তবায়নের ওপরই প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ সাফল্য নির্ভর করবে।

সব মিলিয়ে, ব্রাহ্মসের উন্নয়ন পরিকল্পনা ভারতের সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা রফতানি বাড়ানোর বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। তবে ব্রাহ্মস-এনজি, দীর্ঘপাল্লার সংস্করণ ও হাইপারসনিক ব্রাহ্মস-২—প্রতিটি প্রকল্পেরই বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। পরিকল্পনা ও ঘোষণাকে বাস্তব সক্ষমতা হিসেবে বিবেচনা করার আগে পরীক্ষার ফল ও আনুষ্ঠানিক অগ্রগতির তথ্যের অপেক্ষা করতে হবে।


   আরও সংবাদ