ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২০ মার্চ, ২০২৬ ২০:৪০ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩৮ বার
পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি যখন চাঙ্গা হওয়ার কথা, ঠিক সেই সময় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ঈদকে ঘিরে গ্রামীণ অর্থনীতির যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়, তা অনেকাংশেই প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল। এর প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। ফলে এবারের ঈদে গ্রামবাংলার অর্থনীতি কিছুটা শ্লথ হয়ে পড়েছে।
দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যদি যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকি, কর্মসংস্থান কমে যাওয়া ও স্থানীয় ব্যবসার স্থবিরতা দেখা দেবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
সময়োপযোগী নীতি সহায়তা ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর হতে পারে।
এজন্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় রেমিট্যান্স প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে তেল ও গ্যাস উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বাংলাদেশে আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি করবে।
এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, চাহিদা কমে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ার এই দ্বৈত চাপ ‘স্ট্যাগফ্লেশন’-এর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
জানা গেছে, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক কর্মী সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত। প্রতি বছর ঈদকে ঘিরে তারা দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠান, যা গ্রামীণ বাজারে কেনাকাটা, নির্মাণকাজ, কৃষি বিনিয়োগ ও ছোট ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি সঞ্চার করে। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অনেক প্রবাসী কর্মীর আয় কমে যাওয়া, কর্মঘণ্টা হ্রাস কিংবা চাকরি অনিশ্চয়তায় পড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে গ্রামের বাজারগুলোতে।
বিশেষ করে তেল ও গ্যাস খাতে উৎপাদন কমে আসা, শিল্পাঞ্চলে হামলা এবং পরিবহন ও বিমান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় প্রবাসী কর্মীদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেকেই নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন, আবার যারা কর্মরত আছেন তাদের অনেকেরই নিয়মিত কাজ ও আয় ব্যাহত হচ্ছে। নতুন করে যারা বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তাদের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে—কবে তারা কাজে যোগ দিতে পারবেন, তা স্পষ্ট নয়।
এছাড়া গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় অংশ কৃষিনির্ভর। ঈদের সময় প্রবাসী আয় দিয়ে কৃষকরা বীজ, সার, যন্ত্রপাতি কেনেন বা জমিতে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু রেমিট্যান্স কমে যাওয়ায় এই বিনিয়োগও কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও হস্তশিল্প খাতেও প্রভাব পড়ছে। অনেকেই ঈদকে সামনে রেখে উৎপাদন বাড়ালেও চাহিদা কমে যাওয়ায় তারা লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন।
গ্রামের ঈদের বাজারে মন্দাভাব
ঈদকে কেন্দ্র করে গ্রামে সাধারণত পোশাক, খাদ্যপণ্য, মসলা, গবাদিপশু এবং ইলেকট্রনিক পণ্যের বিক্রি বেড়ে যায়। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন। অনেক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, ক্রেতাদের আগ্রহ কমে গেছে এবং কেনাকাটায় সতর্কতা বেড়েছে।
কেরানীগঞ্জের কলাতিয়া বাজারের হিরু ফ্যাশনের ম্যানেজার মো. মনির হোসেন বাংলানিউজকে জানান, আগে ঈদের দুই-তিন সপ্তাহ আগে থেকেই দোকানে ভিড় থাকত। কিন্তু এবার বিক্রি আশানুরূপ নয়। অনেক প্রবাসীর পরিবার, যারা আগে আত্মীয়স্বজনদের জন্য কেনাকাটা করত, এবছর শুধু নিজেদের জন্য কিনেছে। যুদ্ধের কারণে এবছর তারা কম টাকা পাঠিয়েছে, তাই অন্যদের জন্য কিছু নিতে পারেনি।
টঙ্গীবাড়ি থানাধীন বালিগাঁও বাজারের এক কাপড়ের দোকানে কাজ করেন দ্বীন ইসলাম। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, এবছর বেচাকেনা অনেক কম। মানুষের হাতে টাকা নেই। আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের মূল আয় হয় প্রবাসীদের পাঠানো টাকায়। সেখানে যুদ্ধের প্রভাবে অনেকেই কম টাকা পাঠিয়েছে। এজন্য তাদের পরিবার-পরিজনও কেনাকাটা কম করেছে। কেননা আয় বুঝে ব্যয় করতে হবে।
প্রবাসীদের পরিবারগুলোর ব্যয় সংকোচন
প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো এবার ব্যয় কমানোর পথে হাঁটছে। ঈদের নতুন পোশাক, ঘর মেরামত বা বড় কেনাকাটা—সবকিছুতেই কাটছাঁট দেখা যাচ্ছে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতির স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত হচ্ছে।
এ বিষয়ে সিরাজদিখান থানার ভাটিমভোগ গ্রামের শিল্পী আক্তার বাংলানিউজকে বলেন, তার স্বামী দীর্ঘ ১০ বছর ধরে সৌদি আরবে থাকেন। এবছর ঈদের সময় বাড়ি আসার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধের কারণে আসতে পারেননি। সেখানে কাজে সমস্যা হচ্ছে, বলেছে যুদ্ধ চলতে থাকলে চাকরি নাও থাকতে পারে। এজন্য এবার ঈদে কম টাকা পাঠিয়েছে। সেটা দিয়ে বাচ্চাদেরই কিনে দিয়েছেন, বড়দের জন্য কিছু কেনা হয়নি। এখন অনেক হিসেব করে চলতে হবে।
টঙ্গীবাড়ি থানার সোনারং গ্রামের সুমাইয়া বেগম বাংলানিউজকে বলেন, এবছর বাড়ির বড়দের জন্য কিছু কেনা হয়নি। শুধু তার ছেলের জন্য একটি পোশাক কিনেছেন। কারণ তার স্বামী মালয়েশিয়ায় থাকেন; যুদ্ধের কারণে তাদের কাজ কমে গেছে। সামনে কয়েক মাস কম টাকা পাঠাতে পারবেন বলে জানিয়েছেন। আগে মাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পাঠাতেন। এবার ৪০ হাজার টাকা পাঠিয়ে বলেছেন, এ থেকেই ঈদের কেনাকাটা ও সংসার খরচ চালাতে হবে।
দুবাইয়ে গত ২০ বছর ধরে একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন মো. আব্দুল রহিম শেখ। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ‘ভালো নেই। প্রতিদিনই মিসাইলের শব্দ শুনি। মোবাইলে সতর্কতামূলক বার্তা আসে। খরচ কমানো, নিরাপদে থাকা, এসব বলা হয়। ভয় নিয়ে কাজ করি। যুদ্ধ না থামলে কয়েক মাস পর কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তখন কী করব জানি না। তাই পরিবারে কম টাকা পাঠিয়ে কিছু নিজের কাছে রাখছি, যেন চাকরি চলে গেলে কিছুদিন চলতে পারি।’
সৌদি আরবের একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করেন সিরাজদিখান থানার ভাটিমভোগের মো. শরিফ হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘আতঙ্কে থাকি, পরিবারকে বলতে পারি না। মালিক বলেছে, কাঁচামাল না পেলে কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অনেক কষ্ট করে ঋণ নিয়ে বিদেশে এসেছি। বেতন থেকে নিজের খরচ রেখে সব টাকা বাড়িতে পাঠাই। ভাবছিলাম ঈদে দেশে যাব, কিন্তু এখন গেলে যদি আর ফিরতে না পারি—সে ভয় আছে। তাই যাইনি। পরিবারকে বলেছি হিসেব করে খরচ করতে, এই ঈদে নতুন কাপড় না নিতে, পরের ঈদে নেবে।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিস)-এর গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বাংলানিউজকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে অর্থনীতি ও বিনিয়োগে ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ায় সেই আশায় বড় ধাক্কা লেগেছে। বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা এবং সংঘাতের বিস্তৃতি পুরো অঞ্চলে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, যার প্রভাব বাংলাদেশের রেমিট্যান্স ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে পড়ছে।
তিনি বলেন, রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধাক্কার আশঙ্কা রয়েছে। মার্চ মাসে যেখানে আড়াই বিলিয়ন ডলার আসার প্রত্যাশা ছিল, তা নেমে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে গ্রামীণ অর্থনীতি।
ড. মাহফুজ কবির আরও বলেন, প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল লক্ষ লক্ষ পরিবার ইতোমধ্যে উদ্বেগে রয়েছে। তাদের দৈনন্দিন খরচ, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় এবং ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ফলে গ্রামে ভোগব্যয় কমে গিয়ে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে। এছাড়া অনেক প্রবাসী শ্রমিক ঋণ নিয়ে বিদেশে গেছেন বা যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। যুদ্ধের কারণে তারা চাকরি হারালে বা যেতে না পারলে ঋণের বোঝা তাদের পরিবারের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়াবে। এতে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের সক্রিয় উদ্যোগ জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি রোধে সিন্ডিকেট ভাঙা, হুন্ডির পরিবর্তে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহ দেওয়া এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণোদনা জোরদার করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে প্রবাসীনির্ভর পরিবারগুলোর জন্য স্বল্পমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে জরুরি সহায়তা দিলে সংকট কিছুটা লাঘব করা সম্ভব।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, মার্চ মাসের প্রথম ১৪ দিনে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ২ দশমিক ২০ বিলিয়ন (২২০ কোটি) মার্কিন ডলার, যা বর্তমান বিনিময় হারে (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা) প্রায় ২৭ হাজার ১২১ কোটি টাকা। গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩ দশমিক ০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশে প্রতি বছর প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার কোটি থেকে এক লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজার তৈরি হয়।