ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:১৩ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৪ বার
প্রায় প্রতিদিনই অমানবিক নির্যাতন ও লাঞ্ছনার শিকার হয়ে প্রবাসী নারীদের কেউ না কেউ দেশে ফিরছেন। তারপরও থেমে নেই নারীদের অনিরাপদ বিদেশযাত্রা।
এমনকি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নেই—এমন ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে পাঠানো হচ্ছে নারী শ্রমিক। দালালদের ফাঁদে পড়ে সব হারাচ্ছেন অনেকে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ মাসে ৪৭টি দেশে নারী শ্রমিক গেছেন প্রায় ২৬ হাজার। এর মধ্যে সৌদি আরবে ১৭ হাজারের বেশি, জর্ডানে সাড়ে ৬ হাজারের বেশি, কাতারে ৬০০ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২৫০ জনের বেশি, জাপানে ১৫৫ এবং ইতালিতে গেছেন অন্তত ১৫০ জন নারী গেছেন।
এ ছাড়া সিঙ্গাপুরে অন্তত ৭৭ জন, সাইপ্রাসে ৭৬ জন, মরিশাসে ৩৯ জন, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৩৭ জন, গ্রিসে ৩৫ জন, পর্তুগালে ৩২ জন, লাওসে ২০ জন, মাল্টায় ২০ জন, ইরাকে ১৩ জন, লেবাননে ১৩ জন, মেসিডোনিয়ায় ১০ জন, রোমানিয়ায় ১০ জন, কেনিয়ায় ১০ জন, যুক্তরাজ্যে ৯ জন, ম্যাকাওয়ে ৯ জন, ভিয়েতনামে ৮ জন, রাশিয়ায় ৮ জন এবং সার্বিয়া ও মঙ্গোলিয়ায় ৭ জন নারী গেছেন কাজের জন্য। মলদোভা, ফিজি, চীন ও কুয়েতে ৫ জন করে; ব্রুনাই ও মালয়েশিয়ায় ৪ জন করে; স্লোভেনিয়া, বেলারুশ, সেশেলস ও বুলগেরিয়ায় ৩ জন করে; পোল্যান্ড, ব্রাজিল ও ওমানে ২ জন করে এবং অস্ট্রেলিয়া, আয়ারল্যান্ড, কম্বোডিয়া, টোঙ্গা, বাহামাস ও নিউজিল্যান্ডে অন্তত ১ জন করে নারী শ্রমিক গেছেন।
গত বছরের একই সময়ে বিদেশে গিয়েছিলেন ২৩ হাজার ৯৩৬ জন নারী শ্রমিক। এর মধ্যে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন ১৬ হাজার ৬৩২ জন, জর্ডানে ৪ হাজার ৬৯৪ জন, কাতারে ১ হাজার ৪৭ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪৪৭ জন ও কুয়েতে ১৭৪ জনসহ মোট ৫০টি দেশে এসব নারী অভিবাসী গিয়েছিলেন।
বিদেশ যাওয়া এসব নারীদের মধ্যে বড় একটি অংশ বাংলাদেশ থেকে অপ্রচলিত ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, ভাষাশিক্ষা ছাড়া বিদেশ যাচ্ছেন। এ ছাড়া দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নেই এমন দেশগুলোতেও যাচ্ছেন অনেক নারী শ্রমিক।
পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, ভাষাশিক্ষা ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ছাড়া নারী শ্রমিকদের বিদেশযাত্রায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, আনুষ্ঠানিক বাজার ছাড়া অন্য দেশগুলোতে কর্মী পাঠানোর ঘটনা ব্যক্তি উদ্যোগ বা ফড়িয়াদের প্রভাবে ঘটছে, যা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বায়রা মহাসচিব বলেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ প্রচলিত বাজারগুলোতে বর্তমানে পুরুষ শ্রমিকের চাহিদা কমলেও নারী গৃহকর্মীদের একটি অংশ দুবাই, ওমান ও সৌদি আরবে কাজ পাচ্ছেন। তবে চুক্তিহীন বা অপ্রচলিত নতুন দেশগুলোতে নারী শ্রমিক পাঠানোর বিষয়টি মোটেই সাধারণ বাণিজ্য ব্যবস্থার অংশ নয়।
তিনি বলেন, রাশিয়া, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, টোঙ্গা বা বাহামাসের মতো দেশগুলোতে নারী গৃহকর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য যাচাই ও আইনি কাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। রাশিয়ার মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ বা ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো নিজস্ব শ্রম উদ্বৃত্ত থাকা দেশে বাংলাদেশি নারীরা কী কাজ করবেন—এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এসব দেশে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যোগাযোগের দক্ষতা বা ভাষার প্রশিক্ষণ তাদের আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত।
আলী হায়দার চৌধুরী জানান, সৌদি আরব, জর্ডান এবং হংকংয়ের মতো যেসব দেশে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে, কেবল সেখানেই বায়রা বা অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মী পাঠাতে পারে। অন্য অপ্রচলিত দেশগুলোতে কর্মী যাওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের ফাঁদে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র কীভাবে এসব ক্ষেত্রে বহির্গমন ছাড়পত্র (ম্যানপাওয়ার ক্লিয়ারেন্স) দিচ্ছে বা নথিপত্র অনুমোদন করছে, তা স্পষ্ট নয়।
অনানুষ্ঠানিক বাজারে অনিয়ন্ত্রিতভাবে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ এবং প্রবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারকে নীতিমালা ও সঠিক তদারকি ব্যবস্থা জোরালো করার আহ্বান জানান বায়রা মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন) শরিফুল ইসলাম হাসান বাংলানিউজকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কাজের কথা বলে নারী শ্রমিকদের বিদেশে নিয়ে পাচার কিংবা অনৈতিক কাজে যুক্ত করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে যেসব অপ্রচলিত দেশে আমাদের পুরুষ শ্রমিক নেই, অথচ নারী শ্রমিক পাঠানো হচ্ছে—সেসব বিষয়ে সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। এমনকি প্রেমের কিংবা বিয়ের ফাঁদে ফেলে বিদেশ নেওয়ার মতো বিষয়গুলোতেও আমাদের বাড়তি সচেতনতা ও সতর্কতা বজায় রাখা জরুরি।