ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:৩৯ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৫ বার
দেশের তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিল বিএনপি সরকার। এটা সরকারের একটি সাহসী সিদ্ধান্ত।
গত সোমবার বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম পে-স্কেল অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। সেখানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১০০ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়িয়ে দুই অর্থবছরে তিন ধাপে এই পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সরকারি চাকরিতে আগের মতোই ২০টি গ্রেড থাকছে। সর্বনিম্ন স্তর ২০তম গ্রেডের মূল বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে।
অর্থাৎ এই গ্রেডে ১৪২ শতাংশ বেতন বাড়ানো হয়েছে।
এই গ্রেড ধরা হয়েছে ২০,০০০-৪৮৪০০ টাকা পর্যন্ত।
অর্থাৎ যিনি এই গ্রেডে সরকারি চাকরিতে যোগদান করবেন তার মূল বেতন হবে ২০ হাজার টাকা। পরে তা ধাপে ধাপে বৃদ্ধি পেয়ে সর্বোচ্চ ৪৮,৪০০ টাকা হতে পারে। আর সরকারি চাকরির সর্বোচ্চ স্তর প্রথম গ্রেডের বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা (সর্বোচ্চ নির্ধারিত) হয়েছে। এই বেতন কাঠামোর সঙ্গে মিল রেখে বিচার বিভাগের জন্য ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্য আলাদা বেতন কাঠামোর অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। নবম পে-স্কেল বা নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
এর মধ্যে ৪৪ হাজার কোটি টাকা চলতি অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পে-স্কেল নিয়ে সরকারি এই ঘোষণার পর দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়া অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিসহ নানা ধরনের প্রভাবের আশঙ্কা করছেন অনেকে। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী এই পে-স্কেল চলতি বছরের পয়লা জুলাই থেকেই কার্যকর হওয়ার কথা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানিসংকটে উৎপাদন খাতে স্থবিরতার পাশাপাশি রাজস্ব আহরণে দুর্বলতার কারণে অভ্যন্তরীণ আয় সংগ্রহে দুর্বলতার মধ্যেই সরকার চাকরিজীবীদের সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ বেতন বাড়িয়ে নবম জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে।
এর ফলে সরকারের ব্যাংক থেকে ঋণ বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ার পাশাপাশি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি কাটছাঁট করতে হতে পারে। পাশাপাশি চাপের মুখে পড়বে বেসরকারি খাতের মানুষ। পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি, বাজেটের ওপর চাপ কমানো, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ সামলিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য আনতে সরকার এই নবম পে-স্কেল দুই বছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী এক বছরে পে-স্কেল যেভাবে বাস্তবায়নের কথা বলেছে সেটি বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকে ব্যাংক থেকে আরও বেশি ঋণ নিতে হতে পারে এবং একই সঙ্গে এমনিতেই সংকটের কারণে কম আসা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি আরও কাটছাঁট করতে হতে পারে।
সরকার এই বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যে। ধারণা করা যায়, সরকার আশা করছে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে সরকারি কর্মচারীদের কাজের উদ্যম বাড়বে, তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়বে। এর ফলে রাষ্ট্রের সার্বিক উৎপাদনশীলতা বাড়বে। এই বেতন বৃদ্ধি প্রশাসনে জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করবে। এতে সরকারি সেবা লাভে স্বচ্ছতা আসবে। নাগরিক হয়রানি কমবে এবং সার্বিকভাবে দেশের উন্নয়নের গতি বাড়বে।
বিভিন্ন দেশের সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির ফলে দুই ধরনের প্রভাব দেখা গেছে। সরকারি চাকুরেদের বেতন বৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে ইতিবাচক ফলাফল এসেছে ভুটান এবং নেপালে। গবেষণায় দেখা গেছে, বেতন বৃদ্ধির কারণে এই দুটি দেশের সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে ঘুষ গ্রহণ এবং দুর্নীতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। টিআইয়ের দুর্নীতির সুচকে ভুটানের দারুণ উন্নতির অন্যতম কারণ হলো সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি।
ভারতেও সরকারি কর্মচারীদের অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের হার হ্রাস পেয়েছে। ভারতে ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি সপ্তম পে কমিশনে মূল বেতন বড় আকারে বৃদ্ধি করা হয়েছিল। গবেষণায় দেখা গেছে, এই বেতন বৃদ্ধির ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে সরকারি কাজে। ভারতে সরকারি কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও তাদের দুর্নীতি কমানোর লক্ষ্যে প্রতি বছর দুবার (সাধারণত জানুয়ারি ও জুলাই মাসে) মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি কর্মচারীদের ডিএ (DA) বৃদ্ধি করা হয়। প্রতি বছর নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৩% হারে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়।
সরকারি কর্মচারীদের ওপর পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে ভারতে অষ্টম পে কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, যা ২০২৩ সালের ৩ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়েছে। এই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর ধরা হবে। তবে এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন ২০২৭ সালের মে মাসের দিকে জমা পড়ার কথা রয়েছে। ফলে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হতে কিছুটা সময় লাগলেও কর্মচারীরা ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকেই বকেয়া বা এরিয়ার্সসহ বর্ধিত বেতন পাবেন। ভারতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি করার সঙ্গে তাদের দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহিতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির পরও কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি পাকিস্তানে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যাপক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে থাকা পাকিস্তানে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। সরকারি চাকরিজীবদের মধ্যে যারা ১ থেকে ১৬তম গ্রেডের অন্তর্ভুক্ত- তাদের বেতন বাড়ে ৩৫ শতাংশ এবং যেসব চাকরিজীবীর গ্রেড ১৭-এর ওপরে- তাদের বেতন বাড়ে ৩০ শতাংশ। ২০২৩ সাল থেকে পাকিস্তানে ন্যূনতম সরকারি বেতন ৩২ হাজার রুপি করা হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানে সরকারি কর্মচারীদের এই বেতন বৃদ্ধির কোনো ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়নি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির সূচকে পাকিস্তানের অবস্থান ১৩৬। টিআইয়ের গবেষণায় বলা হয়েছে, উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে পাকিস্তানের অর্থনীতি মুখ থুবডে পড়েছে।
তাই বেতন বৃদ্ধি হলেই যে সরকারি কর্মচারীদের দক্ষতা, দায়বদ্ধতা এবং জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্বশীল আচরণ নির্ভর করে কীভাবে তাদের পরিচালিত করা হয় তার ওপর। বিগত ১৫ বছর সরকারি কর্মচারীদের নানারকম সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিনা সুদে গাড়ি, গাড়ি পরিচালনা ব্যয়, বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ বৃদ্ধি, পদোন্নতির মাধ্যমে বেতন বৃদ্ধি ইত্যাদি নানা সুযোগসুবিধা প্রদানের পরও সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতি কমেনি। বরং আইন করে তাদের দুর্নীতির তদন্তের পথও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমলাদের এত সুযোগসুবিধা দেওয়ার পরও নাগরিকদের হয়রানি কমেনি। সরকারি সেবা লাভের জন্য সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বরং বেড়েছে। তার প্রধান কারণ হলো, তৎকালীন সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আমলাদের ওপর নির্ভর করেছিল। ফলে আমলারা জনগণের সেবক নয়, প্রভু হয়ে গিয়েছিলেন। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে মুদ্রাস্ফীতির কারণে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি অবশ্যই যৌক্তিক। কিন্তু আমলারা যেন সিন্দাবাদের ভূতের মতো সরকারের ঘাড়ে সাওয়ার না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সরকারের সাফল্যের জন্য যেমন আমলাদের প্রয়োজন তেমনি তাদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সরকারকেই ব্যর্থ করতে পারে। তাই বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অবশ্যই যৌক্তিক। কিন্তু এর সঙ্গে আমলাদের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তাহলেই বেতন বৃদ্ধি জনগণের জন্য ইতিবাচক ফলাফল এনে দেবে।
অদিতি করিম : লেখক ও নাট্যকার
ইমেইল : [email protected]