ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১২ জুলাই, ২০২৬ ০৯:৫৭ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৪ বার
বাংলাদেশে এখন মতপ্রকাশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সোশ্যাল মিডিয়া। সোশ্যাল মিডিয়া কেবল স্বাভাবিক জনমতকে প্রভাবিত করছে না, এর ফলে সৃষ্টি হচ্ছে বহু মাত্রিক সমস্যা।
এখন সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের চরিত্রহননের অন্যতম হাতিয়ার। অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান বাহন।
সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অবাধে চলছে ব্ল্যাকমেল, কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য প্রচার এবং মিথ্যাচার। জনমত পাল্টে দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার বটবাহিনী।
গুজব, অপপ্রচার মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে জনগণকে করা হচ্ছে বিভ্রান্ত। শুধু বাংলাদেশে নয় সারা বিশ্বে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকের মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো এখন রীতিমতো আতঙ্কের নাম।
দেশে দেশে তাই সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার ঠেকাতে নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন উদ্যোগ। তবে এসব উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে জবাবদিহিতা ও আইনের আওতায় নিয়ে আসা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সোশ্যাল মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণহীন অপব্যবহার, সাইবার অপরাধ এবং মিথ্যাচার ঠেকাতে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে মোটা অঙ্কের জরিমানা করা হয়। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র এমনকি ভারতেও সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মগুলো সেই দেশের আইনের আওতায় চলে। ফলে অধিকাংশ দেশই সাইবার অপরাধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ যেন অসহায়। একদিকে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নেই তেমন কার্যকর আইন, অন্যদিকে ফেসবুক, টুইটার কিংবা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর নেই কোনো জবাবদিহিতার ব্যবস্থা। ফলে সাইবার অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। অথচ এমন হওয়ার কথা নয়। বাংলাদেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটির বেশি। এদের মধ্যে চলতি বছরের জুনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৭ কোটি ৬০ লাখ মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করেন। ইউটিউব ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি। ফেসবুক বা ইউটিউব বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করে। বাংলাদেশ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে প্রতি বছর ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি আয় করে মেটা এমন দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা। একইভাবে ইউটিউবের আয়ও ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। কাজেই বাংলাদেশ ফেসবুক বা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এক বিশাল বাজার। পৃথিবীর খুব কম দেশেই এত বড় বাজার আছে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য। বাংলাদেশ থেকে এত বিপুল পরিমাণ আয় করলেও বাংলাদেশ সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর। এদের নেই কোনো জবাবদিহিতা। এসব সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো আপত্তিকর, অশালীন, দেশের জন্য ক্ষতিকর কনটেন্ট পোস্ট করা হলে বাংলাদেশ কেবল ফেসবুককে অনুরোধ করতে পারে, আপত্তিকর কন্টেন্টটি সরিয়ে ফেলার জন্য। কিন্তু ফেসবুক কর্তৃপক্ষ তাদের মর্জি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়, এ কনটেন্ট সরাবে কি না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরাসরি আপত্তিকর লিংক সরানো, কনটেন্ট ব্লক করার মতো সক্ষমতা নেই দেশের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির। সংস্থাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর কর্তৃপক্ষ বরাবর অনুরোধ পাঠিয়ে থাকে। সংশ্লিষ্টরা তাদের গাইডলাইন ও কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে যায়, এমন সব লিংক বা কনটেন্ট অপসারণ করে বাংলাদেশের অনুরোধ রাখার চেষ্টা করে। তবে বাংলাদেশ থেকে যেসব অনুরোধ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর কাছে যায় তার তিন ভাগের এক ভাগেরও কম অনুরোধে তারা সাড়া দেয়। তাছাড়া এসব কনটেন্ট অপসারণে এত বেশি সময় নেয় যে এটা সরানোর আগেই যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে যায়। বাংলাদেশ যেন ফেসবুক, ইউটিউবের কাছে জিম্মি। এসব সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম যেন একালের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাসহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করার বিধান আইনে আনা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপতথ্য, মানহানিকর কনটেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর ছবি, ভিডিও ও অডিও ঠেকাতে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে অফিস না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা বাংলাদেশের আইনের আওতায় আসবে না। যত কঠিন আইন করা হোক না কেন তা শুধুমাত্র বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু এখন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচারের একটি বড় অংশ হচ্ছে বিদেশ থেকে। আইন যতই কঠোর হোক, বিদেশ বসে যারা গুজব ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে এ আইন কিছুই করতে পারবে না।
তাই সাইবার অপরাধ এবং হিংসাত্মক অপপ্রচার বন্ধের একমাত্র উপায় হলো মেটা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে অফিস করতে বাধ্য করা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এভাবেই সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার প্রতিরোধ করেছে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে কখনো বা সাময়িকভাবে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের দেশে অফিস খুলতে বাধ্য করেছে। মেক্সিকোর কথাই ধরা যাক, মাদক নেটওয়ার্কের জন্য সেদেশে ফেসবুক হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম। সরকার বিষয়টি জানার পর ফেসবুকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু ফেসবুক মেক্সিকো সরকারের কথায় কান দেয়নি। অতঃপর ওই দেশের সরকার সাময়িকভাবে ফেসবুক ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। এরপর তারা সেখানে অফিস করতে বাধ্য হয়। জার্মানি ফেসবুক কে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, তাদের দেশে অফিস না করলে এবং আইন না মানলে তারা এ প্ল্যাটফর্মকে কার্যক্রম করতে দেবে না। এভাবেই ইউরোপসহ পশ্চিমা দেশগুলো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় এনেছে। শুধু তাই নয়. এসব আইনে বিপুল পরিমাণ জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ফলে, এসব প্ল্যাটফর্মে কোনো কুরুচিপূর্ণ, অশালীন ও হিংসাত্মক পোস্ট হলে তার দায় প্রতিষ্ঠানটির ওপর বর্তায়। প্রতি বছর মেটা কে মিলিয়ন ডলার জরিমানা গুনতে হয় এখন। ফলে কোনো অপতথ্য পোস্ট যেন না হয় সেদিকে নজর রাখে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ নিজেই। এটাই হলো অপতথ্য প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায়। বাংলাদেশে আজ যা ঘটছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এত ভয়াবহ না হলেও এর কাছাকাছি অবস্থা ছিল। সেখান থেকে আইন করে, ফেসবুক ইউটিউবের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনের আওতায় এনে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে ভারতে কার্যালয় করতে বাধ্য করেছে। তাদের ভারতীয় আইনের আওতায় আনা হয়েছে। ফলে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট তথ্য প্রকাশ করলে সরাসরি প্রথম এসব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণের জন্য বলা হয়। এর ফলে কাউকে হয়রানি করা, ব্ল্যাকমেল করা পোস্টগুলো দ্রুত প্রতিষ্ঠানগুলোর নামিয়ে ফেলে। ভারতে সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রধানত আইনগত নীতিমালা এবং কঠোর সরকারি নির্দেশিকার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভুয়া খবর প্রতিরোধ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি আইন, ২০০০ (ওঞ অপঃ), তথ্যপ্রযুক্তি (ইন্টারমিডিয়ারি গাইডলাইনস এবং ডিজিটাল মিডিয়া এথিক্স কোড) রুলস, ২০২১ (ওঞ জঁষবং, ২০২১) এর মাধ্যমে ভারত মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত রেখেই অপতথ্য, গুজব এবং হিংসাত্মক পোস্ট প্রতিরোধে অনেকটাই সফল হয়েছে। বিভিন্ন দেশ মেটা এবং গুগলের অফিসের শাখা তাদের দেশে করতে বাধ্য করেছে। ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাকে ২৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা প্রায় ৩ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা (প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ১২০ টাকা ধরে) জরিমানা করেছে আয়ারল্যান্ডের ডেটা প্রোটেকশন কমিশন (ডিপিসি)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও গুগলকে ২১ কোটি ইউরো জরিমানা করেছে ফ্রান্স সরকার। অস্ট্রেলিয়া গত বছর থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব, চরিত্র হনন এবং হিংসা বিদ্বেষ ছড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর আইন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়া সব আইনের ঊর্ধ্বে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই। মেটা বা গুগলের কোনো শাখা অফিস নেই বাংলাদেশে অথচ বাংলাদেশের ছয় কোটির বেশি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে। মেটার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ ফেসবুক ব্যবহারের বিশ্বে দশম। কিন্তু বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম ব্যবহারকারী দেশ সিংগাপুর, আয়ারল্যান্ড, ইসরায়েলে মেটা অফিস খুলেছে।
কাজেই বাংলাদেশকেও সেই পথে যেতে হবে। সমস্যা সমাধানের উৎসে যেতে হবে।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের মূল প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে অফিস খুলতে বাধ্য করতে হবে। তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তা না হলে সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্য সন্ত্রাস আমাদের সব অর্জন ধ্বংস করে দেবে।