ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২ জুন, ২০২৬ ১৩:১০ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৪ বার
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর অপব্যবহারও বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে।
বিশেষ করে নারীদের ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা টিকটক অ্যাকাউন্ট খুলে হয়রানির ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। অভিযোগ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার পাচ্ছেন না।
ঢাকার দক্ষিণখান এলাকায় বসবাসকারী এক গৃহিণী, এখানে যাকে রমনী (ছদ্মনাম) নামে উল্লেখ করা হচ্ছে, তার পরিবারের অভিজ্ঞতা এমনই এক বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে। গত বছরের নভেম্বরে তিনি আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে জানতে পারেন, তার ১২ বছর বয়সী মেয়ের ছবি ব্যবহার করে একটি ফেসবুক আইডি খোলা হয়েছে।
ওই আইডি থেকে বিভিন্ন ব্যক্তিকে ইঙ্গিতপূর্ণ ও অশালীন বার্তা পাঠানো হচ্ছে।
বিষয়টি জানতে পেরে সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি ও তার পরিবার।
পরে দক্ষিণখান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। কিন্তু সাত মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মেয়ের ছবি ব্যবহার করে তৈরি করা সেই ফেসবুক আইডি এখনও সক্রিয় রয়েছে।
তিনি বলেন, ফেসবুক তো দূরের কথা, আমার মেয়ের কাছে কোনো মোবাইলফোনই নেই। আমি বা আমার স্বামী ফেসবুকে কোনো ছবি দিলে সঙ্গে সঙ্গে ওই আইডি থেকে সেটি আপলোড করা হয়। মানুষকে খারাপ খারাপ মেসেজ পাঠানো হয়। আমার মেয়েকে খুব বাজেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
কী ধরনের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি?
পুলিশের তথ্যানুযায়ী, নারীদের ছবি ব্যবহার করে ভুয়া আইডি খোলা, একই ব্যক্তির নামে একাধিক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা, ফেসবুক আইডি হ্যাক করে অশালীন বা যৌন হয়রানিমূলক বার্তা পাঠানো এবং এডিট করা ছবি ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়।
এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় গোপন করে প্রতারণা, অন্যের ছবি ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা, এমনকি পরিচিত ব্যক্তিদের নামে ভুয়া প্রোফাইল খুলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত।
সম্প্রতি নড়াইলের কালিয়ায় এক নারীর ছবি ও ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে প্রতারণার অভিযোগে একজন যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অন্যদিকে এক কলেজছাত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, তার ছবি ও নাম ব্যবহার করে অন্তত ১৫টি ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে।
পুলিশের কাছে অভিযোগ, তারপর কী?
বাংলাদেশ পুলিশের পরিচালিত ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’র সাইবার হয়রানির শিকার নারীরা অভিযোগ ও সহায়তা চাইতে পারেন। অনেক নারীই অভিযোগ করেছেন, সহায়তা চাইলেও কাঙ্ক্ষিত সুরক্ষা বা দ্রুত সমাধান পাচ্ছেন না।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার ইউনিটের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আমিনুল হক বাপ্পী বলেন, সাইবার অপরাধসংক্রান্ত অভিযোগের মধ্যে ব্ল্যাকমেইলিং, হ্যাকিং, ফেসবুকে প্রোপাগান্ডা পোস্ট এবং ভুয়া আইডি থেকে তথ্য ও ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগই সবচেয়ে বেশি।
তিনি জানান, এসব অভিযোগ তদন্তে অনেক ক্ষেত্রে মেটার (ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান) সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। সব অভিযোগে দ্রুত সাড়া পাওয়া যায় না। চাবিটা আমাদের কাছে থাকে না, চাবিটা মেটার কাছে, বলেন তিনি। মেটা যাচাই-বাছাই করে উত্তর দিলে তবেই পুলিশ পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারে। অনেক সময় কোনো উত্তরই পাওয়া যায় না।
কেন বিলম্ব হয়?
পুলিশ কর্মকর্তাদের জানান, থানায় জিডি হওয়ার পর অভিযোগটি কয়েকটি প্রশাসনিক ধাপ অতিক্রম করে। স্থানীয় থানা থেকে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, পরে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) হয়ে মেটার কাছে পাঠানো হয়।
বাংলাদেশে থানায় করা জিডি সাধারণত বাংলায় লেখা হয়। কিন্তু মেটার কাছে পাঠাতে হলে সেগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ ও নোটারি সম্পন্ন করতে হয়। ফলে পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লাগে।
শাস্তি নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব?
পুলিশ বলছে, ভুয়া আইডির পেছনে থাকা ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে মেটার কাছ থেকে তথ্য পাওয়া জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশ পুলিশের সঙ্গে মেটার আনুষ্ঠানিক তথ্য বিনিময় চুক্তি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে শুধু ভুয়া আইডি নয়, চাইল্ড পর্নোগ্রাফি, প্রতারণা, পরিচয় গোপন করে ফাঁদ পাতা এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।
তিনি জানান, মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স ট্রিটি (এমল্যাট) ধরনের আনুষ্ঠানিক চুক্তি থাকলে মেটার কাছ থেকে তথ্য পাওয়া সহজ হয়। কিন্তু এমন কার্যকর কাঠামোর অভাবে অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত জটিল হয়ে পড়ে। তার মতে, কোনো আইডি কোথা থেকে খোলা হয়েছে, কোন ডিভাইস ব্যবহার করা হয়েছে বা কোন নম্বর দিয়ে নিবন্ধন করা হয়েছে, এ তথ্য পেতে মেটার সহযোগিতা অপরিহার্য।
ভুক্তভোগীদের করণীয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিজের ছবি ও তথ্যের অপব্যবহার দেখলে দ্রুত স্ক্রিনশট সংরক্ষণ করতে হবে, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট রিপোর্ট করতে হবে এবং থানায় জিডি বা সাইবার ইউনিটে অভিযোগ জানাতে হবে। পাশাপাশি পরিচিতজনদেরও ভুয়া অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে সতর্ক করা জরুরি।
তবে বাস্তবতা হলো, অভিযোগ করার পরও অনেক ভুক্তভোগী দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিকারের অপেক্ষায় থাকেন। ওই পরিবারের মতো অনেকেই সামাজিক, মানসিক ও পারিবারিক চাপের মধ্য দিয়ে সময় পার করছেন।
সাইবার জগতে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু ব্যক্তিগত সতর্কতাই নয়, প্রয়োজন দ্রুত প্রতিকার ব্যবস্থা, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আরও সমন্বিত সহযোগিতা, এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: বিবিসি বাংলা