ঢাকা, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

পোশাক খাতে শ্রমিকবান্ধব জ্বালানি রূপান্তরের আহ্বান

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:০৩ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৫ বার


পোশাক খাতে শ্রমিকবান্ধব জ্বালানি রূপান্তরের আহ্বান

বাংলাদেশের পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের ব্যয় বহনে বৈশ্বিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোকেও আর্থিকভাবে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকায় অনুষ্ঠিত একটি জাতীয় সংলাপে অংশ নেওয়া বক্তারা। তারা নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ও বিদ্যুতায়নের পাশাপাশি ন্যায্য ক্রয়নীতি, সহজলভ্য অর্থায়ন ও শ্রমিকদের প্রকৃত সুরক্ষার ওপর জোর দেন।

 

‘ফ্রম ফ্রেমওয়ার্ক টু অ্যাকশন: অ্যাডভান্সিং অ্যা মাল্টি-স্টেকহোল্ডার ইনিশিয়েটিভ ফর অ্যা জাস্ট ট্রানজিশন ইন বাংলাদেশস ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি’ শীর্ষক এ সংলাপ সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়। স্ট্যান্ড.আর্থ, অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশ এবং ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স (বিটিএস)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সংলাপে নীতিনির্ধারক, ফ্যাশন ব্র্যান্ড, পোশাক প্রস্তুতকারক, ট্রেড ইউনিয়ন, আইএলও, জিআইজেড এবং কর্নেল ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

 

অনুষ্ঠানে স্ট্যান্ড.আর্থ তাদের ‘ক্লিন ফ্যাশন ইনভেস্টমেন্ট প্যাক্ট’ বা পরিচ্ছন্ন ফ্যাশন বিনিয়োগ চুক্তি সবার সামনে তুলে ধরে। এরপর নারী শ্রমিকদের জন্য খাতভিত্তিক রূপরেখা, জ্বালানি রূপান্তরে অর্থায়ন এবং জলবায়ু অভিযোজনে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে দুটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

 

অ্যাপারেল ইমপ্যাক্ট ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ফ্যাশন খাতে কার্বন নির্গমন ২০২৩ সালে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে আরও ৬ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে বছরে প্রায় ১০০ কোটি (এক বিলিয়ন) টনে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা নবম শীর্ষ দেশ হওয়ায় এ দেশের ওপর ঝুঁকির বড় একটি অংশ বর্তায়।

এ দেশের তৈরি পোশাক খাতের ৪০ লাখ শ্রমিকের বড় অংশই নারী, যারা ক্রমবর্ধমান দাবদাহ ও বন্যার মতো দুর্যোগের শিকার।

 

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি রূপান্তর কেবল প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের বিষয় নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক রূপান্তর। শিল্পকে পরিবেশবান্ধব করার প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কাজের পরিবেশ এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো যাতে কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়, তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।

সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, এই রূপান্তরের বোঝা শিল্প ও শ্রমিকদের ওপর গিয়ে পড়ছে। কিন্তু এর সুবিধা নিচ্ছে কারা? এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা।

গত মাসে স্ট্যান্ড.আর্থ রিসার্চ গ্রুপের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৫টি ব্র্যান্ড একসঙ্গে কাজ করলে ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রতি বছর ১২ লাখ ৬০ হাজার টন বা সামগ্রিকভাবে ৮৫ লাখ ৯০ হাজার টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন রোধ করা সম্ভব। এই পরিমাণ কার্বন নির্গমন উত্তর আমেরিকার ৩০ লাখেরও বেশি বসতবাড়ির বার্ষিক নির্গমনের সমান।

স্ট্যান্ড.আর্থ-এর সিনিয়র ক্যাম্পেইন ম্যানেজার র‍্যাচেল কিচিন বলেন, আমরা চাই কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যয়ে ব্র্যান্ডগুলো তাদের ন্যায্য হিস্যা পরিশোধ করুক, যার মধ্যে যৌথ, অংশীদারত্বভিত্তিক বা অনুদানভিত্তিক প্রকল্প অর্থায়নের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। আমরা চাই ব্র্যান্ডগুলো শেষ পর্যন্ত জলবায়ু রক্ষায় জাতীয় বা বৈশ্বিক তহবিল গঠনের মতো শিল্পব্যাপী এমন একটি উদ্যোগকে সমর্থন করুক, যা এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে রসদ জোগাতে পারবে।

বিজিএমইএ-এর পরিচালক রুমানা রশীদ বলেন, কারখানাগুলো যখন পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, অধিকতর সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি এবং নতুন উৎপাদন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, তখন শ্রমিকদেরও প্রশিক্ষণ, নতুন দক্ষতা অর্জন এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশের সুযোগ পাওয়া উচিত। তাদের প্রভাবিত করে এমন যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের মত ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।

‘২০২৫ ফসিল ফ্রি ফ্যাশন স্কোরকার্ড’-এর তথ্যানুযায়ী, ৪২টি প্রধান ব্র্যান্ডের মধ্যে মাত্র ছয়টি ব্র্যান্ড তাদের সরবরাহকারীদের কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের জন্য অর্থায়নের প্রস্তাব দিয়েছে এবং এর মধ্যে মাত্র একটি ব্র্যান্ড সরবরাহকারীদের ওপর কোনো ঋণের বোঝা চাপায়নি। এ খাতের ব্যবহৃত জ্বালানির প্রায় ৯০ শতাংশই এখনো কারখানা পর্যায়ে পোড়ানো জীবাশ্ম গ্যাস থেকে আসে।

অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশের প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ইউনিটের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান মো. আতোয়ার রহমান বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, জলবায়ু সুবিচার এবং অর্থনৈতিক সুবিচার পাশাপাশি চলা উচিত, যেখানে কেউ পিছিয়ে থাকবে না; যাতে করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব কম পড়ে এবং তাদের যেন জলবায়ু পদক্ষেপের এই ব্যয় বহন করতে না হয়।

বৈশ্বিক জলবায়ু দূষণের প্রায় ৪ শতাংশের জন্য ফ্যাশন খাত দায়ী। আর এর উৎপাদন ব্যবস্থা মূলত কয়লা ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এটি জলবায়ু এবং শ্রমিক ও তাদের আশপাশের জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য– উভয়েরই ক্ষতি করছে। ২০২১ সালে হার্ভার্ডের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী প্রতি পাঁচটি মৃত্যুর মধ্যে একটির সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট বায়ুদূষণের সম্পর্ক রয়েছে।

ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স-এর নির্বাহী পরিচালক রোকসানা সুলতানা বলেন, কারখানার মালিকরা শুধু নিজেরা এই রূপান্তরের বোঝা কাঁধে নিতে পারবেন না। একটি ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই রূপান্তরকে সমর্থন দিতে সরকার, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, উন্নয়ন সহযোগী এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

অংশগ্রহণকারীরা ব্র্যান্ডগুলোকে ‘ক্লিন ফ্যাশন ইনভেস্টমেন্ট প্যাক্ট’-এ যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান এবং কর্পোরেট প্রতিশ্রুতিগুলোকে অর্থায়িত ও বাস্তবমুখী পরিবর্তনে রূপ দিতে সম্মিলিত পদক্ষেপে একমত হওয়ার আমন্ত্রণ জানান। এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে– সরবরাহকারীদের জন্য অনুদানভিত্তিক ও সম্মিলিত অর্থায়ন, ব্র্যান্ডগুলোর পরিশোধিত মূল্যে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের ব্যয়ের প্রতিফলন, কার্যকর তাপপ্রবাহ সুরক্ষা এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তে নারী শ্রমিকদের মতামতের মূল্যায়ন।


   আরও সংবাদ