আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ জুলাই, ২০২৬ ১৩:১৬ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৮ বার
ইরান যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও জ্বালানি অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস মিলছে। তেহরান নিয়ন্ত্রিত হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ নতুন উদ্যোগ নিয়েছে।
এর অংশ হিসেবে ইরাক, সিরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৫০০ মাইল দীর্ঘ একটি ঐতিহাসিক তেল পাইপলাইন পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা করছে।
মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে চলতি সপ্তাহেই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।
ওয়াশিংটনে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠক থেকেই এই ঘোষণা দেওয়া হতে পারে।
পাইপলাইনটি ইরাকের উত্তরাঞ্চলের কিরকুক শহর থেকে সিরিয়ার উপকূলীয় শহর বানিয়াসের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত।
১৯৫২ সালে ইরাক পেট্রোলিয়াম কোম্পানি দৈনিক তিন লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতা নিয়ে এটি নির্মাণ করে। তবে আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালে সিরিয়া ইরানের পক্ষ নেওয়ায় বাগদাদ পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেয়।
পরে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের সময় এটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বর্তমানে সম্পূর্ণ অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।
আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের মতে, পাইপলাইনটি পুনরায় চালু করতে নতুন সংরক্ষণাগার, পাম্প, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। এমনকি পুরো পাইপলাইনই নতুন করে বসানোর প্রয়োজন হতে পারে। এই কাজ শেষ করতে দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে। ইতোমধ্যে পুনর্গঠন কাজের জন্য মার্কিন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের একটি জোটকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করেছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে ইরাকের ওপর। দেশটি উৎপাদিত তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি করে।
জ্বালানি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ভোর্টেক্সার তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে ইরাকের সমুদ্রপথে তেল রপ্তানি আগের বছরের গড় রপ্তানির মাত্র ৮ শতাংশে নেমে আসে। অথচ দেশটির রাষ্ট্রীয় বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশ আয় আসে তেল বিক্রি থেকে। ফলে হরমুজ প্রণালিতে প্রতিবন্ধকতা ইরাকের অর্থনীতিকে মারাত্মক সংকটে ফেলেছে।
যুদ্ধ চলাকালে ইরাক ট্যাঙ্কার ট্রাকের মাধ্যমে সিরিয়া হয়ে সীমিত পরিসরে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম ছিল। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক সারহাং হামাসায়িদের মতে, যুদ্ধের আগে যে সংশয় ছিল, এখন তা কেটে গেছে। ইরাক উপলব্ধি করেছে যে, বিকল্প রপ্তানি পথ হিসেবে সিরিয়াকে তাদের প্রয়োজন।
বাশার আল-আসাদ-পরবর্তী সিরিয়ার নতুন বাস্তবতা
২০২৪ সালের শেষ দিকে সিরিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করেন আহমেদ আল-শারার অনুগত মিলিশিয়ারা। শারা ক্ষমতায় আসার পর শুরুতে পাইপলাইনটি পুনরায় চালুর আলোচনা হলেও তা খুব বেশি অগ্রসর হয়নি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আলোচনা নতুন গতি পেয়েছে।
ইরাক সরকার ইরানঘনিষ্ঠ শিয়া রাজনৈতিক দল ও মিলিশিয়াদের প্রভাবাধীন হওয়ায় তারা সুন্নি মুসলিম এবং আল-কায়েদার সাবেক সহযোগী আল-নুসরা ফ্রন্টের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ আল-শারাকে সন্দেহের চোখে দেখে। তবে ক্ষমতায় আসার পর শারা দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোরও সমর্থন রয়েছে তাঁর প্রতি।
এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সিরিয়া এবং শারার দল হায়াত তাহরির আল-শামের ওপর থেকে একাধিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছেন। সম্প্রতি আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনেও তিনি শারার প্রশংসা করেন। পাশাপাশি ১৯৭৯ সাল থেকে সিরিয়াকে সন্ত্রাসবাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক দেশের তালিকায় রাখা হলেও সেই তালিকা থেকে দেশটির নাম প্রত্যাহারের ঘোষণাও দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন।
অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতিগত পরিবর্তনের ফলে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য পাইপলাইন প্রকল্পে কাজ করা সহজ হবে। চলতি মাসের শুরুতে ইরাক সরকার কিরকুক ও হাদিসা থেকে বানিয়াস পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্পে মার্কিন কোম্পানি ক্যাপিটাল টিআই, শেভরন এবং একটি কাতারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তির অনুমোদন দিয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানিও যুক্তরাষ্ট্রে উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধু মার্কিন জ্বালানি ব্যবসাই লাভবান হবে না, একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একক আধিপত্যও কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাণিজ্য ও আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই