আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ জুন, ২০২৬ ০৯:৩১ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৫ বার
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলায় ৪৭ জন নিহত হওয়ার পর ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা।
সর্বশেষ এই সমঝোতা এমন এক সময়ে এলো, যখন দক্ষিণ লেবাননে সংঘর্ষে হিজবুল্লাহর হামলায় চার ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল যে পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের চুক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। তবে পরে এক মুখপাত্র বলেন, তাদের বাহিনী তাৎক্ষণিক হুমকি দূর করার কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে।
অন্যদিকে হিজবুল্লাহ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করেনি। তবে সংগঠনটির মহাসচিব শেখ নাঈম কাসেম বলেছেন, হিজবুল্লাহকে নির্মূল করার প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে।
নাবাতিয়েহ শহরের উদ্ধারকর্মীরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও অন্তত ১২টি বিমান হামলা হয়েছে।
এই রক্তক্ষয়ী উত্তেজনা আবারও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের সঙ্গে করা চুক্তির পরিণতির ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই।
সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) লেবাননের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেও যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন, যা তেহরানকে অভিযোগ করতে বাধ্য করেছে যে ট্রাম্প ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন।
ট্রাম্প নিজেও তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অভিযোগ এনে এই বিতর্ককে উসকে দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে নেতানিয়াহু অযথা বেসামরিক মানুষকে হত্যা করছেন।
নতুন করে জটিলতা
দক্ষিণ লেবাননে রাতভর সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
হোয়াইট হাউস যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা বললেও, ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির চার ইসরায়েলি সেনার মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘লেবাননকে জ্বলতে হবে... একজন ইসরায়েলি মায়ের প্রতিটি অশ্রুর জন্য এক হাজার লেবাননি মাকে কাঁদতে হবে।’
এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অভিযোগ করেন, ইসরায়েল ‘স্থায়ী যুদ্ধ’ চায়। তিনি বলেন, সমঝোতা স্মারকে বর্ণিত অঙ্গীকার লঙ্ঘনের যে কোনো ঘটনা ‘যুক্তরাষ্ট্রের দায় হিসেবে গণ্য হবে’।
ট্রাম্পের চুক্তি সফল হওয়ার জন্য উভয় পক্ষের কট্টরপন্থীদের সংযত রাখা এবং ধৈর্য প্রদর্শন জরুরি। কিন্তু তার তেমন কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
নেতানিয়াহু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মুখে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ বলেছে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব চলতে থাকলে তারাও হামলা চালিয়ে যাবে।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ইসরায়েলি সামরিক মুখপাত্র এফি ডেফরিন বলেন, ‘আমরা তাৎক্ষণিক হুমকি দূর করতে, হিজবুল্লাহর লঙ্ঘনের জবাব দিতে এবং আমাদের বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সবকিছু করতে থাকব।’
শুক্রবার হিজবুল্লাহপ্রধান শেখ নাঈম কাসেম ঘোষণা করেন, ‘হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে এবং ইসরায়েলিদের আমাদের ভূখণ্ডের প্রতিটি ইঞ্চি থেকে সরে যেতে হবে।’
সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা
হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, তারা দক্ষিণ লেবাননে একটি ইসরায়েলি ইউনিটের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে তিনটি ট্যাংক ধ্বংস করেছে এবং রকেট ও গোলাবর্ষণের মাধ্যমে সেনাদের লক্ষ্যবস্তু করেছে। ওই হামলায় নিহত চার ইসরায়েলি সেনার মধ্যে একজন ব্যাটালিয়ন কমান্ডারও ছিলেন।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি বিমান হামলায় ৪৭ জন নিহত এবং ৯৭ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে।
মন্ত্রণালয় জানায়, নাবাতিয়েহ জেলার হারুফ এলাকায় ৯ জন, হাব্বুশে ৭ জন এবং আল-দুয়েইরে ৬ জন নিহত হয়েছেন। আল-দুয়েইরের নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে।
এর আগে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছিল, বৃহস্পতিবার রাতে নাবাতিয়েহ জেলাজুড়ে চালানো বোমাবর্ষণ ছিল চলমান যুদ্ধের সবচেয়ে তীব্র হামলাগুলোর একটি।
যুদ্ধবিরতি নিয়ে সংশয়
যুদ্ধবিরতির খবরে বাস্তুচ্যুত অনেক লেবাননি নাগরিক সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, ইসরায়েল এই চুক্তি মেনে চলবে না।
এক ব্যক্তি রয়টার্সকে বলেন, ‘চুক্তি ভালো, আমরা সবাই চুক্তি চাই। কিন্তু ইসরায়েলিরা তা মেনে চলে না। তারা কতবার চুক্তি করেছে? একাধিকবার। কিন্তু প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি।’
নতুন আলোচনার উদ্যোগ
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে লেবানন সরকার ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি আলোচনা পুনরায় শুরু হবে।
এদিকে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন বৈঠক এগিয়ে নিতে হলে এমন একটি ‘সর্বাত্মক যুদ্ধবিরতি’ প্রয়োজন, যার আওতায় ‘লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি হামলা’ বন্ধ হবে।
সংঘাতের পটভূমি
ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিন পরই লেবানন এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করে।
এর জবাবে ইসরায়েল লেবাননজুড়ে ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু করে এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৫ শতাংশ এলাকা দখল করে নেয়। তাদের লক্ষ্য ছিল উত্তর সীমান্ত থেকে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সরিয়ে দেওয়া।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, সর্বশেষ সংঘাত শুরুর পর থেকে ৩ হাজার ৯০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। আহত হয়েছেন ১১ হাজার ৬০০ জনের বেশি।
এখনো প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে এবং দক্ষিণাঞ্চলের বহু জনপদ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।