ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২০ জুন, ২০২৬ ০৯:৩২ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৬ বার
সরকার যেকোনো মূল্যে জনসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে চায়। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা না গেলে জনসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।
এতে সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট দেখা দেয়। যেটি কোনোভাবে সরকারের কাম্য নয়।
এ জন্য জনসেবা নিশ্চিত ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় কঠোর হচ্ছে সরকার।
জনসেবা নিশ্চিত করা এবং সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর দায়িত্ব পালনে শৈথিল্যের প্রমাণ পাওয়া গেলে চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হলে বাধ্যতামূলক অবসর, ২৫ বছর পূর্ণ না হলে সাময়িক বরখাস্তের মতো শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দেশের সব বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক বরাবর সরকারের নেওয়া সব সিদ্ধান্ত দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সরকারের কোনো কোনো সিদ্ধান্ত, আদেশ বা সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন হওয়ার আগেই সে বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিরূপ মন্তব্যসহ বিবৃতি প্রকাশ করা হচ্ছে, যা সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর পরিপন্থী।
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ৩০-এ নম্বর বিধিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কোনো সরকারি কর্মচারী— (এ) সরকারের অথবা কর্তৃপক্ষের কোনো সিদ্ধান্ত বা আদেশ পালনে জনসমক্ষে আপত্তি উত্থাপন করিতে বা যেকোনো প্রকারে বাধা প্রদান করিতে পারিবেন না, অথবা অন্য কোনো ব্যক্তিকে তাহা করার জন্য উত্তেজিত বা প্ররোচিত করিতে পারিবেন না। (বি) সরকারের বা কর্তৃপক্ষের কোনো সিদ্ধান্ত বা আদেশ সম্পর্কে জনসমক্ষে কোনো অসন্তুষ্টি বা বিরক্তি প্রকাশ করিতে অথবা অন্যকে তাহা করার জন্য প্ররোচিত করিতে অথবা কোনো আন্দোলনে অংশগ্রহণ করিতে বা অন্যকে অংশগ্রহণ করার জন্য প্ররোচিত করিতে পারিবেন না।’
সরকারের শীর্ষ প্রশাসনিক দপ্তর সচিবালয়ে দেখা গেছে, সচিবালয়ের কর্মচারী নেতারা বিভিন্ন সময় সরকারি চাকরি আইন ও শৃঙ্খলাবিধি লঙ্ঘন করে বিশৃঙ্খলা ও কর্মবিরতি পালন করছেন। তাঁরা তাঁদের কর্মসূচির মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আদেশ অমান্য করা, সহকর্মীদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া এবং দলবদ্ধভাবে বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত থাকার মতো কর্মসূচিও দিচ্ছেন। এই পদক্ষেপগুলো সরকারি সেবায় সরাসরি ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের কাজে নিয়োজিত প্রত্যেক কর্মীকে তাঁর দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে হয়।
কিন্তু কর্মচারী নেতারা প্রায়ই নিয়মবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন যৌক্তিক বা অযৌক্তিক দাবিতে সচিবালয়ে আন্দোলন ও কর্মবিরতির ডাক দেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারি চাকরিতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। শুধু তাই নয়, সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের পোস্টার-ব্যানার ছাপিয়ে সচিবালয়ের ভেতরে এবং বাইরে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করছে। এসব কর্মসূচিতে রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশগ্রহণ করছেন।
এ প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সম্প্রতি বিভিন্ন পদমর্যাদার কিছু সরকারি কর্মচারী বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে সমাবেশ, অবস্থান ধর্মঘট, মানববন্ধন, কলমবিরতিসহ বিবিধ কর্মসূচি পালনের কারণে সরকারি কর্মচারীদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এসব কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে জনসেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। এসব কর্মসূচির কারণে সচিবালয়ের বাইরে বিশেষ করে ডিসি অফিস এবং ইউএনও অফিসে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছেন।
তিনি আরো জানান, বিভিন্ন কারণে সচিবালয়ের অভ্যন্তরে প্রতিনিয়ত সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ ও ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’-এর বিধানাবলি লঙ্ঘিত হচ্ছে। শুধু পে স্কেল নয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সমন্বয়ে একাধিক সংগঠন সচিবালয়ের অভ্যন্তরে আইন লঙ্ঘন করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আদেশ অমান্য করা হচ্ছে। সহকর্মীদের দায়িত্ব পালনে বাধা দিয়ে তাঁদের জোর করে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণে বাধ্য করা হচ্ছে। এসব শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সভাপতি নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সচিবালয়ে সব নিয়ম মেনেই কর্মচারীদের দাবি আদায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছি। এ ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ ও ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’-এর বিধানাবলি লঙ্ঘিত হয় বলে মনে করি না।’
জানা গেছে, কর্মচারীদের বিশৃঙ্খলা রোধে সরকার আইন আরো কঠোর করছে। এর অংশ হিসেবে জারি করা হয়েছে সরকারি চাকরি আইন বা সংশোধিত অধ্যাদেশ। যার অধীনে সরকারি কাজে বাধা প্রদান, বেআইনি ধর্মঘট ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ অমান্য করা সরাসরি ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য হবে। সরকারি কর্মচারীরা কোনোভাবে কাজ বন্ধ রেখে বা অন্য সহকর্মীদের কাজ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করে নিজেদের অধিকার আদায়ের নামে আইন লঙ্ঘন করতে পারেন না। সরকার এসব বিষয়ে প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের বিধান রেখে এর আওতায় দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সরাসরি বিভাগীয় ব্যবস্থা বা বরখাস্তের মতো কঠোর শাস্তির আইন রাখা হয়েছে।
সূত্র জানায়, সরকার কর্মচারীদের পেশাগত শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।
এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীসহ আমরা সপ্তাহে সাত দিন কাজ করি। সরকার গঠনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ফ্যামেলি কার্ড বিতরণের পাইলট কর্মসূচির সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে। একইভাবে খাল কাটার পাইলট কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বিলম্বিত হলে জনসেবা ব্যাহত হয়।’
অর্থমন্ত্রী জানান, যেকোনো মূল্যে দ্রুততম সময়ে সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি বরদাশত করা হবে না।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভূইয়া জানান, সরকারি কর্মচারীরা কোনোভাবেই বেআইনিভাবে কাজ বন্ধ রেখে বা অন্য সহকর্মীদের কাজ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করে নিজেদের অধিকার আদায়ের নামে আইন লঙ্ঘন করতে পারেন না। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সরকারের সর্বস্তরে শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ৩০এ নম্বর বিধিসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইন ও বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। জনসেবা প্রদান এবং রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সরকারি কর্মচারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সরকারি কর্মচারীদের সুশৃঙ্খল, দায়িত্বশীল ও পেশাদার আচরণের ওপর জনপ্রশাসনের সফলতা নির্ভর করে।