ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে চাপে পড়বে শিল্প

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ৪ জুন, ২০২৬ ০৯:৩৬ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৬ বার


বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে চাপে পড়বে শিল্প

গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে সরকার। খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বেড়েছে ১ টাকা ৫২ পয়সা।

জুন থেকেই কার্যকর হচ্ছে নতুন এ দাম।

 

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি সরকারের ওপর রাজস্ব সংগ্রহ ও ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমালেও অর্থনীতিবিদ, শিল্প উদ্যোক্তা ও ভোক্তা অধিকারকর্মীরা বলছেন, বিদ্যুতের এই দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনীতিতে।

বাড়বে উৎপাদন ব্যয়, চাপে পড়বে শিল্পখাত, আর শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির কারণে ভুগবে জনসাধারণ।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।

এসব খাতে মূল্যবৃদ্ধি হলে কৃষি, শিল্প, পরিবহন ও সেবা খাতসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বৃদ্ধি পায়। ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হয়।

 

তারা বলছেন, বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় করতে হলে একদিকে উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে, অন্যদিকে বিতরণ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াতে হবে। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও ভোক্তা ব্যয়, কর্মসংস্থান সংকুচিত হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতির ওপর।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিপুল ভর্তুকি দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখা সরকারের পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছিল না। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির হার নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক বাস্তবতা সরকারকে মূল্য সমন্বয়ের পথেই নিয়ে গেছে।

তিনি বলেন, জনমনে উদ্বেগের প্রধান কারণ শুধু মূল্যবৃদ্ধি নয় বরং বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা। বিশেষ করে সিস্টেম লস, উৎপাদন না করেও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ প্রদান এবং খাতটির সামগ্রিক অদক্ষতা নিয়ে মানুষের প্রশ্ন রয়েছে। এসব চুক্তি অতীতের বিভিন্ন সরকারের সময়ে হওয়ায় বর্তমান সরকারের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে সেখান থেকে বেরিয়ে আসাও সহজ নয়।

আন্তর্জাতিক চাপ ও ভর্তুকির সংকট
অধ্যাপক আবু আহমেদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ সরকারের ভর্তুকির বোঝা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে ভর্তুকি কমানোর বিকল্প খুব সীমিত হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সমর্থিত সংস্কার কর্মসূচিতেও জ্বালানি খাতে মূল্য সমন্বয়ের মতো শর্ত থাকে।

তিনি বলেন, একদিকে ঋণ নিয়ে অন্যদিকে ভর্তুকি দিয়ে অর্থনীতি পরিচালনা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। তাই বাজারভিত্তিক ও দক্ষ মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে। তবে এর ফলে জনগণের ওপর স্বল্পমেয়াদে কিছুটা চাপ তৈরি হবে, সেটিও বাস্তবতা।

অর্থনীতিকে সচল করার তাগিদ
অধ্যাপক আবু আহমেদের মতে, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ এখন অর্থনীতিকে গতিশীল করা। বর্তমানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ শতাংশের ঘরে রয়েছে। আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে এটি ৫ শতাংশে উন্নীত করা গেলে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা যাবে এবং মূল্যবৃদ্ধির চাপও অনেকাংশে সহনীয় হয়ে উঠবে।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিসুদ ও রেপো রেট কমিয়ে ঋণের সুদহার হ্রাস করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং মানুষের আয় বৃদ্ধি পাবে। তখন বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বিভিন্ন সেবার মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলা করাও তুলনামূলক সহজ হবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বহু বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ব্যাংকগুলো উৎপাদন ও শিল্পে ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে সরকারি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী। এ পরিস্থিতি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়। সরকারকে উন্নয়ন ব্যয় ও উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার উদ্যোগ নিতে হবে।

মূল্যস্ফীতির নতুন ঝুঁকি
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়েছে। ফলে সরকারকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে এবং ঋণের ওপরও নির্ভর করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমান রাজস্ব আহরণের বাস্তবতায় মূল্য সমন্বয় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ সরকারের খুব বেশি ছিল না। তবে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জ্বালানি উৎপাদন, পরিবহন, শিল্প, কৃষি ও রপ্তানিমুখী খাতসহ প্রায় সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয় ভোক্তাদেরই বহন করতে হয়। একইসঙ্গে রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের জীবনমান এমনিতেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর মধ্যে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সেই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানোর পরামর্শ
ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, শুধু মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করলে হবে না। এর নেতিবাচক প্রভাব প্রশমনে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও জোরদার করতে হবে, যাতে নিম্ন আয়ের ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অতিরিক্ত চাপে না পড়ে।

তিনি বলেন, দেশে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো গেলে উদ্যোক্তারা বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের চাপ কিছুটা সামাল দিতে পারবেন। তাই মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি উৎপাদন ও ব্যবসা পরিবেশ উন্নয়নের উদ্যোগও প্রয়োজন।

সহায়তা দিয়ে আবার দাম বাড়ালে লাভ কী
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, গত দুই মাসে ধারাবাহিকভাবে জ্বালানি তেল, গ্যাস এবং এখন বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অস্বস্তি ও উদ্বেগ বাড়ছে।

তিনি বলেন, সরকার নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করেছে। কিন্তু একদিকে সহায়তা দিয়ে অন্যদিকে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির দাম বাড়ালে সেই সহায়তার কার্যকারিতা অনেকটাই কমে যায়। নিত্যপণ্যের দাম এখনো সহনীয় পর্যায়ে নামেনি। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়লে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাবে। অথচ মানুষের আয় সেই হারে বাড়ছে না।

হেলাল উদ্দিন বিদ্যুৎ খাতের সিস্টেম লস নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার সমালোচনা করে বলেন, বিতরণ ব্যবস্থার অদক্ষতার বোঝা শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের ওপর চাপানো হচ্ছে। সিস্টেম লস কমানোর কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া বারবার মূল্যবৃদ্ধি যৌক্তিক নয়।

ভোক্তা অধিকার সংগঠনের উদ্বেগ
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বাংলানিউজকে বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এসব খাতের মূল্যবৃদ্ধি শিল্প, কৃষি, পরিবহন থেকে শুরু করে ব্যক্তি জীবন পর্যন্ত সবক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি খাতে সিস্টেম লস, দুর্নীতি, অনিয়ম এবং ক্যাপাসিটি চার্জের মতো সমস্যার সমাধান হয়নি। কিন্তু সেই অদক্ষতার দায় শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

নাজের হোসাইনের মতে, বিশ্বের অনেক দেশে নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য বিশেষ সহায়তা বা বিল মওকুফের ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে ভর্তুকি কমানোর যুক্তিতে ক্ষুদ্র গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয় চাপানো গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি আরও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়েও নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে মতভেদ থাকলেও বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ এবং সরকারের সীমিত সক্ষমতার বিষয়টি প্রায় সবাই স্বীকার করছেন। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করছেন যে মূল্যবৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার খরচ আরও বাড়তে পারে। শুধু দাম বাড়িয়ে সংকট মোকাবিলা নয়; বিদ্যুৎ খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সিস্টেম লস কমানো, ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা হ্রাস, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং অর্থনীতিকে প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরানো এসব পদক্ষেপই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্যথায় বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের আর্থিক যুক্তি থাকলেও এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য আরও বেশি হয়ে উঠতে পারে।

বুধবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৬.৬৮ শতাংশ বা প্রতি ইউনিট ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়িয়েছে। একইসঙ্গে পাইকারি পর্যায়েও বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বা প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বৃদ্ধি করা হয়েছে। মূল্যবৃদ্ধিতে প্রতি ইউনিট খুচরা বিদ্যুতের দাম এখন থেকে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা এবং পাইকারি বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম ৮ টাকা ৩৯ পয়সা হলো।

বিইআরসি জানিয়েছে, নতুন এই বিদ্যুৎ মূল্য চলতি জুন মাসের বিল থেকেই কার্যকর হবে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই মূল্য কার্যকর থাকবে। তবে সব ধরনের গ্রাহকদের জন্য ডিমান্ড চার্জ বা ডিমান্ড ফি অপরিবর্তিত রেখেছে বিইআরসি।

গত মে মাসের শুরুতে বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে শুল্ক প্রস্তাব নেওয়া হয় এবং ২০-২১ মে গণশুনানির পর নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়। দাম বাড়ানোর পরও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ঘাটতি মেটাতে বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে সরকারকে।


   আরও সংবাদ