ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৫ মে, ২০২৬ ২২:০৫ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৯ বার
ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ছুটির আমেজ। প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদের ছুটিতে ঢাকা ছাড়ছেন লাখো মানুষ।
অনেকেই পরিবার ও শিশু সন্তানদের নিয়ে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন, আবার ঈদের দিনে অনেকেই শিশুদের নিয়ে আত্মীয়-স্বজনের বাসায় বেড়াতে যাবেন। ঈদযাত্রায় বাড়তি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশে চলমান হামের উচ্চ প্রাদুর্ভাব।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রধানত শিশুদের আক্রান্ত করে। তবে টিকা না নেওয়া যেকোনো বয়সী মানুষও এতে আক্রান্ত হতে পারেন।
যেহেতু ঈদের সময় বাস, ট্রেন বা লঞ্চে অতিরিক্ত ভিড় থাকে এবং সামাজিক মেলামেশা বাড়ে, তাই শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক গুণ বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে আনন্দের ঈদ যেন বিষাদে রূপ না নেয়, সেজন্য প্রতিটি পরিবারকে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।
যাত্রাপথে সতর্কতা
মাস্কের ব্যবহার: গণপরিবহনে (বাস, ট্রেন, লঞ্চ) ভ্রমণের সময় ২ বছরের বেশি বয়সী শিশু এবং পরিবারের অন্য সদস্যদেরও মাস্ক পরা উচিত।
ভিড় এড়িয়ে চলা: রেলস্টেশন বা বাস টার্মিনালে যেখানে অতিরিক্ত ভিড়, সেখানে শিশুদের সরাসরি সংস্পর্শ থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখতে হবে।
হাত পরিষ্কার রাখা: যাত্রাপথে বারবার শিশুর হাত সাবান-পানি অথবা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। শিশু যেন নোংরা হাত চোখে, মুখে বা নাকে না দেয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কোনো শিশুর মধ্যে হামের লক্ষণ থাকলে তাকে নিয়ে ভ্রমণ না করাই ভালো।
আত্মীয়ের বাসায় বেড়ানোর ক্ষেত্রে সচেতনতা
আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশীদের মধ্যে কারও যদি জ্বর, সর্দি, কাশি বা শরীরে লালচে র্যাশ থাকে, তবে শিশুদের নিয়ে তাদের সংস্পর্শে যাওয়া যাবে না।
ঈদে শিশুদের আদর করে অনেকেই কোলে নেন। এ সময়ে পরিচিত বা অপরিচিত কেউ যেন শিশুকে অপরিষ্কার হাতে স্পর্শ না করে, সে বিষয়ে বিনীতভাবে সচেতন করতে হবে। নিজেদেরও সতর্ক থাকতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, বর্তমানে দেশে হামের উচ্চ সংক্রমণ বিরাজ করছে। অসাবধানতা ও অচেতনতার কারণে বড় ধরনের বিপদ ঘটতে পারে। এমনকি ঈদের পর হামের সংক্রমণ আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই ঈদের আনন্দের পাশাপাশি শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং হেলথ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হসপিটালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, ঈদে বিপুলসংখ্যক মানুষ শহর থেকে গ্রামে অথবা এক শহর থেকে অন্য শহরে যাবে। যাত্রাকালে হামের ভাইরাস বহনকারী কেউ থাকলে, সে তার চারপাশের মানুষের মধ্যে হাম ছড়িয়ে দিতে পারে। কারণ একজন হামের রোগী থেকে সর্বোচ্চ ১৮ জন পর্যন্ত সংক্রমিত হতে পারেন।
তিনি বলেন, জ্বর আসার চার থেকে পাঁচ দিন পর হামের র্যাশ ওঠে। র্যাশ ওঠার আগের চার দিন এবং পরের চার দিন হাম সংক্রামক থাকে। অর্থাৎ জ্বর আসার এক-দুই দিন পর থেকেই ভাইরাস ছড়াতে শুরু করে। ফলে কেউ যদি হাম আক্রান্ত অবস্থায় ভ্রমণ করে, তাহলে সে বহু মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে। আমরা আশঙ্কা করছি, ঈদের পর হামের সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে।
ঈদযাত্রায় সতর্কতার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, পরিবারের কারও যদি জ্বর থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে এবারের ঈদযাত্রা স্থগিত করুন। সেই জ্বর যদি হাম হয়ে থাকে, তাহলে তার চারপাশের সবাই ঝুঁকিতে পড়বে। তাই জ্বর হলে সচেতন হোন এবং ভ্রমণ থেকে বিরত থাকুন।
ডা. লেলিন চৌধুরী আরও বলেন, ঈদ উৎসবে আমরা প্রিয়জনদের বাসায় বেড়াতে যাই। এবারের ঈদে যে বাসায় বেড়াতে যাবেন, সেখানে কারও জ্বর থাকলে সেটি হাম হোক বা না হোক, সেক্ষেত্রে বেড়ানো স্থগিত রাখা উচিত। এতে হামের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে।
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ও আইইডিসিআর–এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, দেশে এখনো হামের যথেষ্ট প্রাদুর্ভাব রয়েছে। সেক্ষেত্রে ভ্রমণ করলে ঝুঁকি বাড়বে। কেউ যদি হামের লক্ষণ নিয়ে ভ্রমণ করে, তাহলে সে বাস, লঞ্চ, ট্রেন কিংবা জনসমাগমপূর্ণ স্থানে অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে। আবার যারা গ্রামগঞ্জে যাবেন, সেখানেও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কেউ যদি হাম আক্রান্ত হয়ে গ্রামে যায়, অথবা সেখানে গিয়ে আক্রান্ত হন, তাহলে জটিলতা বেড়ে যেতে পারে, এমনকি জীবনের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। কারণ ঢাকার বাইরে হামের চিকিৎসা তুলনামূলকভাবে কম উন্নত। সে কারণে পাঁচ বছর বা তার কম বয়সী শিশুদের নিয়ে এবারের ঈদে গ্রামে না গিয়ে নিজ নিজ অবস্থানেই থাকা ভালো।
চলমান পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করে ডা. বেনজির আহমেদ আরও বলেন, বর্তমানে দেশে হামের মহামারি চলছে। এই সময়ে ছোট শিশুদের অন্য শিশু কিংবা বড়দের খুব কাছাকাছি যাওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে, এতে সংক্রমণের ঝুঁকি কমবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বার্তা
ঈদের সময় শিশুদের নিয়ে সতর্কভাবে চলাচলের পরামর্শ দিয়ে সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ঈদের সময় আমরা অনুরোধ করছি, বাচ্চাদের যেন সব জায়গায় নিয়ে না যাওয়া হয়। যাদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তাদের আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে শিশুদের নিয়ে না যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি অতিরিক্ত ভিড় আছে, এমন জায়গায়ও শিশুদের না নেওয়ার পরামর্শ দেন।
তিনি আরও বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের অন্য শিশুদের কাছ থেকে দূরে রাখতে হবে এবং সুস্থ শিশুদেরও আক্রান্ত রোগীদের সংস্পর্শে যেতে দেওয়া যাবে না।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। স্পর্শ, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং কাছাকাছি অবস্থানের মাধ্যমে এটি ছড়ায়। ঈদের বাসযাত্রা, ট্রেনযাত্রা বা আত্মীয়-স্বজনের বাসায় বেড়াতে গিয়ে সুস্থ শিশুরা যদি হাম আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসে, তাহলে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
যেভাবে হাম ছড়ায়
১. হাঁচি, কাশি ও কথা বলার মাধ্যমে বাতাসে ছড়ায়।
২. শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে।
৩. এ ভাইরাস প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বাতাসে সক্রিয় থাকতে পারে।
৪. ফুসকুড়ি বা লাল র্যাশ ওঠার চার দিন আগে থেকে চার দিন পর পর্যন্ত সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
হামের লক্ষণসমূহ
১. উচ্চ জ্বর
২. সর্দি ও নাক দিয়ে পানি পড়া
৩. কাশি
৪. চোখ লাল হওয়া
৫. মুখের ভেতরে সাদা দাগ
৬. মুখ থেকে শুরু হয়ে সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি
লক্ষণ দেখা দিলে করণীয়
শিশুর মধ্যে যদি তীব্র জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং পরবর্তীতে শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ দেখা দেয়, তবে বিলম্ব না করে দ্রুত স্থানীয় চিকিৎসক বা নিকটস্থ হাসপাতালের পরামর্শ নিতে হবে।