আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ মে, ২০২৬ ০৯:৩২ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৩ বার
হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ জব্দ শিথিল করার আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে, এমন ইঙ্গিত দিয়ে কাতার দ্রুত একটি মধ্যস্থতাকারী দল তেহরানে পাঠিয়েছে।
প্রস্তাবিত সমঝোতার লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালী নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই করা, যার মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ৩০ দিনের আলোচনার পথ তৈরি হবে।
এর ফলে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর করার যুক্তরাষ্ট্রের দাবিটি আলোচনার বাইরে রাখা হবে।
এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে দক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত কাতার সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে মধ্যস্থতার ভূমিকায় ছিল না।
শুরুতে এ দায়িত্ব পালন করেছিল ওমান, পরে সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরেরও তেহরানে যাওয়ার কথা ছিল।
তবে ইরান সম্ভাব্য অগ্রগতির খবরকে গুরুত্বহীন হিসেবে তুলে ধরছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, আলোচনায় ‘সামান্য অগ্রগতি’ হয়েছে বটে, কিন্তু হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর ইরানকে টোল আরোপের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব ওয়াশিংটন মেনে নেবে না।
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগে পাকিস্তানই এখন প্রধান মধ্যস্থতাকারী।
এদিকে মার্কিন গণমাধ্যমে খবর এসেছে, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও অ্যাক্সিওস ও সিবিএস উভয়েই জানিয়েছে, এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এই প্রতিবেদনগুলো প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ‘সরকারি পরিস্থিতি’ এবং ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ভালোবাসার’ কারণে তিনি এ সপ্তাহে ছেলের বিয়েতে যোগ দেবেন না।
ইরান ইতোমধ্যে ‘পারস্য উপসাগর প্রণালী কর্তৃপক্ষ’ বা পিজিএসএ গঠন করেছে। এই কর্তৃপক্ষ টোল আরোপের পাশাপাশি জাহাজ চলাচল নির্দিষ্ট জলপথে নিয়ন্ত্রণ করবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করে দিয়েছে, টোল ব্যবস্থা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্যেষ্ঠ কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ মন্তব্য করেন, ইরান হয়তো ‘অতিরিক্ত দরকষাকষি’ করছে। তার ভাষায়, ‘তারা নিজেদের কৌশলগত শক্তিকে প্রায়ই অতিমূল্যায়ন করে’।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নকভি শুক্রবার সকালে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করেন।
ধারণা করা হচ্ছে, পাকিস্তান যেকোনো সমঝোতায় চীনকে গ্যারান্টার হিসেবে যুক্ত করার চেষ্টা করতে পারে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ শনিবার বেইজিং সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে।
ইরান জোর দিয়ে বলছে, তারা আপাতত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা স্থগিত রাখতে চায় এবং তার বদলে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তেহরানের আশা, এর সঙ্গে ধাপে ধাপে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দকৃত ইরানি সম্পদ মুক্ত করা, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলায় হওয়া ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যতে শক্তি প্রয়োগ না করার নিশ্চয়তা যুক্ত হবে।
হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা এখন অন্যতম বড় বিরোধের বিষয়। পাকিস্তান জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে যৌথ নিয়ন্ত্রণের একটি পরিকল্পনা উত্থাপন করেছে।
এদিকে পাঁচটি উপসাগরীয় দেশ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে পিজিএসএর সঙ্গে সম্পৃক্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো হলো বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। তালিকায় ওমান নেই। তবে প্রস্তাব অনুযায়ী প্রণালীর দক্ষিণ অংশের দায়িত্ব ওমানের ওপর পড়ার কথা থাকলেও মাসকাট তেহরানের পরিকল্পনা নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
চিঠিতে পাঁচ দেশ সতর্ক করে বলেছে, ‘ইরানের প্রস্তাবিত রুট আসলে প্রণালীর জাহাজ চলাচল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা। নিজেদের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধ্য করে তারা টোল আদায়ের সুযোগ তৈরি করতে চায়।’
তারা আরও বলেছে, ‘ইরানের প্রস্তাবিত রুট ও পিজিএসএকে বিকল্প কাঠামো হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে তা বিপজ্জনক নজির তৈরি করবে।’
সুইডেনে ন্যাটোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে মার্কো রুবিও বলেন, ‘ইরান একটি টোল ব্যবস্থা চালু করতে চাইছে। তারা ওমানকেও একটি আন্তর্জাতিক জলপথে টোল ব্যবস্থায় যুক্ত করতে চাচ্ছে। বিশ্বের কোনো দেশেরই এটি মেনে নেওয়া উচিত নয়।’
তিনি হরমুজ প্রণালী খোলা রাখতে ইউরোপের নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্যের একটি বড় অংশই বৈশ্বিক তেলের দাম কমিয়ে রাখার কৌশলের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এ মুহূর্তে আলোচনার মূল লক্ষ্য সব ফ্রন্টে যুদ্ধের অবসান, যার মধ্যে লেবাননও রয়েছে। পারমাণবিক ইস্যু, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিংবা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে যে খবর প্রকাশ হচ্ছে, সেগুলো কেবল গণমাধ্যমের জল্পনা, বাস্তবভিত্তিক নয়।’
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ে কথা বলার পরই এসব জল্পনা শুরু হয়।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা সেটা নিয়ে নেব। আমাদের এটা দরকার নেই, আমরা এটা চাইও না। হয়তো হাতে পাওয়ার পর ধ্বংসও করে দেব। কিন্তু আমরা তাদের সেটা রাখতে দেব না।’
রাশিয়া ওই মজুত নিজেদের কাছে সংরক্ষণের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে ইরান জানিয়েছে, তারা দেশেই সেই মজুতের মাত্রা কমিয়ে ফেলবে।