ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২১ মে, ২০২৬ ০৯:৩৪ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৪ বার
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৫টি রিভারাইন প্যাট্রল ভেসেল (আরপিভি) সরবরাহের নিলামের আয়োজন করেছিল কোস্ট গার্ড। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় থেকেই কাজটি ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লি. (ডিইডব্লিউএল) এবং কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্স লি.কে দেওয়ার জন্য নিলামের আয়োজন সাজানো হয়েছিল।
জুলাই আন্দোলনের পর সেই ভেসেল সরবরাহের নিলাম আটকে যায়।
অন্তবর্তী সরকারের সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোস্ট গার্ডের জন্য ভেসেল সরবরাহের প্রস্তাবটি দুইবার উপস্থাপন করা হলেও তা অনুমোদন পায়নি।
অবশেষে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাসের মাথায় সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় প্রস্তাবটি অনুমোদন পায়।
বুধবার (২০ মে) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলনকক্ষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ওই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভা সূত্রে জানা যায়, ‘বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড-এর সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিস্থাপক জাহাজ সংগ্রহ (১ম সংশোধিত)’ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের জন্য ৫টি আরপিভি নির্মাণের লক্ষ্যে এক ধাপ দুই খাম দরপত্র পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হলে ৩টি দরপ্রস্তাব জমা পড়ে। তার মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লি. (ডিইডব্লিউএল) এবং কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্স লি. প্রকল্পটি বাস্তবায়নের অনুমোদন পায়।
এক হাজার ২১২ কোটি টাকায় কোস্ট গার্ডকে এই আরপিভি সরবরাহ করবে প্রতিষ্ঠান দুটি।
অভিযোগ রয়েছে, দুই বছর আগে থেকেই এই ভেসেল সরবরাহ করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করে আসছিল আলোচিত প্রতিষ্ঠান দুটি। তখনও টেন্ডার আহ্বান করা হয়। ২০২৪ সালের ২ জুন এই প্রকল্পের নিলামের নোটিশ দেওয়া হয়। তবে ওই বছরে ৯ জুলাই টেন্ডারে কিছু সংশোধনী আনা হয়। তাতে বলা হয়, নিলামের ক্লোজিং সময় ও তারিখ এবং ওপেনিং সময় ও তারিখ পরিবর্তন করে ১৫ জুলাই ২০২৪ এর পরিবর্তে ১৪ আগস্ট ২০২৪ করা হয়।
তবে ৫ আগস্টে সরকার পতনের পর ওই নিলাম আর অনুষ্ঠিত হয়নি। এরপর প্রথম দরপত্র আহ্বান করা হয় ২০২৫ সালের ৩ মার্চ।সেখানে দুটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র দাখিল করেছিল। ডিইডব্লিউএল-কেএসবিএল জেভি ও খুলনা শিপইয়ার্ড।
কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠান দুটির কোনোটিকেই কাজ দেওয়া হয়নি।
জানা গেছে, দরপত্রের প্রস্তাবটি ২০২৫ সালের ৭ মে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটিতে পাঠানো হয় এবং প্রস্তাবের ওপর ওই বছরের ১৩ মে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির (এসিসিজিপি) সভায় ডাব্লিউডি-১ প্যাকেজের আওতায় প্রকল্পের ডিপিপি সংশোধন করে পিপিআর, ২০০৮ এর বিধি ১১ অনুযায়ী নতুনভাবে ক্রয় কার্য পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ করার সুপারিশ করে।
২০২৫ সালের ১০ জুলাই আবার দরপত্র আহ্বান করা হয়। সেখানেও ওই দুটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র দাখিল করে।
সুপারিশকৃত দর প্রস্তাব এসিসিজিপিতে পাঠানোর জন্য সার-সংক্ষেপসহ নথিতে উপস্থাপন করা হলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী এসিসিজিপি সভার সিদ্ধান্ত অতি দ্রুত বাস্তবায়ন করার এবং প্রতিযোগিতার পথ উন্মুক্ত করার জন্য নিলামের শর্তগুলো সংশোধন করে পুনরায় নিলাম বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার জন্য কোস্ট গার্ড অধিদপ্তরকে অনুরোধ করে ২৯ সেপ্টেম্বর একটি পত্র দেয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ক্রয় প্রস্তাবটি এসিসিজিপিতে পেশ না করে ক্রয়কারীকে ফেরৎ পাঠানোর সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হয়ে দরদাতা প্রতিষ্ঠান ডিইডব্লিউএল-কেএসবিএল জেভি পিপিআর ২০০৮ এর ৫৭ বিধি অনুযায়ী রিভিউ প্যানেল বরাবর আপিল করে এবং আপীল রিভিউ প্যানেলের নিকট মঞ্জুর হয়।
সবশেষ আলোচ্য প্রকল্পের ক্রয় প্রস্তাব চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটিতে ২য় বার পাঠানো হয় এবং প্রেরিত প্রস্তাবের ওপর গত ২১ জানুয়ারি এসিসিজিপি কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় নতুনভাবে ক্রয় কার্য পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের সুপারিশ করা হয়। সে প্রেক্ষিতে ৩য় বার দরপত্র আহ্বান করা হয়। এবার দরপত্র জমা দেয় তিনটি প্রতিষ্ঠান। ডিইডব্লিউএল-কেএসবিএল জেভি, খুলনা শিপইয়ার্ড ও চিটাগং ড্রাইডক লি.।
গত ২১ জানুয়ারি এসিসিজিপি কমিটির সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৩য় বার দরপত্র আহ্বান করে টিইসি কর্তৃক সুপারিশকৃত প্রতিষ্ঠান ডিইডব্লিউএল-কেএসবিএল জেভি এর প্রস্তাবটির অনুমোদনে জন্য সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপনের জন্য গত ১৪ মে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়।
অবশেষে বুধবার ডিইডব্লিউএল-কেএসবিএল জেভি সর্বনিম্ন দরে দরপত্র দাখিল করায় কাজটির অনুমোদন পায়।
জানা গেছে, ডিইডব্লিউ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি প্রতিষ্ঠান এবং কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্স লি. ইঞ্জিনিয়ার আবদুর রশিদের মালিকানাধীন একটি বেসরকারি জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের কোস্ট গার্ডের তৎকালিন মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল এরশাদের সঙ্গে ঘনিষ্টতা ছিল ইঞ্জিনিয়ার রশিদের। এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল তারিক সিদ্দিকীর সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল তার।
ওই সময় থেকেই শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি দরপত্র প্রক্রিয়া নিজেদের অনুকূলে নিতে চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ সোহায়েল ও ব্যবসায়ী এসএস ফারুকী হাসানকে সঙ্গে নিয়ে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন ইঞ্জিনিয়ার রশিদ। মোহাম্মদ সোহায়েল বর্তমানে আটক রয়েছেন। সোহায়েলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, জোরপূর্বক গুম এবং হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, গত ৫ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট অনুবিভাগ থেকে ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের কতিপয় ব্যয় স্থগিত/হ্রাসকরণ’ সংক্রান্ত ওই পরিপত্র জারি করা হয়। পরিপত্রের (৬) নম্বর নির্দেশনায় বলা হয়, ‘সব ধরনের যানবাহন ক্রয় (‘৪১১২১০১-মোটরযান’, ‘৪১১২১০২-জলযান’, ‘৪১১২১০৩-আকাশযান’) খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় বন্ধ থাকবে।’ অভিযোগ রয়েছে, এ ধরনের একটি পরিপত্রের নির্দেশনা থাকার পরও জলযান কেনার জন্য তড়িঘড়ি করে কাজ দিতে দেখা যায়।