ঢাকা, বুধবার, ০৬ মে ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

সীমান্ত, তিস্তা ও কূটনীতিতে নতুন প্রশ্ন

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ৬ মে, ২০২৬ ১০:১৮ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২১ বার


সীমান্ত, তিস্তা ও কূটনীতিতে নতুন প্রশ্ন

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের পতন হয়েছে।

এর ফলে বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারতের বেশিরভাগ রাজ্যই বিজেপি সরকারের অধীনে চলে গেল। আর এই ঘটনায় বাংলাদেশে নানা শঙ্কা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়, এর ফলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না।

 

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগেই সেখানকার বেশ কয়েকজন দলীয় নেতা বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন।

বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর কথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ বিতাড়নের বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। এছাড়া কয়েকদিন আগে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাও বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন।

এ নিয়ে বাংলাদেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের চারপাশে ভারতের রাজ্যগুলোতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে এখন জল্পনা-কল্পনা চলছে। বিশেষজ্ঞরাও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি সরকারকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

 

প্রতিবেশী রাজ্যে বিজেপির আধিপত্য
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী ভারতের বেশিরভাগ রাজ্যেই বিজেপি ক্ষমতায় চলে এসেছে। প্রতিবেশী ত্রিপুরা ও আসামে আগেই বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। এছাড়া মেঘালয়ে বিজেপি-সমর্থিত সরকার রয়েছে। প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীরা বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য দিয়ে আসছেন। এ নিয়ে বাংলাদেশ সরকার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সম্প্রতি বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। এ প্রেক্ষিতে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পবন বাধেকে তলব করে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

তিস্তা চুক্তিতে নতুন আশার আলো নাকি হতাশা?
ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিতে দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাধা দিয়ে আসছিলেন। তবে এখন পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। কেন্দ্রীয় সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ উভয় জায়গাতেই বিজেপি ক্ষমতায় আসায় দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তিস্তা চুক্তি নিয়ে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তবে বিজেপির নীতিতে তিস্তা ইস্যু কতটা প্রাধান্য পাবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওবায়দুল হক বলেন, তিস্তা চুক্তি বিজেপি সরকার করবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তারা কখনোই তিস্তা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশকে নিশ্চিত কোনো আশ্বাস দেয়নি। এখন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরও এই চুক্তি নিয়ে খুব বেশি আশা করা যায় না।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, তিস্তা চুক্তি পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের আমলে হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নেবে ভারত।

সীমান্তে নিরাপত্তা ও অভিবাসন
বিজেপির ইশতেহারে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় নজরদারি আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বিজেপি-শাসিত ভারতের প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতে নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) এবং ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস (এনআরসি) সংক্রান্ত রাজনৈতিক আলোচনা নতুন করে সামনে আসতে পারে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে হবে। কারণ বিজেপি নেতারা আগে থেকেই কথিত বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর কথা বলেছেন।

দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও ট্রানজিট
বাণিজ্য ও ট্রানজিটের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের দীর্ঘদিন ধরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছিল। তবে এখন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে এই জটিলতা কিছুটা কমে যেতে পারে। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর ট্রানজিট ও ব্যবসা-বাণিজ্য আরও সহজতর হতে পারে।

পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব পড়বে না
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারতের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের ফলাফল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো পরিবর্তন আনবে না; বরং ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অনুযায়ী ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় থাকবে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, ভারতের নির্বাচন ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার, ওদের গণতন্ত্রের ব্যাপার। কিন্তু আমাদের একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে যেহেতু বাংলাদেশে অনেকদিন পরে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশে। আমরা সবসময় যে রকম বলে আসছি যে, আমাদের দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক; সেরকমই আমরা চাইব যে, আমাদের আশেপাশের ভারতসহ সকল দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক এবং গণতন্ত্রের বিজয় হোক।

তিনি আরও বলেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, আমাদের ওদের সাথে পানির ইস্যু আছে, পুশব্যাকের যে ইস্যু আছে; আরও অনেক ইস্যু আছে, সে ইস্যুগুলো তো আমাদের রয়েই যাচ্ছে। যে সরকারই আসুক না কেন বা থাকুক না কেন, তাদের সাথে আমাদের আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলেছেন
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. ওবায়দুল হক বলেন, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক নেতারা অনেক বক্তব্য দেন, তবে সেগুলো অনেক সময়ই রাজনৈতিক বক্তব্য হয়ে থাকে। বাংলাদেশ নিয়ে তাদের প্রকৃত অবস্থান বোঝার জন্য কিছুটা সময় লাগবে।

তিনি আরও বলেন, পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী কে হচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক কিছুই তার ওপর নির্ভর করে।

তিস্তা চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিজেপি কখনোই এ বিষয়ে স্পষ্ট আশ্বাস দেয়নি, তাই খুব বেশি প্রত্যাশা করার সুযোগ নেই।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসায় তিস্তা চুক্তিতে কিছুটা অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কারণ তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এতদিন এতে বাধা হয়ে ছিলেন। তবে একই সঙ্গে পুশব্যাকের ঝুঁকিও রয়েছে।

তিনি বলেন, বিজেপির নেতা শুভেন্দু অধিকারী আগে থেকেই বাংলাদেশ ও মুসলিমবিরোধী বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন। তিনি কথিত অবৈধ বাংলাদেশিদের তাড়ানোর কথা বলেছেন। এটি উদ্বেগের বিষয়। তবে নির্বাচনের পর তারা বাস্তবে কী করে, সেটি দেখার বিষয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের প্রেক্ষিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল এবং এর ফলে সম্ভাব্য পুশইন পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

তিনি বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর যদি কোনো ধরনের পুশইনের ঘটনা ঘটে, তবে বাংলাদেশ সরকার সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।

ভারতীয় গণমাধ্যমের বিশ্লেষণ
ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোতে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিজয়কে শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং কৌশলগত রাজনৈতিক বিস্তার হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে বিজেপির শক্ত অবস্থান কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিকে আরও সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করবে। বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব নীতি এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় একধরনের ‘একক রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে একই সঙ্গে ভারতীয় গণমাধ্যমের একাংশে এও উল্লেখ করা হচ্ছে যে, এই পরিবর্তন প্রতিবেশী বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কারণ, বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থান অনেক সময় ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ ও কঠোর অভিবাসন নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে এমন নীতির প্রয়োগ বাড়লে ‘অবৈধ অভিবাসন’ ইস্যুতে উত্তেজনা, পুশব্যাক বা সীমান্তে কড়াকড়ি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। ফলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বাস্তবতায় নতুন করে সংবেদনশীলতা তৈরি হতে পারে বলে বিশ্লেষণে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।


   আরও সংবাদ