ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৩ মে, ২০২৬ ০৯:৫২ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২১ বার
আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছর সরকারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে বাড়বে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ।
রাজস্ব ঘাটতি বৃদ্ধি ও জ্বালানি সংকটের কারণে এই চাপ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও সরকার পরিকল্পনা করছে, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ চাঙা করতে এ বছর অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ কম নেওয়া হবে।
ফলে বাজেটের ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক ঋণ নির্ভরতা বাড়বে।
অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ খাতে সরকারের ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। যা চলতি ২০২৫-২৬ বছর শেষে দাঁড়াবে ৪.৮০ বিলিয়ন ডলারে।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছে। অর্থবিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশের মতো, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। অথচ বাংলাদেশের মতো সমমানের দেশগুলোর কর জিডিপির অনুপাত এর দ্বিগুণের বেশি। ভারতের কর জিডিপি অনুপাত রাজ্যভেদে ১২-১৯ শতাংশের বেশি।
শ্রীলঙ্কার মতো দেশেরও কর জিডিপি অনুপাত ১২ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশের কর জিডিপি ৭ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের বাজেট ঘাটতিও বেশি। যা সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এজন্য আসছে ২০২৬-২৭ বছর রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোনো প্রকার শৈথিল্যতাকে পাত্তা না দিতে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
কিন্তু চলমান ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ সরকারকে নতুন করে চিন্তায় ফেলেছে রাজস্ব খাতসহ সামগ্রিক অর্থনীতির বিষয়ে। সূত্র জানায়, আগামী বছরের মধ্যে এ চাপ আরও বাড়বে। কেননা সরকারের নেওয়া বড় বড় ঋণগুলোর গ্রেস পিরিয়ড এরই মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। তখন চলমান ঋণগুলোর সঙ্গে আরও এসব নতুন ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে। ফলে ২০২৯-৩০ অর্থবছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ সর্বোচ্চ প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে। সেই হিসেবে ৫ বছর মেয়াদের প্রায় পুরো সময়টাই বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের প্রচণ্ড চাপ নিয়েই চলতে হবে বর্তমান বিএনপি সরকারকে।
এ সময়ের মধ্যে (২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে ২০২৯-৩০) বাংলাদেশকে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে ১৮.৩৮ বিলিয়ন ডলার ঋণের আসল এবং ৭.৬ বিলিয়ন ডলার সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হবে। আবার ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে ২০৩৪-৩৫ অর্থবছর সময়কালে এ পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৫২ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের পর নতুন এক পরিস্থিতিতে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আসায় বিএনপির ওপর সব ধরনের আর্থিক চাপ বেড়েছে। এই চাপকে উসকে দিয়েছে ইরান-ইসরায়েল ও আমেরিকার যুদ্ধ।
কেননা বৈশ্বিক সংকট বৃদ্ধির কারণে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতেও টান লেগেছে। যা বাংলাদেশের মতো ছোট অর্থনীতির দেশগুলোতে আরও বেশিতে ফেলেছে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, ঋণ পরিশোধের চাপ তো বাড়বেই, একই সঙ্গে সরকার যদি বাজেট ঘাটতি মেটাতে আরও বেশি বিদেশি ঋণ নেয়, তাহলে চাপ আরও বাড়বে। আবার দেশীয় উৎস থেকে ঋণ নিয়ে ঘাটতি মেটালে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে সরকারকে রাজস্ব আদায়ের প্রতি আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে। এদিকে বৈশ্বিক সংকট আরও কতটা বাড়তে পারে তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে আসছে বছরটা যে অর্থনীতির জন্য আরও সংকটময় হবে- সে বিষয়ে এরই মধ্যে সতর্ক করেছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক। এজন্য অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির প্রতি জোর দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্য সংকটের মোকাবিলায় মজুত বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশ প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করেছে। কিন্তু সম্প্রতি ঋণ নেওয়ার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ও গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ায় এবং অনুদান কমে যাওয়ায় আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হবে ২৬ বিলিয়ন ডলার। যা দেশের অর্থনীতিতে চাপ বাড়াবে বহুগুণ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময়ে এই বাড়তি দায় সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর এক ধরনের অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
এজন্য সরকারকে বলছে, নতুন ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ায় আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। যা সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে এখন থেকেই। এজন্য অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ভিতকে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নাই বলে মনে করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
অর্থবিভাগ বলছে, বিগত সরকারের নেওয়া উচ্চ ব্যয় সংবলিত অনেকগুলো মেগা প্রকল্প বৈদেশিক ঋণের এই ফাঁদ তৈরি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে- রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই এক প্রকল্পেই সরকারের নেওয়া ঋণের পরিমাণ ১১.৩ বিলিয়ন ডলাল। এ ছাড়া রয়েছে পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা মেট্রোরেল, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্প, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ এবং যমুনা রেলওয়ে সেতু প্রকল্প।
এসব প্রকল্পে যে পরিমাণ ব্যয় করা হয়েছে তা পৃথিবীর যে কোনো দেশোর তুলনায় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক বেশি ব্যয় দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ অতিমূল্যায়িত মেগা প্রকল্পগুলোই সরকারের এই অতিরিক্ত বৈদেশিক দায় সৃষ্টির নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। এর জন্য আরও দায়ী হচ্ছে- সরকারের দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা। বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে যাওয়া। বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে না পারা। এগুলোই এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
সৌজন্যে: বাংলাদেশ প্রতিদিন