ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

অলস সময় বাইক পট্টির কর্মচারীদের

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:৫৫ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২ বার


অলস সময় বাইক পট্টির কর্মচারীদের

ঢাকা: যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জ্বালানি তেল সরবরাহে বৈশ্বিক সংকটের প্রভাবে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় মোটরসাইকেল চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রায় ৮০ শতাংশ চালক এখন বাইক ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে গ্যারেজ ও যন্ত্রাংশ ব্যবসায়।

 

এরই ফলশ্রুতিতে রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকার পরিচিত ‘বাইক পট্টি’ এখন অনেকটাই নীরব। এই এলাকায় মোটরসাইকেল গ্যারেজ ও যন্ত্রাংশের দোকান মিলিয়ে ৪০০-এরও বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

প্রতিটি দোকানে গড়ে ৫ থেকে ১২ জন কর্মচারী কাজ করলেও বর্তমানে তাদের অনেককেই অলস সময় পার করতে হচ্ছে।

 

গ্যারেজ মালিকরা বলেন, সম্প্রতি তেল সরবরাহ নির্বিঘ্ন করতে সরকার উদ্যোগ নিলেও এর আগে যে সংকট দেখা দেয়, তারপর থেকেই রাস্তায় বাইক চলাচল কমে যেতে থাকে, কমতে থাকে কাজেরও চাপ।

এর সঙ্গে আবার সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দামও বাড়ানো হয়েছে। ফলে আগে যেখানে সারাদিন ব্যস্ততা থাকতো, এখন অনেক সময় কোনো কাজই থাকে না।

এতে আয় কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা।

 

তাদের ভাষ্যে, এই বাইক পট্টিতে ঢাকার বাইরে থেকেও শত শত লোক আসতো কাজ করানোর জন্য। কিন্তু সরবরাহ সংকটের পর থেকে এই গলি ফাঁকা থাকছে। এমনকি কাজকর্ম অনেক কমে গেছে। গলির মধ্যে এক সময় গাড়ি রাখার জায়গা থাকতো না, এখন প্রায়ই থাকে ফাঁকা।

তাদের অভিযোগ, যে সমস্ত মিস্ত্রি বা কর্মচারী প্রোডাকশনের কাজ করেন, তারা এই কাজ বাদ দিয়ে অন্য কাজে চলে যাচ্ছেন। কারণ কর্মহীনতায় তাদের সংসার থমকে যাচ্ছে।

মহাখালী থেকে বাইকপট্টিতে মোটরসাইকেল মেরামত করতে এসেছেন মোহাম্মদ রেজাউল করিম। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে এখানকার গ্যারেজে কাজ করাই। আগে এখানে প্রচণ্ড ভিড় থাকতো, সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষা করতে হতো। কিন্তু এখন এসে দেখি একেবারেই ভিন্ন চিত্র—ভিড় নেই, সহজেই কাজ করানো যাচ্ছে।

অলস সময় কাটছে বাইক পট্টির মিস্ত্রিদের। ছবি: বাংলানিউজ

এই বাইক পট্টির ‘পৃথিবী মোটর্স’র মালিক মো. ওবায়দুল হক জানান, তার দোকানে ১২-১৪ জন কর্মচারী ছিল, কিন্তু সংকট দেখা দেওয়ার পর কয়েকজনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কারণ আগের তুলনায় এখন আর কাজ নেই বললেই চলে। 

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, “এভাবে যদি চলতে থাকে, তাহলে আরও কর্মচারী বাদ দিতে হবে। আর আমাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে কীভাবে, বুঝে উঠতে পারছি না।”

“অনেক বছর যাবত আমার এখানে কাজ করেন অনেক মিস্ত্রি, হেলপারও আছে, যারা আমার গ্যারেজ ও আমার পরিবারের সদস্যর মতোই, যত কষ্ট হোক তাদের আমি টিকিয়ে রাখবো ইনশাআল্লাহ।”

সরকারপ্রধানের কাছে দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন হলে আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও অনেক উপকার হবে।

‘পৃথিবী মোটর্স’র জ্যেষ্ঠ মিস্ত্রি হিরণ সরকারের ভাষ্যে, বেশ কিছু দিনের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও তেলের সংকট তাদের কাজে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। অনেক মোটরসাইকেল চালক তেল না পাওয়ায় গাড়ি চালাচ্ছেন না। আর গাড়ি না চললে তাদের কাজও থাকে না। সব মিলিয়ে তারা এখন বড় ধরনের সংকটে পড়েছেন।

হিরণ সরকার বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকেই এই কাজ শিখে আসছি, লেখাপড়া তেমন জানি না। এখন যদি বেকার হয়ে পড়ি, অন্য কোনো কাজও করতে পারব না। এতে আমাদের সংসার চালানো অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়বে। সরকার যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে শত শত মেকার বেকার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

মিরপুর বাইক পট্টির সাবরিনা অটোর সিনিয়র সেলসম্যান মোহাম্মদ খোরশেদ আলম জানান, তেল সংকটের পর থেকে মোটরসাইকেলের কাজকর্ম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর প্রভাবে অনেক ধরনের ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশের বিক্রিও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে এসেছে। প্রতিদিনই ব্যবসা আরও নিম্নমুখী হচ্ছে।

অলস সময় কাটছে বাইক পট্টির মিস্ত্রিদের। ছবি: বাংলানিউজ

তিনি বলেন, “এভাবে পরিস্থিতি চলতে থাকলে দোকান ভাড়া ও কর্মচারীদের বেতন দেওয়া আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। যত দ্রুত তেলের সংকট কাটবে, আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ততই উপকার হবে।”

এমন পরিস্থিতি কখনো দেখেননি বাইক পট্টির ‘বাইকার্স স্কয়ার’র সার্ভিস সেন্টারের ম্যানেজার মোহাম্মদ আল-আমিনও। দোকানটি আট বছর ধরে পরিচালনা করছেন তারা। কিন্তু গত দুই মাস ধরে কাজ প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে।

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, “এভাবে যদি আরও এক-দুই মাস পরিস্থিতি চলতে থাকে, তাহলে দোকান ভাড়া ও কর্মচারীদের বেতন দেওয়া এবং ব্যবসা টিকিয়ে রাখা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।”

প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ কমে যাওয়ার দাবি করেছেন বাইক পট্টির বিসমিল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং অটোর মালিক মোহাম্মদ রিপন খান। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, “যে ৩০ শতাংশ কাজ আছে, তা মূলত পরিচিত গ্রাহকদের ছোটখাটো কাজ। আগে যে পরিমাণে কাজ আসত, এখন তা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। পাঠাও বাইকারদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি কমে গেছে। এভাবে তেলের সংকট যদি আরও কিছুদিন চলতে থাকে, তাহলে আমাদের লেদ মেশিন বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।”

হানিফ অটোর মালিক মোহাম্মদ হানিফ চোখে আরও অন্ধকার দেখছেন। তিনি গত মাসে ঋণ করে দোকান ভাড়া পরিশোধ করেছেন। এ মাসেও একই পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে। এভাবে যদি আরও দুই-চার মাস চলতে থাকে, তাহলে ব্যবসা বন্ধ করে বসে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না তার।

তিনি বলেন, “দুই মাস ধরে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও তেলের সংকটের কারণে ব্যবসা প্রায় নেই বললেই চলে।”

বাইকার্স স্কয়ার হোন্ডা সার্ভিস পয়েন্টের হেড মিস্ত্রি মো. রাকিব হোসেনের নেতৃত্বে একসঙ্গে ১০-১৫টি মোটরসাইকেলের কাজ চলতো আগে। কিন্তু তেল সরবরাহে সংকটের কারণে এখন তারা প্রায় বসেই থাকছেন। রাস্তায় গাড়ি কম চলায় মেরামতের জন্যও খুব কম বাইক আসছে।

অলস সময় কাটছে বাইক পট্টির মিস্ত্রিদের। ছবি: বাংলানিউজ

রাকিব হোসেন বলেন, সব পেট্রোল পাম্পের তেল মানসম্মত না হওয়ায় বাইকাররা যেখান থেকে যখন যেভাবে পারছেন, সেখান থেকেই তেল সংগ্রহ করছেন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে লুজ তেল বা অনিয়মিত উৎস থেকেও মোটরসাইকেলে তেল নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে কার্বুরেটর নষ্ট হচ্ছে, গাড়ির গতি কমে যাচ্ছে এবং ট্যাংকিতে ময়লা জমে যাচ্ছে। পাশাপাশি রিং, পিস্টন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সব মিলিয়ে মোটরসাইকেলে তেল খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং ইঞ্জিনের শক্তি ও কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে।

এভাবে অলস সময় যাওয়ায় শঙ্কা জানিয়ে তিনি বলেন, পরিস্থিতি যদি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে আমাদের চাকরির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়েই আমরা অনিশ্চয়তায় ভুগছি।

বাইকের কাজ করতে আসা মো. ইয়াজত আলী বাবু বাংলানিউজকে বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিন পর থেকেই নিয়মিত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। তেল নিতে সিরিয়ালে দাঁড়াতে হচ্ছে এবং অনেক সময় সব জায়গায় মানসম্মত তেলও পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে অনেককে অনিয়মিত বা নিম্নমানের তেল কিনতে হচ্ছে। 

এর ফলে গাড়ির কার্বুরেটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে, ইঞ্জিনের টান কমে যাচ্ছে এবং নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। মিস্ত্রিদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিম্নমানের তেলের কারণে এসব সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।

তেলের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এই খাতের সঙ্গে জড়িত হাজারো শ্রমিকের জীবিকা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


   আরও সংবাদ