ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

ডলারের আধিপত্যকে লক্ষ্যবস্তু করছে ইরান ও চীন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক


প্রকাশ: ৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১৬:২৩ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৬ বার


ডলারের আধিপত্যকে লক্ষ্যবস্তু করছে ইরান ও চীন

নতুন কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যে বুধবার দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে এই যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলেছে।

এই পরিস্থিতিতে ইরান ও চীন সুযোগটি কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার একটি অভিন্ন সমস্যাকে সামনে আনতে উদ্যোগী হয়েছে।

 

তাদের যৌথ লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটানো।

 

বছরের পর বছর ধরে তারা অভিযোগ করে আসছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্যকে ব্যবহার করে ওয়াশিংটন প্রতিপক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর প্রভাব খাটায় এবং চাপ সৃষ্টি করে, যার মধ্যে ইরান ও চীনও রয়েছে।

বিশ্ব তেলবাজারে ডলারের আধিপত্য বিশেষভাবে স্পষ্ট।

২০২৩ সালে জেপি মরগান চেজের এক হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৮০ শতাংশ লেনদেন এই মুদ্রায় সম্পন্ন হয়।

 

হরমুজ প্রণালীর দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।

এই প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণের প্রেক্ষাপটে তেহরান ও বেইজিং চীনা ইউয়ানকে ডলারের বিকল্প হিসেবে তুলে ধরার একটি সুযোগ খুঁজে পেয়েছে।

 

ইরানি কর্মকর্তাদের বাস্তবিক ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থার আওতায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর কাছ থেকে ইউয়ানে পারাপারের ফি নেওয়া হচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যা চীন-ইরান অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও গভীর হওয়ার সাম্প্রতিক উদাহরণ।

কতগুলো জাহাজ ইউয়ানে অর্থ পরিশোধ করেছে তা স্পষ্ট নয়, তবে ২৫ মার্চ পর্যন্ত অন্তত দুটি জাহাজ তা করেছে বলে লয়েডস লিস্ট জানিয়েছে।

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এই তথ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে, যা ইউয়ানে লেনদেনের বিষয়টি নিশ্চিত করার ইঙ্গিত দেয়।

শনিবার জিম্বাবুয়েতে ইরানের দূতাবাস এক পোস্টে বলেছে, বৈশ্বিক তেলবাজারে ‘পেট্রোইউয়ান’ যুক্ত করার সময় এসেছে।

বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় দুই সপ্তাহের জন্য প্রণালীতে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার ঘোষণা দিলেও তেহরান ও বেইজিং এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে সাড়া দেয়নি।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফ আল জাজিরাকে বলেন, ‘একদিক থেকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে বিদ্রূপ করতে চাইছে, ক্ষতের ওপর লবণ ছিটানোর মতো।’

তিনি আরও বলেন, ‘আরেক দিক থেকে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এবং মিত্র চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে ইরান ইউয়ানকে গুরুত্ব দিচ্ছে। চীন ধীরে ধীরে নিজের ও ব্রিকস দেশগুলোর বাণিজ্য ইউয়ানে রূপান্তরের চেষ্টা করছে।’

একটি ‘বহুমেরু’ আর্থিক বিশ্ব
তেহরান ও বেইজিংয়ের জন্য ইউয়ানের ব্যবহার একটি দ্বিমুখী লাভ। এই মুদ্রার ব্যবহার তাদের ডলার-নির্ভর আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে সাহায্য করে।

এটি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যকে সহজ ও সাশ্রয়ী করে, যা ২০২১ সালে স্বাক্ষরিত ২৫ বছরের ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ চুক্তির পর থেকে দ্রুত বেড়েছে।

যুক্তরাজ্যের কিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক বুলেন্ট গোকাই বলেন, ‘ইরান স্পষ্টভাবে বোঝে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক আধিপত্যের চ্যালেঞ্জের গুরুত্ব এবং ডলার ব্যবস্থার পাশাপাশি পেট্রোডলারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।’

Dollar-Yuan


চীনের জন্য এই উদ্যোগটি এমন একটি ‘বহুমেরু আর্থিক বিশ্ব’ গঠনের লক্ষ্যকে এগিয়ে নেয়, যেখানে উদীয়মান শক্তিগুলোর প্রভাব বাড়ার মাধ্যমে ডলারের একক আধিপত্য কমে আসবে।

চীন ইরানের তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনে থাকে এবং ধারণা করা হয়, এই লেনদেনের বড় অংশই ইউয়ানে সম্পন্ন হয়।

অন্যদিকে, ইরান চীন থেকে বিপুল পরিমাণ যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম, রাসায়নিক পদার্থ এবং শিল্প উপাদান আমদানি করে।

ডেটা বিশ্লেষণকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে তেল প্রবাহ প্রায় আগের মতোই রয়েছে।

সংঘাতের প্রথম দুই সপ্তাহে ইরান ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৩৭ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে, যার বেশিরভাগই গেছে চীনে।

চীন বহুদিন ধরেই ডলারের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করার লক্ষ্য পোষণ করে আসছে। ২০২৪ সালে এক ভাষণে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইউয়ানকে একটি সাধারণ মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রার মর্যাদা অর্জনের আশা প্রকাশ করেন।

কঠিন পথ সামনে
তবে ইউয়ান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অগ্রগতি করলেও ডলারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এটি এখনও অনেক পিছিয়ে।

ডলারের মতো ইউয়ান পুরোপুরি রূপান্তরযোগ্য নয়, কারণ চীনে কঠোর মূলধন নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো সহজে এটিকে অন্য মুদ্রায় বদলাতে বা সীমান্তের বাইরে স্থানান্তর করতে পারে না।

চীনা সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণও ইউয়ানের গ্রহণযোগ্যতা কমিয়েছে, কারণ এতে বাজারের স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

যদিও বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে ডলারের অংশ ধীরে ধীরে কমছে, তবুও এটি এখনও সবচেয়ে প্রভাবশালী মুদ্রা।

আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বৈশ্বিক রিজার্ভের ৫৭ শতাংশ ছিল ডলারে, যেখানে ইউরোর অংশ ছিল প্রায় ২০ শতাংশ এবং ইউয়ানের মাত্র ২ শতাংশ।

২০২৪ সালে সীমান্তপারের বাণিজ্যের মাত্র ৩.৭ শতাংশ ইউয়ানে সম্পন্ন হয়েছে, যা ২০১২ সালে ১ শতাংশেরও কম ছিল।

হংকংভিত্তিক ন্যাটিক্সিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো বলেন, এটি বিশ্বকে পুরোপুরি ‘ডি-ডলারাইজ’ করবে না। তবে এটি ধীরে ধীরে বিকল্প ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক করে তুলবে।

তিনি বলেন, ডলার নির্ভরতা কমাতে গেলে উপসাগরীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণ প্রয়োজন, যারা ১৯৭০-এর দশক থেকে তেলের দাম ডলারে নির্ধারণ করে আসছে।

ডলারের আধিপত্যে ধীরে ধীরে ক্ষয়
চীন হয়তো ডলারের সমকক্ষ হতে না পারলেও ইরানের জন্য তা খুব বড় বিষয় নয়।

ব্রাসেলসভিত্তিক ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল ইকোনমির পরিচালক হোসুক লি-মাকিয়ামা বলেন, ‘চীন প্রায় পুরো ইরানি তেলই কিনে নেয় এবং ইরান তার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও সেখান থেকেই পায়।’

তিনি বলেন, ইউরোপ বা জাপানের মুদ্রা অতীতে ডলারকে সরাতে পারেনি, কারণ তারা তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সব প্রয়োজন মেটাতে পারেনি। কিন্তু চীন বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদন কেন্দ্র হওয়ায় এই ক্ষেত্রে অনেক বেশি সক্ষম।

ডিফারেন্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ড্যান স্টেইনবক বলেন, স্বল্পমেয়াদে ডলারের আধিপত্যে বড় পরিবর্তন না এলেও ইউয়ানের ব্যবহার ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট খাতে মার্কিন প্রভাব কমাতে পারে। এটি হঠাৎ পরিবর্তন নয়, বরং ধীরে ধীরে ক্ষয়।

হার্ভার্ডের অধ্যাপক রোগফ বলেন, ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে যুদ্ধের পরিণতির ওপর। যদি ইরান ও চীন সফল হয়, তাহলে অনেক দেশ ডলার নির্ভরতা কমাতে উৎসাহিত হবে, যাতে তারা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এড়াতে পারে।

তিনি বলেন, তবে যদি যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জন করে, যা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়; তাহলে ডলারের আধিপত্য আরও কিছুদিন টিকে থাকবে।

=> জন পাওয়ার আল জাজিরা ইংলিশ অনলাইনের এশিয়া বিজনেস এডিটর। তিনি ২০১০ সাল থেকে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রতিবেদক ও সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন।


   আরও সংবাদ