ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ০৯:৫৯ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৬ বার
ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসন জিতে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। নতুন বিএনপি সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেমন হবে, তা নিয়ে নানা আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে। অবশ্য নির্বাচনের আগে ও পরে ভারত বিএনপির সঙ্গে ‘গভীর সম্পর্ক’ গড়ার বার্তা দিয়েছে।
অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে নানা সমালোচনা আছে।
সেই সময়ের দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব সে সম্পর্ককে ‘সোনালী অধ্যায়’ হিসেবে চিহ্নিত করে। তবে গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে তীব্র টানাপোড়েন শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এক পর্যায়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। দুই দেশের কূটনীতিককে দফায় দফায় তলব ও পাল্টা তলবের ঘটনাও ঘটে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেমন হবে, তা নিয়িই আলোচনা চলছে।
তারেক রহমানকে নিয়ে ভারতের ইউটার্ন:
অতীতে বিএনপি ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শীতল ছিলো। ২০১৪ সালে কংগ্রেসের পরাজয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদি দায়িত্ব নেন। আর কংগ্রেসের সাথে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক সম্পর্ক ছিলো।
ভারতের বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরই বিএনপি নেতা তারেক রহমান দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী ছিলেন। তবে আওয়ামী লীগ এক পর্যায়ে মোদী সরকারের সঙ্গেও সুসম্পর্ক গড়তে সক্ষম হয়। আর সে সময় অনেকটাই আওয়ামী লীগ সরকারের চাপে বিএনপি ও তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়ন হয়নি। তবে এখন প্রেক্ষাপট বদলেছে। অতীতে তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে না চাইলেও এখন ভারত তার সঙ্গেই সম্পর্ক গভীর করতে আগ্রহী।
এটাকে এখন ইউটার্ন বলা চলে।
দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই বৈদেশিক নীতি:
বিএনপির বিজয়ের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে দলের শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের কাছে প্রশ্ন রাখা হয়- বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কেমন হবে? এই প্রশ্নের উত্তরে তারেক রহমান খুব স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, বাংলাদেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় সব দেশের জন্য একই বৈদেশিক নীতি।
সে সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, পারস্পরিক স্বার্থ, হস্তক্ষেপ না করার নীতি এবং কৌশলগত স্বশাসনের ভিত্তিতে হবে।
শেখ হাসিনাকে নিয়ে বিএনপির অবস্থান:
গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থানকে বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কে কাঁটা হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন অনেক বিশ্লেষক। অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়েই শেখ হাসিনাকে ফেরানো নিয়ে দুই দেশের মধ্যে তীব্র টানাপোড়েনও চলেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে রেখেই বিএনপি সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেমন হবে। এ বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে ফেরত না পাঠালেও দুই দেশের সম্পর্কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হবে না।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, শেখ হাসিনা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন। তাকে শাস্তি দেওয়ার জনদাবি রয়েছে। আমরা মনে করি, ভারতের উচিত তাকে আমাদের কাছে হস্তান্তর করা। কিন্তু শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে না পাঠালেও তা বাণিজ্য সম্পর্কসহ বৃহত্তর সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা হবে না। আমরা আরও ভালো সম্পর্ক গড়তে চাই।
নির্বাচনের আগেও বার্তা ছিলো দিল্লির:
এবারের নির্বাচনের আগেই বিএনপির দিকে অনেকটাই ঝুঁকে পড়েছিলো দিল্লি। ভারতের প্রধান রাজনৈতিক মিত্র আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারায় তাদের সামনে বিএনপির কোনো বিকল্পও ছিলো না। বিএনপি চেয়াপারসন বেগম খালেদা জিয়া মারা গেলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় আসেন। বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানকে পাঠানো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বার্তা পৌঁছে দেন এস জয়শঙ্কর। তারেক রহমানের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত বৈঠকও করেন তিনি। সেই বৈঠকেই তিনি বিএনপির সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক গভীর করার বার্তা দেন।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন:
ভারতের সঙ্গে বিএনপি সরকারের সম্পর্ক কেমন হবে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওবায়দুল হক বাংলানিউজকে বলেন, অতীতে ভারতের সঙ্গে বিএনপির একটি শীতল সম্পর্ক ছিলো। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার কোনো বিকল্প নেই। তবে অতীতে আমরা দেখেছি, নানা ইস্যুতে ভারত বাংলাদেশকে চাপে রেখেছে। এই চাপ সব সরকারের আমলেই ছিল। অথচ এমন চাপ কিন্তু ভারত অন্য প্রতিবেশী দেশগুলোকে দিতে পারে না। যেমন নেপাল ভুটানকেও দিতে পারে না। এখন দুই দেশের সম্পর্ককে চাপমুক্ত করার সুযোগ এসেছে। আমি আশা করি, বিএনপি ভারতের সঙ্গে চাপমুক্ত সম্পর্ক বজায় রাখতে সফল হবে।
নরেন্দ্র মোদীই প্রথম:
জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হওয়ায় দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বিশ্বের অনেক দেশের সরকার প্রধান ও শীর্ষ নেতারা। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীই প্রথম তাকে অভিনন্দন জানান। নির্বাচনের পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টায় তাকে এক বার্তায় অভিনন্দন জানান মোদী। একইসঙ্গে টেলিফোনেও তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি প্রথমে ইংরেজি ও পরে বাংলা ভাষায় এক্স হ্যান্ডেলে বার্তা দিয়ে বিএনপি ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গভীরের বার্তা দেন।
বিএনপির বিজয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, আমি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে বিএনপিকে নির্ণায়ক বিজয়ের অভিমুখে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য জনাব তারেক রহমানকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। এই ফলাফল আপনার নেতৃত্বের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের আস্থার প্রতিফলন। তিনি আরো বলেন, ভারত একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পক্ষে তার সমর্থন অব্যাহত রাখবে। আমাদের বহুমাত্রিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা এবং আমাদের অভিন্ন উন্নয়নের লক্ষ্যগুলি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অভিপ্রায়ে আপনার সঙ্গে একযোগে কাজ করার প্রত্যাশা রাখছি। এদিকে বাংলাদেশের নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের পক্ষ থেকে যোগ দেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ও ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি। এর মধ্যে দিয়ে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার বার্তা দিলো ভারত।
ভারতের অন্যান্য নেতাদের বার্তা:
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে শুধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীই অভিনন্দন জানিয়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক গড়ার বার্তা দেননি। অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী, ভারতের রাজ্যসভার বিরোধী দলীয় নেতা ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গে প্রমুখ শীর্ষ নেতারা। তারেক রহমানকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করে মমতা বলেছেন, ‘আমাদের সঙ্গে সব সময় বাংলাদেশের সুসম্পর্ক বজায় থাকবে, এটাই আমরা কামনা করি।’ আর মল্লিকার্জুন খড়গে বার্তায় বলেন, ‘বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ায় আমি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের পক্ষ থেকে তারেক রহমান ও বিএনপিকে অভিনন্দন জানাই। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি এবং অন্যান্য অভিন্নতার গভীর বন্ধন রয়েছে। আমাদের অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্য একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশকে সব সময় সব ভারতবাসী সমর্থন করবে।’
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সরকারের মন্ত্রীরা শপথ নেন। এর মধ্য দিয়ে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শেষ হলো। শুরু হলো নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের অভিযাত্রা।