ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

শূন্যস্থান পূরণ নাকি জামায়াতের উত্থান

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ০৯:২১ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৯ বার


 শূন্যস্থান পূরণ নাকি জামায়াতের উত্থান

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনের ৬৮টি আসন পেয়ে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে দলটি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি কেবল একটি দলের জয় নয়; বরং বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী দ্বিদলীয় রাজনৈতিক মেরুকরণে এক বড় ধস।

১৮ থেকে ৬৮ আসনের এই উল্লম্ফন কীভাবে সম্ভব হলো? বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর অনুপস্থিতিই কি একমাত্র কারণ, নাকি এর পেছনে কাজ করেছে সুগভীর সাংগঠনিক কৌশল, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ এবং এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা ‘মজলুম’ বয়ান?

আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মাঠের লড়াই এখন মূলত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বনাম জামায়াত।

এবারের সংসদীয় ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ভবিষ্যতে জামায়াত কেবল ‘কিংমেকার’ নয়, বরং সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতার প্রধান দাবিদার হওয়ার পথে হাঁটছে। তবে ১৯৭১-এর দায়মুক্তি, অর্থশক্তির ব্যবহারের অভিযোগ এবং ধর্মীয় রাজনীতির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে দলটি কতদূর যেতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে।

 

নির্বাচনী ইতিহাসের রেকর্ড ভঙ্গ

জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে তারা ১৮টি আসন পেয়েছিল (ভোট ১২.১৩%)। ১৯৯৬ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩টিতে (ভোট ৮.৬১%)।

২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে তারা পায় ১৭টি আসন, যদিও ভোট কমে দাঁড়ায় ৪.২৮ শতাংশে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তারা পেয়েছিল মাত্র ২টি আসন।

 

সেই জায়গা থেকে এবারের নির্বাচনে এককভাবে ৬৮টি আসন পাওয়া দলটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রূপান্তর। বিশ্লেষকদের মতে, গত নির্বাচনে জামায়াতের ভোট ছিল মূলত নির্দিষ্ট পকেটভিত্তিক; কিন্তু এবার তা ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে।

বিশেষ করে ঢাকা শহরের ১৫টি আসনের মধ্যে জোটগতভাবে ৭টি আসন (জামায়াত ৬, এনসিপি ১) জয় করা দলটির জন্য একটি বৈপ্লবিক অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

সুসংগঠিত সাংগঠনিক কাঠামো ও ‘নিভৃত বিপ্লব’

জামায়াতের এই উত্থানের পেছনে প্রথম যে কারণটি সামনে আসে, তা হলো তাদের ইস্পাতকঠিন সাংগঠনিক শৃঙ্খলা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর সাবেক অধ্যাপক ড. এম এ কাইয়ুম বলেন, বাংলাদেশে অনেক দল ভোট হারালে কর্মী হারায়; কিন্তু জামায়াত কখনোই কর্মী হারায়নি। এক দশকের বেশি সময় ধরে প্রবল দমন-পীড়ন ও শীর্ষ নেতাদের ফাঁসির পরও তাদের তৃণমূল কাঠামো ভেঙে পড়েনি।

জামায়াতের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেতা নির্বাচন এবং নিয়মিত ‘রুকন’ সম্মেলন তাদের শক্তি ধরে রেখেছে।

এ ছাড়া দলটির ‘মহিলা জামায়াত’ উইং গত কয়েক বছর ধরে গ্রাম-গঞ্জে ও শহরের ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে যে নীরব প্রচারণা চালিয়েছে, তাকে অনেকেই ‘নিভৃত বিপ্লব’ বলছেন। তারা মূলত ধর্মীয় আলোচনার আড়ালে রাজনৈতিক আদর্শ ও সমাজসেবামূলক কাজের বার্তা সাধারণ নারীদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।

 

জুলাই অভ্যুত্থান ও তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান জামায়াতের জন্য ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক টার্নিং পয়েন্ট। এই আন্দোলনে দলটির ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং পরবর্তী সময়ে দেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তাদের বিজয় জামায়াতকে তরুণদের কাছে ‘প্রাসঙ্গিক’ করে তোলে।

তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ, যারা আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের অবসান চেয়েছিল, তারা জামায়াতকে একটি ‘অ্যাক্টিভিস্ট ফোর্স’ হিসেবে গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া জুলাইয়ের বীরত্ব ও ত্যাগের গল্পের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে পারা জামায়াতকে এক ধরনের ‘বিপ্লবী বৈধতা’ দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে কৌশলগত জোট। এনসিপি ছিল জুলাই আন্দোলনের আবেগের বাহক। এই জোট জামায়াতকে পুরোনো রাজনীতির ছক থেকে বের করে এনে এক নতুন রূপ দিয়েছে।

গ্রামীণ ও শহুরে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা

জামায়াতকে আগে মূলত গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকা-নির্ভর দল হিসেবে ভাবা হতো। কিন্তু এবারের ফলাফল বলছে, তারা শহরের মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণিতেও প্রভাব বিস্তার করেছে। উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে (খুলনা, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর) তাদের একচ্ছত্র আধিপত্যের পাশাপাশি ঢাকার বিজয়গুলো প্রমাণ করে যে, দলটির নাগরিক গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।

ঢাকার নিম্নবিত্ত ও বস্তি এলাকায় তাদের নিয়মিত সমাজসেবা এবং উচ্চবিত্ত এলাকায় ‘মডারেট ইসলামি’ ব্র্যান্ডিং কার্যকর হয়েছে। ভোটারদের অনেকে বলছেন, বাজারদর, নিরাপত্তা ও দুর্নীতির প্রশ্নে তারা জামায়াতকে একটি ‘পরীক্ষিত ও সুশৃঙ্খল’ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

কৌশলগত জোট ও রাজনৈতিক সমীকরণ

জামায়াত এবার কেবল নিজের ওপর নির্ভর করেনি। তারা ইসলামি দলগুলোকে নিয়ে জোট গঠন করে ইসলামি ভোটব্যাংক সংহত করেছে। একই সঙ্গে এনসিপি ও এলডিপির মতো দলগুলোর সমর্থন নিয়ে তারা একটি ‘বৃহত্তর প্ল্যাটফর্ম’ তৈরি করেছে। তাদের এই কৌশল ছিল সুদূরপ্রসারী। তারা নির্বাচনী প্রচারণায় নিজেদের ‘ইসলামিস্ট’ পরিচয়ের চেয়ে ‘ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের’ দল হিসেবে বেশি প্রচার করেছে।

১৯৭১-এর ভূমিকা ও সমালোচনার দেয়াল কতটা ভাঙল?

জামায়াতের রাজনীতির সবচেয়ে বড় বিতর্ক ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা। কিন্তু এবারের নির্বাচনে দেখা গেছে, তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশের কাছে এই ইস্যুটি আগের মতো তীব্র নয়। জামায়াতের বর্তমান আমির ডা. শফিকুর রহমান নিয়মিতভাবে ‘নতুন দিনের রাজনীতি’ এবং ‘বিভেদ ভুলে জাতীয় ঐক্যের’ কথা বলে এই সমালোচনা পাশ কাটানোর চেষ্টা করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক শাহেদ আলম মনে করেন, ‘জামায়াত সচেতনভাবে ১৯৭১-এর বিতর্ক থেকে সরে এসে বর্তমানের জনদুর্ভোগ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইকে সামনে এনেছে। এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনে তাদের কর্মীদের আত্মত্যাগ অনেক মানুষের মনে পুরোনো ক্ষোভকে প্রশমিত করেছে। তবে বুদ্ধিজীবী মহলে এখনও ১৯৭১-এর দায়বদ্ধতা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে।’

উত্থান নাকি হুমকি: বিশ্লেষকদের মতামত

জামায়াতের এই উত্থানকে কেউ দেখছেন ইতিবাচক গণতান্ত্রিক উত্তরণ হিসেবে, আবার কেউ দেখছেন হুমকি হিসেবে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের দীর্ঘ দমন-পীড়নের কারণেই উগ্রবাদী বা ক্যাডারভিত্তিক দলগুলো শক্তি সঞ্চয় করেছে। এটি মূলত গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার ফল।’

অন্যদিকে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. জোবাইদা নাসরিন বলেন, ‘জামায়াত এখন আর প্রান্তিক দল নয়; তারা এখন মূলধারার স্টেকহোল্ডার। তবে তাদের এই উত্থান বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির জন্য কতটা স্বস্তিকর হবে, তা নির্ভর করবে সংসদে তাদের ভূমিকার ওপর।’

সমালোচনা: অর্থশক্তি ও ভোট কেনার অভিযোগ

এত সাফল্যের মধ্যেও জামায়াতকে ঘিরে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে তাদের নির্বাচনী ব্যয় ও ভোট কেনার অভিযোগ নিয়ে। নির্বাচনের আগমুহূর্তে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকাসহ জামায়াত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আটক করার খবর গণমাধ্যমে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ তারা ভোটারদের প্রভাবিত করতে ব্যবহার করেছে।

এই অভিযোগ জামায়াতের ‘নৈতিক ও আদর্শিক’ রাজনীতির দাবির সামনে বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, জামায়াত কেবল আদর্শ দিয়ে নয়, বরং বিশাল অর্থশক্তি ব্যবহার করে গ্রামীণ ও দরিদ্র ভোটারদের একটি অংশকে নিজেদের দিকে টেনেছে। এই ‘টাকার রাজনীতি’ দলটির দীর্ঘমেয়াদি ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

আমির ডা. শফিকুর রহমানের ‘ক্যারিশমা’

জামায়াতের এই অভাবনীয় জয়ের পেছনে বর্তমান আমির ডা. শফিকুর রহমানের ব্যক্তিগত ইমেজ বড় ভূমিকা রেখেছে। তার শান্ত ও পরিমিত বক্তব্য, দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চিত্র এবং নিজের হার্টের অস্ত্রোপচার দেশে করানোর মতো ছোট ছোট বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের মনে ইতিবাচক ছাপ ফেলেছে। তিনি জামায়াতকে একটি ‘আগ্রাসী দল’ থেকে ‘সহমর্মী দল’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করতে সক্ষম হয়েছেন।


   আরও সংবাদ