ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারী, ২০২৬ ১২:০৬ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৫ বার
তফসিল অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শুরুর প্রথম দিনেই জমে উঠেছে নির্বাচনী মাঠ। প্রতিশ্রুতি, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি কৌশলী বক্তব্য, জনসভা, জনসংযোগে সারা দেশে বইছে এখন নির্বাচনী আমেজ। প্রথম দিনে নির্বাচনী পরিবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সকালে সিলেট নগরের সরকারি আলিয়া মাদরাসা মাঠ থেকে বিএনপি নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরু করেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
জনসভায় অন্যান্যের মধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন। মঞ্চে ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমানসহ বিএনপি-মনোনীত প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় নেতারা। এ জনসভায় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক বিএনপি সমর্থক অংশ নেন।
প্রথম নির্বাচনী জনসভায় তারেক রহমান দেশবাসীর সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করেন এবং ধানের শীষে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করার আহ্বান জানান।
তিনি ফ্যামিলি কার্ড, খাল খনন কর্মসূচি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দেশের মানুষকে স্বাবলম্বী করাসহ বিএনপি ক্ষমতা গেলে নানান উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন।
কোনো দেশের দাসত্বে নয় সবার আগে বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তারেক রহমান বলেন, যেমন দিল্লি নয়, তেমন পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ। সবার আগে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর আদর্শে দেশ পরিচালনার অঙ্গীকার করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ, ন্যায়বিচার, সততা, মানবিকতা ও সাম্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হলে সমাজে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠা সম্ভব, দেশের শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরার পাশাপাশি এবারের নির্বাচনী মাঠে বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করেও কথা বলেন তারেক রহমান।
কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে তারেক রহমান জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘কেউ কেউ বলে, অমুককে দেখেছি, তমুককে দেখেছি। এবার একে দেখেন। প্রিয় ভাইবোনেরা, ১৯৭১ সালে যে যুদ্ধ, যে যুদ্ধে লক্ষ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে, আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি, সেই মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার সময় অনেকের ভূমিকা আমরা দেখেছি। যাঁদের ভূমিকার জন্য এই দেশের লক্ষ লক্ষ ভাইয়েরা শহীদ হয়েছেন।
এই দেশের লক্ষ লক্ষ মা-বোনদের সম্মানহানি হয়েছে। তাঁদের তো বাংলাদেশের মানুষ দেখেই নিয়েছে।
ধর্মীয় ইস্যুতে জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে তারেক রহমান বলেন, পৃথিবীর মালিক আল্লাহ, বেহেশতের মালিক আল্লাহ, কাবার মালিক আল্লাহ। আরে ভাই, যেটার মালিক আল্লাহ, সেটা কী অন্য কেউ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে? রাখে না। তাহলে কী দাঁড়াল? নির্বাচনের আগেই একটি দল এই দেবো, ওই দেবো বলছে, টিকিট দেব, বলছে না? যেটার মালিক মানুষ নয়, সেটার কথা যদি সে বলে, তাহলে সেটা শিরক করা হচ্ছে না? যেটার মালিক আল্লাহ একমাত্র। সবকিছুর ওপরে আল্লাহর অধিকার। কাজেই আগেই তো আপনাদের ঠকাচ্ছে, নির্বাচনের পর কেমন ঠকানো ঠকাবে, আপনারা বোঝেন এবার।
আলিয়া মাদরাসা মাঠে জনসভা শেষে ঢাকা ফেরার পথে তারেক রহমান আরও বেশ কয়েকটি জনসভা ও পথসভায় অংশ নেন। এসব জনসভায় তারেক রহমানকে কাছে পেয়ে উজ্জিবিত হন বিএনপি কর্মী-সমর্থকরা।
জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) বিকেলে মিরপুর-১০ নম্বর আদর্শ স্কুল থেকে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরু করে জামায়াতে ইসলামী। ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে আয়োজিত নির্বাচনী এ জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। এ জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক সমর্থক অংশ নেন।
জনসভায় জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ১০ দলীয় ঐক্য সরকারে আসলে সুশাসন, ইনসাফ ও বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, নারী-পুরুষ সবাই মিলে আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তুলবো। আমরা সব সহ্য করব, কিন্তু মা-বোনদের ইজ্জতের ওপর আঘাত সহ্য করা হবে না। নারীর প্রতি কোনো ধরনের সহিংসতা চলতে দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হলে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী, খুন, ধর্ষণ, ব্যাংক ডাকাতি চলতে পারবে না। সমাজের কোনো স্তরে বৈষম্য থাকবে না। ইনসাফ ভিত্তিক বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থীদের ভোট দিয়ে জনগণের বিজয় নিশ্চিত করতে হবে।
জামায়াত ইসলামী নেতৃত্বাধীন ঐক্য সরকারে আসলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন ডা. শফিকুর রহমান। নিজেদের পরিকল্পনা তুলে ধরার পাশাপাশি নির্বাচনী মাঠে প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপিকে ইঙ্গিত করেও কথা বলেন তিনি।
বিএনপিকে ইঙ্গিত করে জামায়াত আমীর বলেন, যারা নিজের দলের লোকদের বিরুদ্ধে, চাঁদাবাজি, পাথর মেরে হত্যা, গাড়িচাপা দিয়ে লোক হত্যা, এগুলো থেকে যারা নিজের কর্মীকে বিরত রাখতে পারবে আশা করি তারা আগামীর বাংলাদেশ উপহার দিতে পারবে। আর যারা এগুলো করতে পারবে না তারা যতই স্বপ্ন দেখাবেন জাতি তাদের মতলব বুঝতে মোটেই কোনো অসুবিধা হবে না।
আমীরে জামায়াত মঞ্চে থাকা এনসিপির আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনে ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী নাহিদ ইসলামের হাতে সমন্বিত শাপলা কলি ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন। পরে তিনি ঢাকা-১২, ঢাকা-১৩, ঢাকা-১৪, ঢাকা-১৬, ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থীর হাতে দাঁড়িপাল্লার প্রতীক তুলে দেন। এসময় উপস্থিত জনতা হাত উচিয়ে তাদের স্বাগত জানান ও উচ্ছাস প্রকাশ।
এ জনসভায় এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড নিয়ে খোঁচা দিয়ে বলেন, ২ হাজার টাকা দিয়ে একটা পরিবারের কি হয়? আমরাও চাই ফ্যামিলি কার্ড দিক। কিন্তু ২ হাজার টাকার ফ্যামিলি কার্ড দিতে আবার এক হাজার টাকা লেগে যাবে না তো।
নাহিদ ইসলাম বলেন, এবারের নির্বাচন শুধু সরকার বদলের নির্বাচন নয়, এবারের নির্বাচন দেশ পরিবর্তনের নির্বাচন। পরিবারতন্ত্র, দুর্নীতি, চাঁদাবাজ আর সন্ত্রাসকে না বলতে দেশবাসীকে তিনি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
এনসিপির প্রচার-প্রচারণা
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) বেলা ১২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তিন নেতার কবর এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং তার পাশে শহীদ শরিফ ওসমান হাদির কবর জেয়ারতের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরু করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
নির্বাচনী প্রচারণা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এ সময় দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
নির্বাচনী প্রচারের শুরুতে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট বিপুল ভোটে জয়ী হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, সারা বাংলাদেশের মানুষের প্রতি আমরা আহ্বান জানাচ্ছি আপনারা ১০ দলীয় ঐক্যজোটকে বিজয়ী করুন; ১০ দলীয় ঐক্যজোটের মার্কাকে বিজয়ী করুন এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির সারাদেশে যেই ৩০ জন প্রার্থী রয়েছে সেই ৩০ জন প্রার্থীকে শাপলা কলি মার্কায় বিজয়ী করে সংসদে পাঠান। সংসদে জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং ১০ দলীয় ঐক্যজোট সাধারণ মানুষের কথা বলবে, গণঅভ্যুত্থানের কথা বলবে, সংস্কারের কথা বলবে, সার্বভৌমত্বের কথা বলবে।
এবারের নির্বাচনে প্রধান এই তিনটি দল ছাড়াও বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন (চরমোনাই), লিবারেল ডেমেক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), এবি পার্টি (আমার বাংলাদেশ পার্টি)সহ নির্বাচন অংশগ্রহণকারী সব দলের প্রার্থীরা সারাদেশে নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। প্রথম দিনে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো সংঘাতের খবর পাওয়া যায়নি। সারাদেশে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চলছে।