ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব আশঙ্কাজনকভাবে নিম্নমুখী

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ৯ মার্চ, ২০২৬ ০৯:০৬ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৯ বার


সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব আশঙ্কাজনকভাবে নিম্নমুখী

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে দীর্ঘকাল আলোচনা চললেও সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফলে এক হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরাসরি ভোটে মাত্র ৭ জন নারী জয়লাভ করেছেন, যা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে দলের সব পর্যায়ের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধি থাকার কথা বলা আছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে পূরণ করতে হবে। কিন্তু দলগুলো সে বিধান বাস্তবায়নে খুব একটা এগোচ্ছে না।

ফলে নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নও স্বাভাবিকভাবেই কম দেওয়া হচ্ছে। তবে কোনো কোনো দল প্রার্থী মনোনয়নে ৩৩ শতাংশ পূরণ করেছে।

 

এবারের নির্বাচনের চিত্র: ৭ নারীর জয়
এবারের নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে মোট ৮৬ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এর মধ্যে জয়ী হয়েছেন মাত্র ৭ জন, যাদের মধ্যে ৬ জনই বিএনপির এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী।

 

জয়ী নারী সংসদ সদস্যরা হলেন—আফরোজা খানম (মানিকগঞ্জ-৩, বিএনপি), ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো (ঝালকাঠি-২, বিএনপি), তাহসিনা রুশদীর (সিলেট-২, বিএনপি), ফারজানা শারমিন (নাটোর-১, বিএনপি), শামা ওবায়েদ ইসলাম (ফরিদপুর-২, বিএনপি), নায়াব ইউসুফ আহমেদ (ফরিদপুর-৩, বিএনপি) এবং রুমিন ফারহানা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, স্বতন্ত্র—বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী)।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ছয়জন, গণফোরাম দুইজন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ একজন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-মার্কসবাদী ১০ জন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ চারজন, বিএনপি ১০ জন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি একজন, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ চারজন, এনসিপি দুইজন, গণসংহতি আন্দোলন তিনজন, গণঅধিকার পরিষদ-জিওপি তিনজন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি ছয়জন, নাগরিক ঐক্য একজন, বাংলাদেশের রিপাবলিকান পার্টি একজন, এবি পার্টি একজন, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি দুইজন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি একজন, আম জনতার দল একজন, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ একজন এবং বাংলাদেশ লেবার পার্টি একজন নারী প্রার্থী দিয়েছিল।

এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন দুই ডজনের বেশি। ভোটের লড়াইয়ে থাকা ৫১টি দলের মধ্যে ২০টি দলের নারী প্রার্থী ছিল; বাকিরা কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি।

মোট ৮৬ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জয়ী হয়েছেন মাত্র সাতজন।

 

২৫ বছরের প্রেক্ষাপট ও নারী প্রতিনিধিত্বের পরিসংখ্যান
আগের নির্বাচনগুলোর সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নবম জাতীয় সংসদে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারী সদস্যের সংখ্যা যেখানে ২১-এ পৌঁছেছিল, সেখান থেকে বর্তমান সংসদে সরাসরি নির্বাচিত নারীর সংখ্যা ৭-এ নেমে এসেছে, যা নারীর অংশগ্রহণে বড় ধরনের পতনের ইঙ্গিত দেয়।

সংরক্ষিত ৫০টি আসন মিলিয়ে এবারের সংসদে মোট নারী সদস্য হবেন ৫৭ জন। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে সরাসরি ভোটে নারী প্রতিনিধিত্বের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৮, ২৩ এবং ১৯ জন। সেই তুলনায় এবারের নির্বাচনে সরাসরি জয়ী নারীর সংখ্যা এক অঙ্কে নেমে এসেছে।

 

কোন সংসদে কত নারী
স্বাধীন বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, নারী প্রতিনিধিত্বের শুরুটা হয়েছিল মূলত সংরক্ষিত আসনের ওপর ভিত্তি করে। ১৯৭৩–১৯৭৫ মেয়াদের প্রথম জাতীয় সংসদে সরাসরি ভোটে কোনো নারী নির্বাচিত না হলেও ১৫টি সংরক্ষিত আসনের প্রতিনিধিরাই ছিলেন সংসদের একমাত্র নারী মুখ।

এরপর ১৯৭৯–১৯৮২ মেয়াদের দ্বিতীয় সংসদে নারী সদস্যের সংখ্যা কিছুটা বাড়ে; সেখানে ২ জন সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং ৩০টি সংরক্ষিত আসন মিলিয়ে মোট ৩২ জন নারী সংসদ সদস্য ছিলেন।

তবে একটি উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম ছিল ১৯৮৮–১৯৯০ মেয়াদের চতুর্থ সংসদ, যেখানে কোনো সংরক্ষিত নারী আসন ছিল না। সেই সংসদে ৪ জন নারী সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

গণতন্ত্রের নতুন যাত্রায় ১৯৯১–১৯৯৫ মেয়াদের পঞ্চম সংসদে সরাসরি নির্বাচিত ৫ জনসহ মোট নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৫।

রাজনীতির উত্তাল সময়ে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির একতরফা ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং সংরক্ষিত আসন ছিল ৩০টি। তবে সেই নির্বাচন বাতিল হয়ে ওই বছরেরই জুন মাসে সপ্তম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সরাসরি ভোটে নারীর জয় কিছুটা বাড়ে এবং ৮ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত হন। সংরক্ষিত আসনসহ সেবার মোট নারী প্রতিনিধি ছিলেন ৩৮ জন।

পরবর্তী অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে সরাসরি ৭টি আসনে নারীরা জয়লাভ করেন এবং সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ৪৫-এ উন্নীত হওয়ায় মোট নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫২।

নারী প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক ছিল নবম জাতীয় সংসদ। এই সংসদে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে ২১ জন নারী জয়ী হয়ে আসেন। এরপর সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০টি করা হয় এবং সব মিলিয়ে মোট নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা হয় ৭০।

পরবর্তী এক দশকে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যায়। আওয়ামী লীগের আমলে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে সরাসরি ভোটে নারী সদস্যের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৮, ২৩ এবং ১৯ জন।

এ বিষয়ে ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্সের (ফেমা) সাবেক প্রেসিডেন্ট ও পর্যবেক্ষক মুনিরা খান বলেন, নারী প্রার্থী দেওয়ার বিষয়টি মূলত চর্চার বিষয়। এটি দলের সিদ্ধান্ত ও আদর্শের ওপর নির্ভর করে।

তিনি বলেন, নারী অংশগ্রহণ বৃদ্ধির বিষয়টি এখনো অনেকাংশে আইনি কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে এবং বাস্তব প্রয়োগ খুব কম। ফলে কোনো দল নারী প্রার্থী না দিলেও কেন দেয়নি, সে বিষয়ে কার্যত জবাবদিহির ব্যবস্থা নেই।


   আরও সংবাদ