ঢাকা, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

৪৮ বছর পরও কলকাতায় একই বিশৃঙ্খলা

স্পোর্টস ডেস্ক


প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১৭:০৬ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৮৬ বার


৪৮ বছর পরও কলকাতায় একই বিশৃঙ্খলা

ইতিহাস কি সত্যিই বারবার ফিরে আসে? শনিবার কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়ামে লিওনেল মেসির সফর ঘিরে যে বিশৃঙ্খলা দেখা গেল, তা যেন ৪৮ বছর আগের এক পুরনো স্মৃতিকেই নতুন করে উসকে দিল। ঘটনাটি মনে করিয়ে দিল ১৯৭৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বরকে, যেদিন ফুটবলের সম্রাট পেলে পা রেখেছিলেন এই তিলোত্তমায়।

প্রায় অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও কলকাতার ফুটবল আবেগ আর তার সঙ্গে মিশে থাকা অব্যবস্থাপনার চিত্রটা একটুও বদলায়নি। শনিবার হাজার হাজার টাকা খরচ করে টিকিট কেটেও সাধারণ দর্শকরা মেসির দেখা পাননি। কারণ, স্টেডিয়ামে তখন নেতা, মন্ত্রী আর ভিআইপিদের ভিড়। ঠিক যেমনটা ঘটেছিল পেলের আগমনের সময়ও।

১৯৭৭ বনাম ২০২৫: বিশৃঙ্খলার একই চিত্র 

১৯৭৭ সালে পেলের কসমস ক্লাব মোহনবাগানের বিরুদ্ধে ইডেন গার্ডেন্সে একটি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলেছিল। ৮০ হাজার দর্শকের সামনে সেই ম্যাচ ড্র হয়েছিল ২-২ গোলে। কিন্তু মাঠের খেলার চেয়েও মাঠের বাইরের নাটকীয়তা ছিল আরও বেশি।

শনিবার মেসিকে যেমন ভিড়ের কারণে বিমানবন্দর থেকে বিকল্প পথে হোটেলে নিতে হয়েছে, পেলের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটেছিল। সেদিন পেলে সন্ধ্যা ৭টার একটু পরে নামলেও বিমানবন্দর থেকে বের হতে বেজে গিয়েছিল রাত ১১টা। ভিআইপি রোডে তখন লাখো মানুষের ঢল। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ গোপনে পেলেকে যশোর রোড দিয়ে বের করে নিয়ে যায়। এতে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষমাণ জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশের গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহনে ভাঙচুর চালায়।

বলিউডেও যার রেশ 

পেলের ওই সফরের উন্মাদনা এতটাই তীব্র ছিল যে তা স্থান পেয়েছিল ১৯৭৯ সালের বলিউড ব্লকবাস্টার ‘গোলমাল’ সিনেমাতেও। সেখানে উৎপল দত্তের এক সংলাপে বলা হয়, ‘রবীন্দ্রনাথকে যেমন গুরুদেব বলা হয়, গান্ধীকে যেমন বাপু, তেমনি পেলেকে বলা হয় ব্ল্যাক পার্ল। হোয়াট আ প্লেয়ার স্যার!’

কলকাতার ভিআইপি কালচার 

কাস্টমসের তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার সৌম্যজিৎ ভৌমিকের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায় আসল বিশৃঙ্খলার কথা। তখন বিমানবন্দরে কড়াকড়ি কম ছিল। ফলে মন্ত্রী, ক্লাবের কর্মকর্তা, সাংবাদিক এবং তাদের পরিচিতরা মিলে প্রায় হাজারখানেক মানুষ কাস্টমস এনক্লোজারের ভেতরেই ঢুকে পড়েছিলেন। সাধারণ ভক্তদের চেয়ে এই ‘ভিআইপি’রাই বেশি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিলেন।

‘বডিগার্ড’ ও ‘নকল মন্ত্রী’ 

সেদিনের বিশৃঙ্খলার মাঝেও ঘটেছিল কিছু হাস্যকর ঘটনা। মোহনবাগান ক্লাবের তৎকালীন সচিব ধীরেন দে-র সঙ্গে এক ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ (ডিএসপি) আঠার মতো লেগে ছিলেন, যাতে পেলের সঙ্গে পরিচয় হওয়া যায়। ভিড়ে অতিষ্ট পেলে যখন বিরক্ত, তখন ধীরেন দে ওই ডিএসপিকে দেখিয়ে পেলেকে বলেন, ‘মিস্টার পেলে, আমার বডিগার্ডের সঙ্গে পরিচয় হোন!’

অন্যদিকে, রাজ্যের তৎকালীন মন্ত্রী ও মোহনবাগান ভক্ত যতীন চক্রবর্তী ভিড় ঠেলে পেলের ঘরে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন। পাহারায় থাকা সিপাহীরা তাকে বাধা দিলে তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘আমি মিনিস্টার।’ কিন্তু বিরক্ত সিপাহীরা পাল্টা উত্তর দেন, ‘পেলেকে দেখার জন্য আজ সবাই মিনিস্টার! চোখের সামনে থেকে সরুন, নইলে বের করে দেব।’

শনিবার সল্টলেকে মেসির অনুষ্ঠানেও মন্ত্রী ও নেতাদের আধিপত্য এবং সাধারণ দর্শকদের হতাশা প্রমাণ করল, ৪৮ বছরে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়ালেও কলকাতার ফুটবল আবেগের বাছবিচারহীন রূপটি একই রয়ে গেছে।


   আরও সংবাদ