ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:১২ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৪ বার
উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পোশাক উৎপাদনের মাধ্যমে রপ্তানি আয় বাড়ানোর তাগিদ দীর্ঘদিনের। তবে পণ্যের বৈচিত্র্যকরণে প্রত্যাশিত অগ্রগতি নেই।
ফলে বিশ্ববাজারে বড় রপ্তানিকারক হিসেবে অবস্থান তৈরি করলেও মূল্য সংযোজন ও আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্প।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় বেড়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ।
ইপিবির তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস (বিএভি) এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই তিন মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১ হাজার ৫৭ কোটি ৮৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার।
আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৯৯৭ কোটি ৪ লাখ ২০ হাজার ডলার।
বেসিক পণ্যের আধিপত্য
রপ্তানির বড় অংশই আসছে বেসিক ক্যাটাগরির পণ্য থেকে।
এ ক্যাটাগরি থেকে আয় হয়েছে ৮২৫ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেশি। মোট রপ্তানিতে এ ক্যাটাগরির অংশ ৭৭ দশমিক ০৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৮ দশমিক ০৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বেসিক ক্যাটাগরির মধ্যে বটমওয়্যার-ট্রাউজার্স, শর্টস ও স্কার্ট-রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩২৮ কোটি ৫৫ লাখ ৫০ হাজার ডলার। এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ। মোট রপ্তানিতে এর অংশ ৩১ দশমিক ০৬ শতাংশ।
সোয়েটার ও কার্ডিগান রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২০৪ কোটি ৮২ লাখ ৯০ হাজার ডলার। এ খাতে প্রবৃদ্ধি ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। টি-শার্ট ও ভেস্ট রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১৫৮ কোটি ১৮ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ০৫ শতাংশ বেশি।
ইনারওয়্যার ও অন্তর্বাস রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ। এ খাত থেকে আয় হয়েছে ৯৭ কোটি ২১ লাখ ৬০ হাজার ডলার। অন্যদিকে, শিশুদের পোশাক রপ্তানিতে সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ খাত থেকে আয় হয়েছে ৩৩ কোটি ১০ লাখ ডলার।
সেমি-বেসিক পণ্যে প্রবৃদ্ধি কম
সেমি-বেসিক ক্যাটাগরির শার্ট ও ব্লাউজ রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এ খাত থেকে আয় হয়েছে ৮৪ কোটি ১৭ লাখ ৩০ হাজার ডলার। মোট রপ্তানিতে এ ক্যাটাগরির অংশ ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ৯৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
অ্যাডভান্সড পণ্যে প্রবৃদ্ধি মাত্র ১.৪২ শতাংশ
বৈচিত্র্যময় ও তুলনামূলক উচ্চমূল্যের অ্যাডভান্সড ক্যাটাগরির পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৪২ শতাংশ। এ ক্যাটাগরি থেকে তিন মাসে আয় হয়েছে ১৪৭ কোটি ৯৪ লাখ ১০ হাজার ডলার।
এ ক্যাটাগরির মধ্যে আউটারওয়্যার-জ্যাকেট ও কোট-রপ্তানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। টেকনিক্যাল ওয়্যার রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ। তবে ড্রেস রপ্তানি কমেছে ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। স্পোর্টসওয়্যার ও অ্যাক্টিভওয়্যারে রপ্তানি কমেছে ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং স্যুট ও এনসেম্বলে কমেছে ১৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে মোট পোশাক রপ্তানিতে অ্যাডভান্সড ক্যাটাগরির অংশ কমে ১৩ দশমিক ৯৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এ অংশ ছিল ১৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি মূলত বেসিক পণ্যনির্ভর। তুলনামূলক উচ্চমূল্যের অ্যাডভান্সড ক্যাটাগরির পণ্যে প্রবৃদ্ধি দুর্বল। এছাড়া কয়েকটি পণ্যের রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে। এ পরিস্থিতি পোশাক খাতে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
উৎপাদন ও সাপ্লাই চেইনে সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে যে পরিমাণ অ্যাডভান্সড ক্যাটাগরির পোশাক তৈরি হচ্ছে, তা যথেষ্ট নয়। বিশ্ববাজারে এ ধরনের পোশাকের চাহিদা আরও অনেক বেশি। তাই শুধু এ ক্যাটাগরির পোশাক তৈরি করলেই চলবে না; বরং উৎপাদন ও বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে।
তিনি বাংলানিউজকে বলেন, তুলনামূলক কম দামি পণ্যের চেয়ে বেশি দামি ও অ্যাডভান্সড ক্যাটাগরির পোশাকের বাজার বড় হচ্ছে। তবে এ পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব নয়। এর জন্য দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। পাশাপাশি পুরো সাপ্লাই চেইন ও অবকাঠামোকে সেই অনুযায়ী আধুনিক ও রূপান্তরিত করতে হবে।
তুরস্কের তৈরি পোশাকশিল্পের প্রসঙ্গ টেনে মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, তুরস্ক বাংলাদেশের চেয়ে অনেক পুরোনো এবং উচ্চমূল্য সংযোজিত পোশাক উৎপাদনকারী দেশ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইউরোপের কাছাকাছি হওয়ায় দেশটি ‘নিয়ার শোরিং’-এর বাড়তি সুবিধা পায়। ফলে ক্রেতারা অল্প সময়ের মধ্যে সেখান থেকে পণ্য পেয়ে যান। অন্যদিকে, বাংলাদেশের অবকাঠামোগত কিছু ঘাটতি এবং তুলনামূলক বেশি লিড টাইমের কারণে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে বাংলাদেশের সাধারণ বা বেসিক পণ্যের উৎপাদনও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। একইসঙ্গে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবকাঠামো ও সাপ্লাই চেইন আরও শক্তিশালী করতে হবে।
তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশে এখন অনেক নতুন ও উন্নত ক্যাটাগরির পোশাক তৈরি শুরু হয়েছে। এ ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রেখে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারলে বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে বলে মনে করেন তিনি।