ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:৫৮ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৬৬ বার
প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আন্দোলনের নেতাদের ডাকে সাড়া দেন ‘মুরুব্বি’ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ‘দেশ উদ্ধারের স্বার্থে’র কথা বলে অন্তর্বর্তী সরকারের হাল ধরেন তিনি। সে সময় তাঁকে ঘিরে আশার বীজ বুনেছিল জাতি। অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন-তাঁর ‘জাদুর ছোঁয়ায়’ বিশ্বের দুয়ারে আরো উজ্জ্বল হবে বাংলাদেশের মুখ, বাড়বে মানুষের মর্যাদা, খুলে যাবে দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ সম্ভাবনার দুয়ার।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত প্রায় দেড় বছরে জনগণের স্বপ্ন কতটা পূরণ করতে পেরেছেন নোবেলজয়ী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই অনুসন্ধানে নামে একটি গণমাধ্যম। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দেশের বারোটা বাজলেও কীভাবে নিজের স্বার্থ ষোলআনা হাসিল করেছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী।
ষোলআনার অন্যতম হলো গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়। সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের মেয়াদে দেশে এই একটিমাত্র বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়টি গ্রামীণ ট্রাস্টের একটি উদ্যোগ। আর এই গ্রামীণ ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা হলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আগে থেকে ২২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন বছর বছর ধরে ঝুলে থাকলেও গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় আবেদন করার ৩ মাসের মধ্যেই পেয়ে যায় অনুমোদন। এই রকেট গতি এখন আর কারো কাছে বিস্ময় নয়; কারণ, ওই সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিজের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আরো অনেক সুবিধা আদায় করে নিয়েছেন ড. ইউনূস। বিশেষ করে গ্রামীণ ব্যাংককে ৫ বছরের জন্য আয়কর অব্যাহতি দেন, যাতে সরকার অন্তত এক হাজার কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে। গ্রামীণ কল্যাণ ট্রাস্টের এক হাজার ৪৩ কোটি টাকা ফাঁকির পাশাপাশি ৬৬৬ কোটি টাকা কর মওকূফের মতো ব্যাপক সুবিধাও নিয়েছেন তিনি।
শুধু তাই নয়, ক্ষমতার চেয়ারে বসে গুণে গুণে সাতটি মামলা থেকে মুক্তি দিয়েছেন নিজেকে, যার মধ্যে আলোচিত দুর্নীতি মামলাও রয়েছে। এর পাশাপাশি অস্বাভাবিক দ্রুততায় বাগিয়ে নিয়েছেন রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স।
সমাধান করে ফেলেছেন ‘সমাধান সার্ভিসেস লিমিটেড’ নামক ই-ওয়ালেটের লাইসেন্স না পাওয়ার জটিলতারও। এর সবই ঘটে তাঁর ক্ষমতা গ্রহণের পর।
জানা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো ড. ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ট্রাষ্টের অধীনে পরিচালিত। আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে প্রধান উপদেষ্টার শপথ গ্রহণের আগে প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সরে দাঁড়ালেও দায়িত্ব ছাড়ার পর আবার সেসব প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ফলে ক্ষমতার আলোয় আসার সঙ্গে সঙ্গে এই সুবিধাগুলো নেওয়ার মধ্য দিয়ে কার্যত তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলেই মত দিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ গণমাধ্যমকে বলেন, যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন, তাদের সঙ্গে যাতে জনগণ, দেশের স্বার্থের সংঘাত না ঘটে সে জন্য শপথ নিতে হয়। শুধু সরকার না, সরকারি অনেক পদে বসার শর্তই থাকে যে, কোনো লাভজনক পদে থাকলে তা ছেড়ে দিতে হবে।
মনজিল মোরসেদ আরো বলেন, ‘ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে ছিলেন। সেখানে বসে তিনি তাঁর স্বার্থে যেসব কর্মকাণ্ড করেছেন, সেগুলো নিয়ে রাজনৈতিকভাবে বেশ সমালোচনা হয়েছে, এখনো হচ্ছে। উনি ব্যক্তিগত স্বার্থে এই পদকে (প্রধান উপদেষ্টা) ব্যবহার করেছেন। শুধু তাই না, কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টে তিনি দায়ী হয়ে গেছেন। এর মধ্য দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে
তিনি শপথ ভঙ্গ করেছেন। আর সবকিছু মিলে তিনি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন।’
পাঁচ কোটির আইনে দেড় কোটির বৃদ্ধাঙ্গুলি :
গ্রামীণ ট্রাস্টের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়’ মাত্র তিন মাসের মধ্যে অনুমোদন পায়—যেখানে দেশে আগে থেকেই আবেদন করা অন্তত ২২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বছরের পর বছর ধরে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই দ্রুত অনুমোদন নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য কমপক্ষে ৫ কোটি টাকা সংরক্ষিত তহবিল থাকার কথা। কিন্তু গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনপত্রে দেড় কোটি টাকার শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে, যা আইনের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের কেউই স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি—কেউ দায়িত্বে না থাকার কথা বলেছেন, আবার কেউ বিষয়টি মনে নেই বলে এড়িয়ে গেছেন। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তারা সরকারি নির্দেশনা মেনেই প্রয়োজনীয় অর্থ জমা দিয়েছে এবং এটি একটি সামাজিক উদ্যোগ, লাভের উদ্দেশ্যে নয়।
সাধারণত দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক দ্রুততা, আইনি শর্তে বিভ্রান্তি এবং অন্যান্য আবেদন ঝুলে থাকার প্রেক্ষাপটে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ক্ষমতার গরমে রাজস্ব উধাও :
২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর জারি করা গেজেট অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংককে ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ বছরের জন্য আয়কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ফলে এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির সব ধরনের আয় করমুক্ত থাকবে। পূর্ববর্তী কর তথ্য অনুযায়ী, বছরে গড়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকা কর দিত গ্রামীণ ব্যাংক। সেই হিসাবে আগামী পাঁচ বছরে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি অন্তত ১ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে—যা বড় রাজস্ব ঘাটতির সময়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকা অবস্থায় এমন অব্যাহতি পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। এছাড়া আইএমএফের শর্ত ছিল কর অব্যাহতি কমানো, কিন্তু বাস্তবে নতুন করে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। পরে আইন পরিবর্তন করে বলা হয়, ভবিষ্যতে কর অব্যাহতির জন্য সংসদের অনুমোদন লাগবে—তবে গ্রামীণ ব্যাংক এই সুবিধা পেয়েছে তার আগেই।
অন্যদিকে, গ্রামীণ ডিস্ট্রিবিউশন ভ্যাট সুবিধা পেলেও শর্ত অনুযায়ী উৎপাদন না করে আমদানিনির্ভর থেকেছে—এ নিয়ে তদন্তে অসঙ্গতি ধরা পড়লেও কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি।
এছাড়া গ্রামীণ কল্যাণ ট্রাস্টের বিরুদ্ধে প্রায় ১,০৪৩ কোটি টাকার কর ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে, যা নিয়ে মামলা এখনও চলমান। একই সঙ্গে ঋণের সুদকে লভ্যাংশ হিসেবে দেখিয়ে কম কর দেওয়ার ঘটনায় ৬৬৬ কোটি টাকার কর নির্ধারণ হলেও পরবর্তীতে আদালতের রায়ে তা বাতিল হয়ে যায়।
সব মিলিয়ে কর অব্যাহতি, শর্ত লঙ্ঘন ও কর সংক্রান্ত বিরোধকে ঘিরে গ্রামীণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে আর্থিক স্বচ্ছতা ও ন্যায়সংগত সুবিধা প্রদান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সাত মামলা নিষ্পত্তিসহ আরো সুবিধা আদায় :
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন সুবিধা পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অন্তত ৭টি মামলা থেকে অব্যাহতি, ই-ওয়ালেট লাইসেন্স অনুমোদন এবং জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স প্রাপ্তি—যেগুলো অস্বাভাবিক দ্রুততায় সম্পন্ন হয়েছে বলে অভিযোগ।
গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস লিমিটেড ১৬ বছর ঝুলে থাকার পর ২০২৫ সালে জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স ও বায়রার সদস্যপদ পায়। একইভাবে, দীর্ঘদিন আটকে থাকা ‘সমাধান সার্ভিসেস লিমিটেড’ মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে ই-ওয়ালেট লাইসেন্স পায়। এসব প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ট্রাস্টের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
অন্যদিকে, ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে শ্রম আইন ও দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের করা মামলাগুলো রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দ্রুত নিষ্পত্তি বা প্রত্যাহার হয়ে যায়। এর মধ্যে শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় সাজা বাতিল এবং দুদকের অর্থ আত্মসাতের মামলা প্রত্যাহার উল্লেখযোগ্য।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থেকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুবিধা আদায় করা স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে এবং এটি শপথের পরিপন্থী হতে পারে। যদিও সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, সব প্রক্রিয়া আইন মেনেই সম্পন্ন হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ক্ষমতায় থাকার সময় দ্রুত লাইসেন্স অনুমোদন, মামলা নিষ্পত্তি এবং নীতিগত সুবিধা প্রাপ্তির ঘটনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্তর্বর্তী আমলে দেশে শনির দশা :
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় ১৮ মাসে দেশে আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও জনজীবনে বড় ধরনের অবনতি ঘটে। লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময়ে মব সন্ত্রাস, রাজনৈতিক সহিংসতা, হত্যা, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট বেড়ে যায়; একই সঙ্গে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছায়।
খেলাপি ঋণ, বৈদেশিক ঋণ, সুদের হার ও বিনিয়োগ-স্থবিরতা বেড়েছে। বহু কারখানা বন্ধ হয়ে শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, আর উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করেছে।
বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো থমকে যায়, বিদেশি চুক্তিগুলো বিতর্ক তৈরি করে এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। সব মিলিয়ে লেখাটির বক্তব্য হলো, অন্তর্বর্তী সময়টি দেশে স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক গতি ও জননিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
সবগুলো কাজ বেআইনি :
সুপ্রিম কোর্টের দুজর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাত ও সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে মতামত দিয়েছেন। তাঁদের মতে, রাষ্ট্রীয় পদে থেকে কোনো ব্যক্তি নিজের বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য সুবিধা নেওয়া শপথের পরিপন্থী এবং ক্ষমতার অপব্যবহার।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ব্যক্তিগত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া “কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট” তৈরি করে এবং তা শপথ ভঙ্গের শামিল। তিনি এসব কার্যক্রমকে বেআইনি দাবি করে সেগুলো বাতিল এবং প্রয়োজন হলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, সংবিধানের ১৪৭ ধারা অনুযায়ী সাংবিধানিক পদে থেকে লাভজনক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়া নিষিদ্ধ। তাঁর মতে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সুবিধা পাওয়ার ঘটনায় সেই বিধান লঙ্ঘনের প্রশ্ন উঠেছে।
সব মিলিয়ে, আইন বিশেষজ্ঞদের মতে এসব কর্মকাণ্ডে নৈতিকতা, জবাবদিহি ও সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।
আইনে বৃদ্ধাঙ্গুলি
তবে বিস্ময়ের বিষয় হলো—শান্তিতে নোবেলজয়ী এই ‘মহাজন’-এর একমাত্র ‘শিক্ষাকীর্তি’টি অনুসন্ধান করে পাওয়া গেছে ন্যক্কারজনক এক কাণ্ড। আইনকে রীতিমতো বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ত্বরিতবেগে বাগিয়ে নেওয়া হয়েছে অনুমোদন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এর ৬ ধারার ৯ উপধারায় বলা আছে, ‘প্রস্তাবিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে সংরক্ষিত তহবিল হিসেবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার জন্য অন্যূন পাঁচ কোটি টাকা, অন্যান্য মেট্রোপলিটন এলাকার জন্য অন্যূন তিন কোটি টাকা এবং অন্যান্য এলাকার জন্য দেড় কোটি টাকা যেকোনো তফসিলি ব্যাংকে জমা থাকতে হবে।’
অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের এ সংক্রান্ত সব নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, সবখানেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ঠিকানা লেখা আছে : বাড়ি-৬, মেইন রোড, দিয়াবাড়ী দক্ষিণ, তুরাগ, ঢাকা-১২৩০। কিন্তু ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নথি ও ম্যাপ বলছে, এই ঠিকানা ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার ভেতরে। কাজেই আইন অনুযায়ী, গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তফসিলি ব্যাংকে পাঁচ কোটি টাকা জমা হওয়ার কথা।
এবার আমরা অনুসন্ধান করি সেই নথিটির, যেখানে পাওয়া যাবে ওই ন্যক্কারজনক কাণ্ডের প্রমাণ।
অবশেষে আমাদের হাতে আসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের স্মারক নং-৩৭.০০.০০০০.০৭৮.০২.০০১.২০২৫-৮৫, তারিখ-১৭ মার্চ, ২০২৫ অনুযায়ী, গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনপত্র। এই নথির শর্তসমূহের (ট)-তে বলা হয়েছে, ‘প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে সংরক্ষিত তহবিল হিসেবে অন্যূন দেড় কোটি টাকা যেকোনো তফসিলি ব্যাংকে জমা থাকতে হবে এবং সরকারের পূর্বানুমোদন ব্যতীত তা বা এর লভ্যাংশ উত্তোলন করা যাবে না।’
ঢাকা মেট্রোপলিটন এরিয়ার মধ্যে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কমপক্ষে পাঁচ কোটি টাকা জামানত রাখার আইন তোয়াক্কা না করে কেন গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুমোদন দেওয়া হলো—এই প্রশ্ন নিয়ে গত সোমবার আমরা হাজির হই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকের দপ্তরে। তিনি বলেন, ‘আমি এই দপ্তরে নতুন যোগ দিয়েছি।
যখন গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন হয় তখন আমি এখানে ছিলাম না। তাই আমি অনুমোদন প্রক্রিয়া বা আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে কিছুই বলতে পারছি না। তবে যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়কেই আইন অনুযায়ী চলতে হবে।’
এবার আমরা খুঁজে বের করি গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের সময় দায়িত্বে থাকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব সিদ্দিক জোবায়েরকে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ শেষে তিনি এখন অবসরে। যোগাযোগ করা হলে ওই প্রশ্নে গতকাল বুধবার তিনি বলেন, ‘পাঁচ কোটির বদলে কেন দেড় কোটি টাকা জমা রাখতে বলা হয়েছে তা আমার মনে পড়ছে না। সাধারণত এসব রেগুলেশন ইউজিসি করে দেয়। আপনি মন্ত্রণায়ের বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেন।’
এই জবাব শুনে তাঁকে জানানো হয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্তরা বলছেন, কেন আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে, সেটা আগে যাঁরা দায়িত্বে ছিলেন তাঁদেরই বলার কথা।
এর জবাবে সিদ্দিক জোবায়ের বলেন, ‘এটা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। বিষয়টি আমার মনে পড়ছে না।’
বিশ্ববিদ্যালয়টির অনুমোদনের সময় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান ছিলেন অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ। অসুস্থতার কারণে তিনি গত ১৬ মার্চ পদত্যাগ করেন। জানতে চাইলে গত সোমবার তিনি বলেন, ‘গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন বেশ আগের কথা। এখন সংরক্ষিত তহবিলের ক্ষেত্রে স্পেশাল কোনো অনুমোদন থাকতেও পারে, তবে নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইনফ্লুয়েনশিয়াল ব্যক্তি। গ্রামীণ মানুষের জীবন উন্নয়নে তাঁর অনেক অবদান রয়েছে। আমি যত দূর জানি, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টি লাভের জন্য করেননি। শিক্ষার উন্নয়নের জন্যই করেছেন।’
আইন লঙ্ঘনের প্রশ্নে জবাব পেতে গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আশরাফুল হাসানকে গত ৩০ মার্চ সোমবার সন্ধ্যা থেকে কয়েক দফায় ফোন করা হয়, কিন্তু তিনি ধরেননি। পরে মেসেজ লিখে প্রয়োজনের কথা জানানো হলে আধাঘণ্টার মধ্যে তিনি ফোন ব্যাক করেন। প্রশ্ন শুনে আশরাফুল হক বলেন, “আইনে যেটা আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সংরক্ষিত তহবিল, সেটাই রাখা হয়েছে। আমরা আইনের কোনো বরখেলাপ করিনি, এটা নিশ্চিত। সরকারি কোনো নিয়ম-নীতির বরখেলাপও আমরা করিনি। আমরা এই বিশ্ববিদ্যালয় টাকা কামানোর জন্য করছি না। এটা আমাদের সোশ্যাল বিজনেস। আগামী সেপ্টেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা আমরা করেছি। আমাদের লক্ষ্য ‘জিরো প্রভার্টি’, ‘জিরো আনএমপ্লয়মেন্ট’, ‘জিরো কার্বন’।”
এটুকু বলে তিনি আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ দেননি। তবে ওই রাত ১০টা ৪০ মিনিটে আশরাফুল হাসান নিজেই ফোন করেন। এবার তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়ে আমাদের যে টাকা জমা দিতে বলেছে, আমরা সেটাই দিয়েছি। পূর্বাচলে আমাদের স্থায়ী ক্যাম্পাস করার কথা রয়েছে। ওই জায়গা যেহেতু গাজীপুরের মধ্যে, এ জন্য সংরক্ষিত তহবিল দেড় কোটি হতে পারে। তবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে আমাদের ব্যবসা করার কোনো ইচ্ছা নেই। আমরা মানুষ গড়তে চাই।’
পরদিন মঙ্গলবার দুপুর ১টা ২৬ মিনিটে আশরাফুল হাসান হোয়াটঅ্যাপে ইউজিসির একটি চিঠির প্রথম পৃষ্ঠা পাঠান। সেই চিঠির দুটি লাইন রঙিন করে দিয়েছেন। সেই দুই লাইনে লেখা আছে, ‘প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে সংরক্ষিত তহবিল হিসেবে অন্যূন পাঁচ কোটি টাকা যেকোনো তফসিলি ব্যাংকে জমা থাকতে হবে এবং সরকারের পূর্বানুমোদন ব্যতীত আসল বা এর লভ্যাংশ উত্তোলন করা যাবে না।’
এরপর হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে আশরাফুল হাসান লেখেন, ‘ইউজিসির চিঠি অনুযায়ী আমরা পাঁচ কোটি টাকাই ডিপোজিট করেছি।’
তিন মাসেই অনুমোদন : ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ১১৫টি। এর মধ্যে রাজধানীতেই প্রায় ৫০টির মতো।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। প্রথমে স্থান নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোসহ নানা সুবিধা চূড়ান্ত করতে হয় উদ্যোক্তাদের। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে আবেদন করতে হয়। মন্ত্রণালয় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান, উপযোগিতা ও প্রয়োজনীয় তথ্য পর্যালোচনা করে উপযুক্ত মনে করলে এসংক্রান্ত নথি উপস্থাপন করে। সেটা আবার নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া শেষে পরিদর্শনের জন্য ইউজিসিতে পাঠানো হয়। ইউজিসি আবার প্রয়োজনীতা পর্যালোচনা করে উপযুক্ত মনে করলে এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করে। কমিটি এক বা একাধিকবার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান, প্রয়োজনীতা, পড়ালেখার বিষয়, পরিকল্পনাসহ নানা বিষয় সরেজিমন যাচাই করে। এরপর তারা একটি পরিদর্শন প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। সুপারিশে তারা বিশ্ববিদ্যালয়টি অনুমোদনে পজিটিভ বা নেগেটিভ মতামত দেয়।
যদি পজিটিভ মতামত পাওয়া যায়, তাহলে মন্ত্রণালয় সব তথ্য ফের যাচাই-বাছাই করে। এর পরও যদি উপযুক্ততা পাওয়া যায়, তাহলে তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও যাচাই-বাছাই করা হয়। এরপর উপযুক্ততা মনে করলে প্রধানমন্ত্রী তথা সরকারপ্রধানের অনুমোদন নিয়ে তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এরপর মন্ত্রণালয় অনুমোদনের পরিপত্র জারি করে।
এসব প্রক্রিয়া শেষ করে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পেতে কমপক্ষে এক থেকে দুই বছর লেগে যায়। আরো বেশিও লাগতে পারে। আবার অনেক প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সব ধরনের পজিটিভ মতামত থাকার পরও তা বছরের পর বছর পড়ে আছে—এমন নজির থাকার কথাও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকের কাছ থেকে জানা যায়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান মো. আশরাফুল হাসান ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি অনুমোদনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। মন্ত্রণালয় থেকে দ্রুততার সঙ্গে পরিদর্শন প্রতিবেদনের জন্য ইউজিসিকে চিঠি দেওয়া হয়। ইউজিসিও দ্রুততার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় প্রতিবেদনের জন্য পাঁচ সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে। ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে কমিটিতে ছিলেন ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, অধ্যাপক ড. মো. সাইদুর রহমান, ইউজিসি পরিচালক (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগ) ড. মো. সুলতান মাহমুদ ভূঁইয়া ও সিনিয়র সহকারী পরিচালক নূরী শাহরীন ইসলাম। কমিটি গত বছরের ২৩ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে দ্রুততার সঙ্গে পজিটিভ মতামত দিয়ে প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের অনুমোদন শেষে গত বছরের ১৭ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়টির সাময়িক অনুমোদন দিয়ে পরিপত্র জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে ইউজিসির বড় ধরনের কোনো ভূমিকা নেই। আমাদের কাছে পরিদর্শনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাঠায়। আমরা পরিদর্শন করে প্রতিবেদনসহ তা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিই। একইভাবে গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনের জন্যও আমাদের কাছে চিঠি এসেছিল। আমরা পরিদর্শন করে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। এ ক্ষেত্রে চাপ বা অন্য কোনো বিষয়ের সুযোগ নেই। তবে আমার মনে হয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনের গাইডলাইন আরো স্ট্রং হওয়া দরকার।’
গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের দেড় কোটি টাকা সংরক্ষিত তহবিলের ব্যাপারে জানতে চাইলে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আইন অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার জন্য সংরক্ষিত তহবিল কমপক্ষে পাঁচ কোটি টাকা থাকতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে সেটা নথিপত্র দেখে, জেনেশুনে বলতে হবে।’
ইউজিসির চেয়ারম্যান পদে গত ১৮ মার্চ যোগ দিয়েছেন অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। গত রোববার তাঁর দপ্তরে গেলে গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমি নতুন যোগ দিয়েছি। অতীতে কী হয়েছে সেটা আমি বলতে পারব না। তবে অতীতের কোনো বিষয়ে যদি আমরা অভিযোগ পাই তাহলে তা আমরা খতিয়ে দেখব। আমি মনে করি, এখন বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া উচিত কর্মমুখীভিত্তিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়গুলোর সঙ্গে কর্মবাজারের সম্পৃক্ততা থাকতে হবে। গতানুগতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা খুব একটা দেখছি না।’
আগের ২২টি ঝুলছেই : অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়টি অনুমোদন পেলেও আগে থেকে আরো ২২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের জন্য পড়ে আছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটির পরিদর্শনও শেষ করেছে ইউজিসি। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই পজিটিভ মতামতের প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা আছে। রাজধানীর পূর্বাচলে সাউথ পয়েন্ট বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রামে ইউনিভার্সিটি অব পোর্টো গ্রান্ডে পরিদর্শন শেষে ২০২৪ সালের শুরুতেই পজিটিভ মতামত দিয়ে পরিদর্শন প্রতিবেদন পাঠিয়েছে ইউজিসি। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতেই চুয়াডাঙ্গায় সৃষ্টি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ঠাকুরগাঁওয়ে ইকো ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির বিষয়েও পজিটিভ মতামত পাঠিয়েছে ইউজিসি। ঢাকার বাইরে বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও সেগুলোর অনুমোদন হয়নি। এমনকি রাজশাহীর পাকুরিয়ায় আশ্রয় ইউনিভার্সিটি, রাজশাহীর পবায় ইম্পেরিয়াল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, খুলনায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব এক্সিলেন্স, নারায়ণগঞ্জে ইউনিভার্সিটি অব ইন্টিগ্রেটেড থট (ইউআইটি)-এর ফাইল পড়ে আছে দীর্ঘদিন।
২২ শর্তের এক নম্বরেই গলদ : শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উপসচিব মোছা. রোখছানা বেগম স্বাক্ষরিত গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের পরিপত্রে বলা হয়েছে, “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এর ধারা ৬ অনুযায়ী ২২ শর্তে প্রস্তাবিত ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’ ঢাকা স্থাপন ও পরিচালনার জন্য উক্ত আইনের ধারা ৭ অনুযায়ী সাময়িক অনুমতি দেওয়া হলো।”
পরিপত্রে যে ২২টি শর্তের কথা বলা আছে, তার মধ্যে একটি মাত্র শর্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরুর আগেই পূরণ করার কথা। আর সেটিতেই আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ঘটলেও জবাব জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান গণমাধ্যমের কাছে একেক সময় একেক রকম কথা বলছেন।
পরের শর্তগুলোর বেলায় অগ্রগতির নমুনা দেখতে সম্প্রতি উত্তরার দিয়াবাড়ীতে গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা যায়, আটতলাবিশিষ্ট দুটি ভবন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। অনুমোদনের অনেক আগে থেকেই চলমান ভবন দুটির কাজ প্রায় শেষের দিকে। আগামী সেপ্টেম্বরেই এই ভবনে বিশ্ববিদ্যালযের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হবে।
জানা গেল, দিয়াবাড়ীতে গ্রামীণ ট্রাস্টের প্রায় অর্ধশত একর জায়গায় আগে থেকেই গ্রামীণ ক্যালেডোনিয়ান কলেজ অব নার্সিং পরিচালিত হচ্ছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয় করা হচ্ছে। এ ছাড়া ৭০০ শয্যাবিশিষ্ট সামাজিক হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ এবং স্বাস্থ্য গবেষণা ইনস্টিটিউট করার পরিকল্পনা ও প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে।
গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়টি যখন অনুমোদন পায় তখন শিক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার (সি.আর. আবরার)। তাঁর বক্তব্য পেতে গত ২৯ ও ৩০ মার্চ একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। এমনকি মোবাইল ফোনে মেসেজ পাঠালেও তিনি এর জবাব দেননি।
সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ