ঢাকা, শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বারান্দাও খালি নেই

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ২ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:৫৬ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২১ বার


সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বারান্দাও খালি নেই

ওয়ার্ডে জায়গা নেই, বারান্দায় রোগী, মেঝেতে বিছানা পেতে চলছে চিকিৎসা। হামের দাপটে এমনই বিপর্যস্ত চিত্র রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে। হাসপাতালের প্রতিটি শয্যা যেন এখন একেকটি যুদ্ধক্ষেত্র।

এই ভিড়ের মধ্যেই আট মাসের শিশু হুমায়রাকে নিয়ে এসেছেন বরিশালের বাসিন্দা গোলাম রাব্বি।

শিশুটির জায়গা হয়েছে পাঁচ তলার বসন্ত (পক্স) ওয়ার্ডে—যেখানে সাধারণত পক্সের রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু সিট সংকট এতটাই তীব্র যে, এখন সেই ওয়ার্ডেও হামের রোগীদের ভর্তি করতে হচ্ছে।

 

গোলাম রাব্বি বলছিলেন, ‘আমি আগে একবার পক্সে আক্রান্ত হয়ে এই ওয়ার্ডেই ভর্তি ছিলাম। এখন আমার সন্তান গত নয়দিন ধরে এখানে ভর্তি।

ঈদের পরদিন থেকে ওর জ্বর, এরপর গায়ে গুটি উঠতে শুরু করে। কিন্তু এখানে রোগী আসা থামছে না।’

 

কথা যখন বলছিলেন, তার কপালে তখন সন্তানের জন্য চিন্তার ভাঁজ। তিনি জানান, হাসপাতালের এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হলে জরুরি ভিত্তিতে ডাক্তার-নার্সসহ পর্যাপ্ত জনবল বাড়ানো প্রয়োজন।

 

শিশুকে হামের টিকা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জন্মের পর যেসব টিকা দেওয়া হয়, সেগুলো দিয়েছি। কিন্তু হামের টিকা আমাদের এলাকায় দেওয়া হয়নি। এই টিকার বিষয়ে কোনো ধরনের প্রচার-প্রচারণাও হয়নি।’

শুধু হুমায়রা নয়, প্রতিদিনই নতুন নতুন শিশু আসছে এই হাসপাতালে। সম্প্রতি দেশে হামের প্রকোপ হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এখন পর্যন্ত ২৬ জন রোগী হাম ও হাম-পরবর্তী বিভিন্ন অসুস্থতায় মারা গেছে।

 

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে বর্তমানে হামে আক্রান্ত ১১৫ জন রোগী ভর্তি আছে। এর মধ্যে ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) ও হাই ডিপেন্ডেন্স ইউনিট (এইচডিইউ) মিলিয়ে ১১ জন গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন। অথচ হামের জন্য নির্ধারিত শয্যা মাত্র ১০টি। ফলে বাধ্য হয়ে অন্য ওয়ার্ডগুলোতেও রোগী ভর্তি করা হচ্ছে।

মেঝেতে

চারতলার ধনুষ্টংকার ওয়ার্ডের বারান্দায় দেখা যায় টঙ্গীর বাসিন্দা শরীফুল ইসলামকে। মেঝেতে বিছানা পেতে সন্তানের পাশে বসে আছেন তিনি। কণ্ঠে ক্লান্তি আর অসহায়তা—‘আমরা প্রথমে শিশু হাসপাতালে গিয়েছিলাম। কিন্তু সিট পাইনি৷ এরপর এখানে নিয়ে আসি। এখানেও সিট পাইনি। তাই বারান্দায় ফ্লোরিং করে থাকতে হয়েছে।’

তার সন্তানও হামের টিকা পায়নি। ‘অন্যান্য টিকা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু হামের টিকা আমাদের এলাকায় দেওয়া হয়নি,’ বলেন তিনি।

একই চিত্র কামরাঙ্গীরচরের আয়েশা বেগমের ক্ষেত্রেও। নয় মাস বয়সী মেয়ে মীমকে নিয়ে এসেছেন তিনি। ওয়ার্ডে জায়গা না পেয়ে তাকেও থাকতে হচ্ছে সংকীর্ণ পরিবেশে। উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘গতকাল আমার মেয়েকে নিয়ে এসেছি। আমার মেয়ের গায়ে লাল লাল গুটি উঠেছে।’

হামের টিকা সম্পর্কে জানতেন কিনা- জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘এই টিকার বিষয়ে আমি জানতাম না। এছাড়া আমার এলাকায় এ নিয়ে কোনো ধরনের প্রচার-প্রচারণাও চালানো হয়নি।’

হাম মূলত বায়ুবাহিত অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। দীর্ঘদিন দেশে এই রোগ নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে এ বছর হামের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যাতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে শিশু মৃত্যুও বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে।

চিকিৎসকরা বলছেন, এই পরিস্থিতির পেছনে অন্যতম কারণ টিকাদানে ঘাটতি ও সচেতনতার অভাব।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট (শিশুস্বাস্থ্য) ডা. এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘প্রতি পাঁচ-ছয় বছর পরপর হামের প্রকোপ বাড়ে। ২০১৯ সালেও এমনটা হয়েছিল। এর পেছনে বেশ কিছু বিষয় দায়ী। টিকাদান সম্পর্কে প্রচার-প্রচারণা কমে গেছে। এছাড়া বাবা-মায়ের অবহেলাও অন্যতম কারণ।’

তিনি জানান, হামের টিকা নয় মাস পূর্ণ হলে একবার ও ১৫ মাস পূর্ণ হলে আরেকবার দিতে হয়। কিন্তু বাবা-মায়েরা এই দুই ডোজ দেওয়ার পর বুস্টার ডোজ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় উদাসীন থাকেন।

‘প্রতি পাঁচ বছর পরপর বুস্টার ডোজ দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০২০ সালে এই ডোজ দেওয়া হয়েছিল। এরপর যে পাঁচ বছর চলে গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার হয়তো এটি খেয়াল করতে পারেনি। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে যে টিকা দেওয়ার কথা ছিল, সেটা না দেওয়ায় এবার হামের প্রকোপ বেড়েছে,’ বলেন ডা. এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন।

“সরাসরি হামের কারণে মৃত্যু কম হয়। সাধারণত হাম হলে যেটা হয় যে, দুই বছরের বাচ্চাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দেয়”

হামের সরাসরি মৃত্যু কম হলেও, এর জটিলতা মারাত্মক হতে পারে বলে জানান তিনি। এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘সরাসরি হামের কারণে মৃত্যু কম হয়। সাধারণত হাম হলে যেটা হয় যে, দুই বছরের বাচ্চাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দেয়। ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করার সুযোগ পায়। ফলে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া-ডায়রিয়ার মত রোগ অনেক বেড়ে যায়।’

অভিভাবকদের প্রতি তার পরামর্শ, শিশুর জ্বর, সর্দি-কাশির সঙ্গে গায়ে তিলের মতো গুটি উঠলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখতে হবে এবং অবশ্যই টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে।

এমন সংকট মোকাবেলায় সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা, চিকিৎসক-নার্সের সংখ্যা বাড়ানো এবং আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সহায়ক কর্মী নিয়োগেরও দাবি জানিয়েছেন তিনি।


   আরও সংবাদ