ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

৫ ব্যাংকের শেয়ারমূল্য পুনর্নির্ধারণের প্রত্যাশা

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১৭:৫২ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৭ বার


৫ ব্যাংকের শেয়ারমূল্য পুনর্নির্ধারণের প্রত্যাশা

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তড়িঘড়ি করে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করা হয়। দুর্বল ব্যাংকগুলো অবসায়নের জন্য নতুন অধ্যাদেশ জারি করে এই ব্যাংকগুলোর শেয়ারের মূল্য শূন্য ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীকে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হয়। অথচ ব্যাংকগুলোর দুর্বল হয়ে পড়ার পেছনে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কোনো ভূমিকা ছিল না।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুরোধ উপেক্ষা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া ওই পদক্ষেপ নতুন করে পর্যালোচনা করে দেখবে নির্বাচিত সরকার—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন বিনিয়োগকারীরা। বিভিন্ন পর্যায়ের ভুক্তভোগী বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানতে পারে বাংলানিউজ।

 

২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হন ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি এসেই বিগত সাড়ে ১৫ বছরে অনিয়মের কারণে দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাংক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন।

বিএনপি নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টু তার আয়ত্তে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংককে একীভূতকরণের হাত থেকে বাঁচিয়ে নিলেও শেষ পর্যন্ত শরিয়াভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় পড়ে যায়।

 

ব্যাংকগুলো হলো—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক। একীভূত করে গঠিত নতুন ব্যাংকের নাম দেওয়া হয় ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’।

এই ব্যাংকটিকে সরকারি ব্যাংক হিসেবে পরিচালনার জন্য বিশাল আয়োজন শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ইতোমধ্যে সব আয়োজন শেষ করে সীমিত পরিসরে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু হয়েছে। এ জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ’ নামে একটি আইন পাস করতে হয়। ওই আইনের ৩৩ ধারায় মূলধন ও যোগ্য দায় হ্রাস এবং/অথবা রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা রয়েছে। ওই নির্দেশনার আলোকে সংশ্লিষ্ট পাঁচ ব্যাংকের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা শেয়ারের মূল্য শূন্য ঘোষণা করেন গভর্নর।

 

বিএসইসি মনে করে একটি শেয়ারের বাজারমূল্য কখনও শূন্য হতে পারে না।

বাংলাদেশ ব্যাংক যে প্রক্রিয়ায় এই শেয়ারের মূল্য শূন্য ঘোষণা করেছে, তা বিএসইসি কখনওই সমর্থন করেনি। বরং বিএসইসি আগেই চিঠি দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীর স্বার্থ সংরক্ষণে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি তা লিখিত আকারে জানিয়েছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাতে ভ্রুক্ষেপ করেনি।

গত বছরের ৫ নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে ৫ ব্যাংকের শেয়ারমূল্য শূন্য হবে বলে ঘোষণা দেন আহসান এইচ মনসুর। পরের দিন ৬ নভেম্বর শেয়ারহোল্ডাররা ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়। বলা হয়, সরকার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বা শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বিশেষ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।

এরও দুই দিন পর (৯ নভেম্বর) তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা ‘চূড়ান্ত নয়’। এটা তারা দেখবেন বলেও উল্লেখ করেছিলেন অর্থ উপদেষ্টা। তবে এরপর আর বিষয়টি এগোয়নি।

নভেম্বরের ৩০ তারিখ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চূড়ান্ত অনুমোদন পায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, এই ব্যাংক পরিচালনায় নতুন ব্যাংকটির মোট পেইড-আপ ক্যাপিটাল ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা, আর বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা এসেছে আমানতকারীদের শেয়ার থেকে।

জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে আমানতকারীদের শর্তসাপেক্ষে টাকা তুলতে দিচ্ছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে শেয়ার কেনা বিনিয়োগকারীদের খালি হাতে ফিরতে হয়েছে।

এ বিষয়ে এক্সিম ব্যাংকের শেয়ারধারী বিনিয়োগকারী মোহাম্মাদ জামাল উদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমরা তো সামান্য মুনাফার আশায় সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে শেয়ার কিনেছিলাম। শেয়ার কেনা তো অন্যায় নয়। এখন হঠাৎ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে শেয়ার ভ্যালু শূন্য হয়ে গেছে। যারা ব্যাংক লুটপাট করেছে এটা তাদের দায়। তাদের দায় আমরা কেন নেব?’

এটা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া একটি সিদ্ধান্ত এবং বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেই মনে করেন মোহাম্মাদ জামাল উদ্দিন।

তিনি বলেন, ‘বিএনপি নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে। আমি চাইবো নতুন সরকার বিষয়টি পুনঃপর্যালোচনা করে দেখবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে আগেই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চিঠি দিয়েছিল বিএসইসি।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর দেওয়া চিঠিতে বিএসইসি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে ৫টি বিষয় জরুরি বলে জানায় বাংলাদেশ ব্যাংককে। এগুলো হলো:
১। ব্যাংকগুলোর ব্যালান্সশিটে প্রদর্শিত সম্পদ মূল্যায়নের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর লাইসেন্স, ব্রাঞ্চ নেটওয়ার্ক, ক্লায়েন্ট বেজ, হিউম্যান রিসোর্স বেজ, সার্ভিস ডেলিভারি মেকানিজম এবং ব্র্যান্ড ভ্যালু ইত্যাদি মূল্যায়ন করে বিক্রয়মূল্য বিবেচনায় সাধারণ বিনিয়োগকারীর (ধারা-৭৭-এ বর্ণিত দায়ী ব্যক্তিগণ ব্যতীত) স্বার্থ নির্ধারণ করা;
২। ব্যাংকগুলোর ব্যালান্সশিটে প্রদর্শিত সম্পদ মূল্যায়নের পাশাপাশি ব্যাংক প্রদত্ত ঋণের বিপরীতে সংরক্ষিত জামানত এবং দায়ী ব্যক্তিদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকপূর্বক আদায়যোগ্য অর্থ বিবেচনায় নিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীর স্বার্থ নির্ধারণ করা;
৩। ধারা-৭৭-এ বর্ণিত দায়ী ব্যক্তিগণ কর্তৃক ধারণকৃত শেয়ার ব্যতীত অন্যান্য সাধারণ শেয়ারহোল্ডারগণ বা সাধারণ বিনিয়োগকারী কর্তৃক বিনিয়োগকৃত অর্থকে (বাজারমূল্য ও ফেস ভ্যাল্যুর মধ্যে যেটি বেশি) সাধারণ বিনিয়োগকারীর ন্যূনতম স্বার্থমূল্য বিবেচনায় রেখে একীভূতকরণের অনুপাত নির্ধারণ করা;
৪। উপর্যুক্ত মূল্যায়ন বিবেচনায় নিয়ে পাঁচটি ব্যাংকের সাধারণ বিনিয়োগকারীর স্বার্থমূল্য অনুপাতে ব্যাংকগুলোকে একীভূত করা; এবং
৫। ব্যাংকগুলোতে সাধারণ বিনিয়োগকারীর স্বার্থমূল্য অনুপাত নির্ধারণ ও তা ঘোষণা না করে অথবা সাধারণ বিনিয়োগকারী কর্তৃক ধারণকৃত শেয়ারের অ্যাকুইজিশন মূল্য নির্ধারণ ও তা ঘোষণা না করে স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে তালিকাচ্যুত (ডিলিস্ট) না করা।

তবে সেই চিঠির নির্দেশনা আমলে নিতে দেখা যায়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। উল্টো এর মাস দেড়েক পরে গত নভেম্বরে তারা ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের আলোকে নেগেটিভ নেট অ্যাসেট ভ্যালুর (এনএভি) ভিত্তিতে শেয়ারমূল্য শূন্য ঘোষণা করে।

এ বিষয়ে বিএসইসির মুখপাত্র ও পরিচালক মো. আবুল কালাম বাংলানিউজকে বলেন, ‘বিএসইসি মনে করে একটি শেয়ারের বাজারমূল্য কখনও শূন্য হতে পারে না। বাংলাদেশ ব্যাংক যে প্রক্রিয়ায় এই শেয়ারের মূল্য শূন্য ঘোষণা করেছে, তা বিএসইসি কখনওই সমর্থন করেনি। বরং বিএসইসি আগেই চিঠি দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীর স্বার্থ সংরক্ষণে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি তা লিখিত আকারে জানিয়েছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাতে ভ্রুক্ষেপ করেনি।’

তিনি আরও বলেন, ব্যাংকগুলোর দুরাবস্থার জন্য যারা দায়ী তারা ইতোমধ্যে চিহ্নিত। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ছিল না, কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ছিল না। তারা নামে-বেনামে ঋণ নিয়েও কোম্পানিটাকে নষ্ট করেনি। তারা শুধু বাজার থেকে শেয়ার কিনেছিল। তাহলে এই সমস্ত দায় কেন বিনিয়োগকারীদের ঘাড়ে যাবে—সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।

বিএসইসির অবস্থান স্পষ্ট করে আবুল কালাম বলেন, বিনিয়োগকারীরা শেয়ারটি মার্কেট ভ্যালু অথবা ফেস ভ্যালু—যে মূল্যেই কিনে থাকুক না কেন, এ দুটির মধ্যে যেটি বেশি, সেটি তাদেরকে দিতে হবে। অন্তত যারা দায়ী নয়, কোনোভাবেই ওই ব্যাংকের দুরবস্থার সঙ্গে যুক্ত নয়—এমন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অন্তত শেয়ারমূল্য দিতে হবে। অথবা ওই কোম্পানির একটি শেয়ার তাদেরকে দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

তিনি বলেন, এই ৫ ব্যাংক বেইলআউট করার জন্য ৩৫ হাজার কোটি টাকা দিয়ে আরেকটি ব্যাংক গঠন করা হলো। সেখান থেকে ৪০০-৫০০ কোটি টাকা কেন বিনিয়োগকারীদের জন্য রাখা হলো না কেন্দ্রীয় ব্যাংক?

বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, ‘আমরা আবারও বলছি, আমরা বিএসইসির পক্ষ থেকে কারিগরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত আছি। টেকনিক্যাল কমিটি করার একটি বিধান রয়েছে। আমরা সেখানে বলেছি যে বিএসইসির অন্তত একজন কর্মকর্তা যেন ওই টেকনিক্যাল কমিটিতে থাকেন। দায়ী ব্যক্তি ব্যতীত যারা একদম সাধারণ বিনিয়োগকারী, তাদের চিহ্নিত করাও তো একটি কাজ। সেটির জন্য যেন কমিশনকে রাখা হয়, যাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা হয়।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাঁচ ব্যাংকের সমস্ত সম্পদ, দায়দেনা, গ্রাহক, জনবল, লেনদেন ব্যবস্থা—সবই থেকে যাচ্ছে। তাহলে বিনিয়োগকারীরা কেন কিছু পাবে না?

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘এই ব্যাংকগুলোর নেট অ্যাসেট ভ্যালু নেগেটিভ হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ মাইনাসে চলে গিয়েছিল। সেই হিসেবে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে উল্টো আরও টাকা আদায় করার কথা। কিন্তু আমরা তো সেটা করছি না।’

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, কোম্পানির শেয়ার যখন মার্কেটে লিস্টেড হয়, তখন এনএভি দিয়ে ট্রেড হয় না; ভবিষ্যৎ সেল ভ্যালু দেখেই ট্রেড হয়। ব্যাংকগুলোর অবস্থা ভালো হলে শেয়ারের মূল্যও বাড়তে পারত।

এ ব্যাপারে পুঁজিবাজারে স্টক ব্রোকারদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকগুলো যে দুর্বল হয়ে পড়েছে, এটা তো আগে থেকে এত স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। আগের রেগুলেটররা সঠিকভাবে তদারকি করতে পারেনি। ব্যাংকগুলোর ব্যালান্সশিটেও আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি। এটা একটি রেগুলেটরি ফেইলর বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতা।

হঠাৎ করে নেট অ্যাসেট ভ্যালু মাইনাস হয়ে গেল! এতে তো বিনিয়োগকারীর দোষ নেই। ব্যাংকগুলো তালিকাভুক্ত কোম্পানি। বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কিনেছে। যারা বিক্রি করে গেছে তারা বেঁচে গেছে, কিন্তু কারো না কারো হাতে তো শেয়ার আছে। আমাদের একটি প্রস্তাব ছিল—যারা উদ্যোক্তা, তাদেরগুলো বাদ দিয়ে অন্যদের শেয়ারের দাম দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, এই ব্যালান্সগুলো তো একদিনে লুট হয়নি। পাঁচ-সাত বছর ধরে লুট হয়েছে। এই পাঁচ-সাত বছরে রেগুলেটরের নিষ্ক্রিয়তায় ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমরা এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের কাছে একটি প্যাকেজ দাবি করেছিলাম। সেই দাবিতে এখনও আছি।

আলোচিত পাঁচ ব্যাংকে ৩০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন ট্রাস্ট ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের বিনিয়োগকারী ফখরুল ইসলাম। বিনিয়োগ হারিয়ে অনেকটাই দিশেহারা ফখরুল বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমরা কী দোষ করেছিলাম? আমরা তো কারও টাকা মেরে খাইনি। তাহলে আমাদের পুঁজি শূন্য হবে কেন? যারা বিগত সময়ে ৫টি ব্যাংককে লুটতরাজে সহায়তা করল, তাদের বিচার না করে আমাদের নিঃস্ব করে দিল। বিএসইসি জোরালো দাবি করতে পারত—৫টি ব্যাংকে যে সকল সাধারণ বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগ রয়েছে, সেই পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিয়ে তারপর মার্জার করতে পারবেন। এই রকম কোনো উদ্যোগ আমরা দেখিনি।’

এদিকে এই ঘটনার পর থেকে বাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চিড় ধরেছে। আর্থিকভাবে লোকসানের মুখে পড়ায় নতুন করে বিনিয়োগও করতে পারছেন না এই পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারধারীরা। ফলে সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাজারের ওপর একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে শেয়ারমূল্য শূন্য করার বিষয়টি।

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত পরিষদের সভাপতি আ ন ম আতাউল্লাহ নাঈম বলেন, ‘আইনের মারপ্যাঁচে ফেলে কোনোভাবেই বিনিয়োগকারীদের অধিকার ক্ষুণ্ন করা বা কেড়ে নেওয়া যাবে না। সংকট উত্তরণে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা তহবিল যোগান দিচ্ছে। সব কিছু চলছে, শুধু বিনিয়োগকারীরা সব কিছু থেকে বঞ্চিত হবে—এই ধরনের দ্বিমুখী আচরণ আমাদের মানতে কষ্ট হচ্ছে। ভবিষ্যতে দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের নিরাপত্তা না থাকলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।’

নির্বাচিত সরকার পুঁজিবাজারকে ইতিবাচক ধারায় ফেরাতে এবং আস্থা বাড়াতে পাঁচ ব্যাংকের বিনিয়োগকারীদের শেয়ারমূল্য পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি পর্যালোচনা করার দাবি জানান তিনি।

অভিযোগ রয়েছে, পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাংলাদেশ ব্যাংক বা বিএসইসির সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার মুদ্রাবাজারে আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখতে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা দিয়ে বেইলআউট করছে। পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতেও সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেটা সরকারকেই দেখতে হবে।

পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ‘হঠাৎ করে নেট অ্যাসেট ভ্যালু মাইনাস হয়ে গেল! এতে তো বিনিয়োগকারীর দোষ নেই। ব্যাংকগুলো তালিকাভুক্ত কোম্পানি। বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কিনেছে। যারা বিক্রি করে গেছে তারা বেঁচে গেছে, কিন্তু কারো না কারো হাতে তো শেয়ার আছে। আমাদের একটি প্রস্তাব ছিল—যারা উদ্যোক্তা, তাদেরগুলো বাদ দিয়ে অন্যদের শেয়ারের দাম দিতে হবে।’

উদ্যোক্তাদের শেয়ারমূল্য না দেওয়ার কারণ সম্পর্কে আবু আহমেদ বলেন, তারাই তো বোর্ডে ছিল। তাদের সহযোগিতা ছাড়া তো ব্যাংকগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক এই অধ্যাপক বলেন, ‘এটার একটি ভালো সমাধান হতে পারে—নেট অ্যাসেট ভ্যালু নেগেটিভ হলেও এই সমস্ত সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কিছুটা হলেও ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায় কি না, সেটা ভেবে দেখা। এতে করে সরকারের যদি হাজার কোটি টাকা যায়ও, তাও দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। এই লোকগুলোর তো দোষ নেই। কারণ এগুলো ব্যাংক তো গত এক বছর আগেও ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছিল। ভেতরে ভেতরে যে শেষ হয়ে গেছে, সে খবর তো আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এত বিশদভাবে জানা সম্ভব ছিল না।’


   আরও সংবাদ