আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:১৯ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩৩ বার
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের ডেটা সেন্টার ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোয় সাম্প্রতিক রুশ হামলায় প্রায় ১ লাখ পরিবার ইন্টারনেট সমস্যায় পড়েছে। একই সময়ে দেশটির সবচেয়ে বড় ইস্পাত কারখানা আর্সেলর মিত্তাল ক্রিভিই রিহ উৎপাদন বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।
এসব ঘটনায় ইউক্রেনের বেসামরিক অবকাঠামো ও অর্থনীতির ওপর যুদ্ধের চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গত বুধবার কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায় রুশ ড্রোন হামলায় একাধিক ডেটা সেন্টার ও ইন্টারনেট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইউক্রেনের ডিজিটাল রূপান্তর মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলার পর রাজধানী ও কিয়েভ অঞ্চলের প্রায় ১ লাখ পরিবার ইন্টারনেট সেবায় সমস্যার মুখে পড়ে।
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান নেটব্লকসের তথ্য অনুযায়ী, হামলার পর কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত কয়েকটি ইন্টারনেট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সংযোগে বিঘ্ন ঘটে।
কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তাদের মূল নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম রাখা স্থাপনা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বলছেন, ডেটা সেন্টার ও যোগাযোগ অবকাঠামোতে হামলার কারণে শুধু সাধারণ মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহারই ব্যাহত হচ্ছে না; ব্যাংকিং, পেমেন্ট ব্যবস্থা, সরকারি সেবা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল নেটওয়ার্কও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
ডিজিটাল অবকাঠামোতে নতুন চাপ
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইউক্রেন সরকার যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে নিয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্নের মধ্যেও মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবাদাতারা যাতে ব্যাকআপ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারেন, সে জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে ইউক্রেনের তুলনামূলকভাবে বিকেন্দ্রীভূত ইন্টারনেট নেটওয়ার্কও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কোনো একটি ডেটা সেন্টার বা নেটওয়ার্ক নোড ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে সেবা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে।
তবে সাম্প্রতিক হামলার মাত্রা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একাধিক ডেটা সেন্টার ও নেটওয়ার্ক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে ডিজিটাল সেবার ওপর চাপ বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সেন্টারকে লক্ষ্যবস্তু করে তথ্যপ্রবাহ ব্যাহত করার চেষ্টা করছে।
পোল্যান্ডেও স্টারলিংক স্টেশনে আগুন
ইউক্রেনের যোগাযোগব্যবস্থাকে ঘিরে উদ্বেগের মধ্যে প্রতিবেশী পোল্যান্ডের একটি স্টারলিংক গ্রাউন্ড স্টেশনে আগুন লাগার ঘটনাও সামনে এসেছে।
গত বুধবার রাতে মধ্য পোল্যান্ডের ভোলা ক্রোবভস্কা এলাকায় ওই স্টেশনে আগুন লাগে। স্টেশনটি পোল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান এক্সাটেলের মালিকানাধীন এবং পোল্যান্ডের মাধ্যমে ইউক্রেনসহ বিভিন্ন স্থানে ইন্টারনেট ট্রাফিক সরবরাহে ভূমিকা রাখে।
পোল্যান্ডের ডিজিটালবিষয়ক মন্ত্রী ক্রিশতোফ গাওকোভস্কি ঘটনাটিকে সম্ভাব্য ‘নাশকতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং এর সঙ্গে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কসহ কর্মকর্তারা তদন্ত শেষ হওয়ার আগে রাশিয়ার সরাসরি সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করার বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বনের কথা জানিয়েছেন।
ফলে ইউক্রেনের ডিজিটাল অবকাঠামোয় হামলা এবং পোল্যান্ডের স্টারলিংক স্টেশনে আগুন—দুই ঘটনাকে একই সমন্বিত হামলার অংশ হিসেবে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করার মতো চূড়ান্ত তদন্ত-ফল এখনও প্রকাশিত হয়নি।
বন্ধ হলো ইউক্রেনের বৃহত্তম ইস্পাত কারখানা
ডিজিটাল অবকাঠামোয় হামলার পাশাপাশি ইউক্রেনের শিল্প খাতেও যুদ্ধের প্রভাব আরও দৃশ্যমান হয়েছে। দেশটির সবচেয়ে বড় ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আর্সেলর মিত্তাল ক্রিভিই রিহ তাদের কারখানার উৎপাদন বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, রুশ বিমান হামলার পর নিরাপদ ও টেকসইভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিয়েভে সাম্প্রতিক রুশ হামলায় সাতজন নিহত হওয়ার পর শুক্রবার প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদন বন্ধের কথা জানায়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই হামলায় একটি শিশুসহ সাতজন নিহত হন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেনজুড়ে রুশ বিমান হামলার তীব্রতা বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদন, অবকাঠামো ও বেসামরিক অর্থনীতিতে।
অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ
ইউক্রেনের অর্থনীতির জন্য শিল্প উৎপাদন ও অবকাঠামো সচল রাখা যুদ্ধের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে উৎপাদন ও রপ্তানি কমার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও সরকারের রাজস্ব আদায়েও প্রভাব পড়তে পারে।
একই সঙ্গে অবকাঠামোতে ধারাবাহিক হামলা হলে ব্যাংকিং, অনলাইন পেমেন্ট, সরকারি সেবা এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফলে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রুশ হামলা এখন শুধু বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোয় সীমাবদ্ধ নেই; ডেটা সেন্টার, ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক ও শিল্প স্থাপনাও যুদ্ধের প্রভাবের মুখে পড়ছে। তবে এসব হামলার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো কত দ্রুত পুনরুদ্ধার করা যায় এবং শীত মৌসুমে হামলার মাত্রা কীভাবে পরিবর্তিত হয় তার ওপর।