ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৪ অগাস্ট, ২০২৬ ১৪:১৩ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩৫ বার
ক্ষুদ্র লেনদেন থেকে শুরু করে দোকান, রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন সেবার মূল্য পরিশোধে নগদের বিকল্প হিসেবে অভিন্ন কিউআর ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ছে। বাংলা কিউআর চালুর দুই মাস না পেরোতেই দৈনিক গড় লেনদেনের সংখ্যা ৩ লাখ ছাড়িয়েছে।
টাকার অঙ্কে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১০ কোটি টাকার বেশি। একই সঙ্গে বাংলা কিউআর গ্রহণকারী মার্চেন্টের সংখ্যাও ১৬ লাখ থেকে বেড়ে প্রায় ৩০ লাখে উন্নীত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ের শুরুর দিকে দৈনিক গড়ে প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার বাংলা কিউআর লেনদেন হতো। এসব লেনদেনের আর্থিক মূল্য ছিল গড়ে ৩৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।
সম্প্রতি দিনে গড়ে প্রায় ৩ লাখ ৩ হাজার বাংলা কিউআর লেনদেন হচ্ছে, যার মাধ্যমে দৈনিক গড়ে ১১০ কোটি ৩৮ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে।
অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যেই লেনদেনের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ এবং আর্থিক লেনদেন প্রায় তিনগুণ হয়েছে।
বেসরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি সরকারি ব্যাংকগুলোও এ ব্যবস্থার সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, অভিন্ন এই কিউআর ব্যবস্থা চালুর ফলে ডিজিটাল লেনদেন আরও সহজ, নিরাপদ ও সর্বজনীন হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বাংলানিউজকে বলেন, বাংলা কিউআর কোনো নতুন মোবাইল অ্যাপ, প্ল্যাটফর্ম বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস নয়। এটি একটি অভিন্ন কিউআর ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএসের গ্রাহক একই কিউআর স্ক্যান করে অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন।
এতদিন একজন গ্রাহককে কোনো দোকান বা রেস্তোরাঁয় পেমেন্ট করতে গিয়ে নির্দিষ্ট ব্যাংক বা এমএফএস প্রতিষ্ঠানের কিউআর ব্যবহার করতে হতো। কোনো মার্চেন্টের কাছে কাঙ্ক্ষিত সেবার কিউআর না থাকলে গ্রাহককে বিকল্প পদ্ধতিতে অর্থ পরিশোধ করতে হতো। বাংলা কিউআর এ সীমাবদ্ধতা কমিয়ে আনবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্রের মতে, বাংলা কিউআরের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—একটি কিউআর ব্যবহার করেই বিভিন্ন ব্যাংক ও এমএফএসের অ্যাপ থেকে অর্থ পরিশোধ করা যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ক্ষুদ্র লেনদেনকে নগদবিহীন ব্যবস্থার আওতায় আনা। রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, সবজি বিক্রেতা থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের ছোট ব্যবসায়ীরাও এর মাধ্যমে নগদ অর্থ ছাড়াই লেনদেন করতে পারবেন। এতে খুচরা টাকা ও ছেঁড়া নোটের সমস্যা যেমন কমবে, তেমনি নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকিও কমে আসবে।
একই সঙ্গে মার্চেন্টদের হিসাব-নিকাশ আরও সহজ হবে। লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড থাকায় আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে অনানুষ্ঠানিক খাতের ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোও আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে।
২০২৭ সালের মধ্যে মোট লেনদেনের ৭৫ শতাংশকে ক্যাশলেস বা নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যাংক, এমএফএস ও অন্যান্য ফিনটেক প্রতিষ্ঠানের আন্তঃসংযোগ আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২১ সালে দেশে বাংলা কিউআর চালুর উদ্যোগ নেয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালে এটিকে ইন্টারঅপারেবল ব্যবস্থায় নেওয়া হয়। বর্তমানে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
সর্বশেষ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে দেশের সব মার্চেন্ট পয়েন্টে বাংলা কিউআর ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মো. মোস্তাকুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংক খাতে নতুন কিছু ঘটবে এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল খাতসংশ্লিষ্টদের মাঝে। সেই প্রত্যাশার বড় একটি প্রতিফলন দেখা গেল গত জুলাইয়ের ১ তারিখে। ওই দিন থেকে দেশে শুরু হয়েছে সর্বত্র বাংলা কিউআরের ব্যবহার। এর মধ্যে দিয়ে দেশ নগদবিহীন লেনদেন বড় ধরনের একটি অগ্রগতির পথে এগিয়ে যায়। গত দেড় মাসে এই বাংলা কিউআর-কে জনপ্রিয় করতে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার, অলিগলিতে ছুটে বেড়িয়েছেন তিনি।
এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকে দেশের প্রধান প্রধান ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে বাংলা কিউআরের উদ্বোধন করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
১ জুলাইয়ের মধ্যে দেশের সকল মার্চেন্ট পয়েন্টে থাকা বিদ্যমান একাধিক কিউআর কোড এই বাংলা কিউআর দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে গত ১ এপ্রিল নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
বর্তমানে বেশিরভাগ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এই কিউআর সিস্টেমের মধ্যে রয়েছে। ফলে একটি কিউআর কোড স্ক্যান করেই যেকোনো ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকরা কেনাকাটা বা সেবার বিল পরিশোধ করতে পারবেন।
’বেটার দ্যান ক্যাশ অ্যালায়েন্স‘ ও সরকারের এটুআই কর্মসূচির ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে জিডিপি বছরে প্রায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
নগদবিহীন লেনদেন সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বাংলা কিউআর কোডভিত্তিক সকল লেনদেনে ইন্টারচেঞ্জ রিইমবার্সমেন্ট ফি (আইআরএফ) প্রত্যাহার করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে এই কোডভিত্তিক লেনদেনে বাড়তি প্রণোদনাও ঘোষণা করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
অর্থাৎ, কার্ড ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠান অ্যাকোয়ারিং প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো ফি বা সার্ভিস চার্জ নিতে পারবে না।
গত ১০ আগস্ট এ সংক্রান্ত এক সার্কুলার জারি করে দেশে কার্যরত সকল তফসিলি ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস প্রোভাইডার, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার, পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটরদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট-২।
এই নির্দেশনা আগামী ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সার্কুলারে বলা হয়, ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বাংলা কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন সংক্রান্ত নির্দেশনা সংশোধিত বলে গণ্য হবে এবং অন্যান্য নির্দেশনা অপরিবর্তিত থাকবে।
একই দিন অন্য এক সার্কুলারে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, বাংলা কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক পরিশোধ ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যক্তিক রিটেইল হিসাবের মাধ্যমে অনবোর্ডকৃত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক পণ্য বিক্রেতা এবং সেবা প্রদানকারী মার্চেন্ট পয়েন্টে সম্পাদিত ২ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতিটি লেনদেনের বিপরীতে মাসিক ভিত্তিতে প্রণোদনা দেওয়া হবে।
এ ক্ষেত্রে, শর্তসাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট অ্যাকোয়ারিং প্রতিষ্ঠানকে লেনদেনের পরিমাণের ০.১০ শতাংশ এবং ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠানকে লেনদেনের পরিমাণের ০.২০ শতাংশ প্রণোদনা প্রদান করা হবে বলে জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ সংক্রান্ত শর্তাবলীতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, প্রণোদনা পাওয়ার উদ্দেশ্যে কোনো একক লেনদেনকে একাধিক ছোট লেনদেনে বিভক্ত করা, ট্রানজেকশন স্ট্রাকচারিং করা বা অন্য কোনো কৌশল অবলম্বন করা যাবে না; বাতিল হওয়া কোনো লেনদেনের বিপরীতে প্রণোদনা প্রাপ্য হবে না।