ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৮ জুন, ২০২৬ ০৮:১৮ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৯ বার
দেশের ব্যাংকিং খাতের ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, সরকারের ঋণের বোঝা, রাজস্ব ঘাটতি, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা এবং রাজধানীর নাগরিক সমস্যাগুলোকে দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ঢাকা-১২ আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। সংকটাপন্ন এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, লোকসানি প্রতিষ্ঠান পুনর্মূল্যায়ন এবং ব্যাংক খাতের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার (২৭ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ১৬তম দিনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ব্যাংকিং খাতের অবস্থাকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ৩০ দশমিক ১৭ শতাংশে পৌঁছেছে। দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।
সরকারি ঋণের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের সুদ বাবদ প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা এবং আসল বাবদ প্রায় ৪১ থেকে ৪৯ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে, যা অর্থনীতির ওপর বড় চাপ।
দীর্ঘদিন ধরে যেসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান লোকসান গুনছে, সেগুলো টানার পরিবর্তে পুনর্মূল্যায়নের সময় এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও আদায়ের সঙ্গে তুলনায় প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার ঘাটতির আশঙ্কা প্রকাশ করেন এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, কার্যকর বাজেট ঘাটতি প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে, যা মোট বাজেটের প্রায় অর্ধেক। এছাড়া মোট বাজেটের প্রায় ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশ বা ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে, যা কমিয়ে আনা জরুরি।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের দুর্বলতা তুলে ধরে সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার রেকর্ড সর্বনিম্ন ৬৮ শতাংশে নেমে এসেছে। যে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নই করা যায় না, তার সুফল জনগণ পায় না। এসময় তিনি ভ্যাট ফাঁকি রোধে সব দোকান ও পাইকারি পর্যায়ে ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার (ইসিআর) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেন।
বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জকে জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় বোঝা উল্লেখ করে জামায়াতের এ নেতা বলেন, এ বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। আদানি ইস্যুরও পুনর্মূল্যায়ন করার জোরালো আহ্বান জানান তিনি।
সারা দেশে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, একজন সংসদ সদস্যের ছেলেও চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক হয়েছেন, যা প্রমাণ করে সরকার চাইলে ব্যবস্থা নিতে পারে। ব্যাটারিচালিত রিকশার চার্জিং স্টেশনসহ নতুন নতুন খাতে চাঁদাবাজি বিস্তার লাভ করেছে। দেশে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন অপরিহার্য।
এসময় তিনি জুলাই আন্দোলনের ঘোষিত সংস্কার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটানোর আহ্বান জানান।
রাজধানীর নাগরিক দুর্ভোগ তুলে ধরে সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, অল্প বৃষ্টিতেই ঢাকার রাস্তায় হাঁটুসমান পানি জমে যায়। অনেক এলাকায় দুর্গন্ধযুক্ত পানি সরবরাহ করা হচ্ছে, আবার অনেকেই পানি পাচ্ছেন না। গ্যাস সংকটও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
স্বাস্থ্য খাতের সমালোচনা করে তিনি বলেন, অর্থোপেডিক হাসপাতালের মতো বিশেষায়িত হাসপাতালেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও কার্যকর যন্ত্রপাতির সংকট রয়েছে। প্রায় ৭০০ হাসপাতাল বিভিন্ন কারণে কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
ইসলামী ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াচ্ছে— সরকারের এমন বক্তব্যের বিষয়ে জামায়াতের এ সংসদ সদস্য বলেন, ইসলামী ব্যাংকের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, খেলাপি ঋণ ৬ হাজার ৭১২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৬ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা হয়েছে। এ তথ্য সরকারের ঘুরে দাঁড়ানোর দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সাইফুল আলম খান মিলন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দুর্নীতি দমন ও প্রশাসনিক দক্ষতা একসঙ্গে নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার সরকারি উদ্যোগের প্রশংসা করেন তিনি।