ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৮ মে, ২০২৬ ০৯:৪৮ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১২ বার
খাবার টেবিলে বসে আমরা সবাই কম-বেশি একটি উপদেশ শুনে বড় হয়েছি ‘চিবিয়ে খাও, হজম ভালো হবে’। তবে আধুনিক গবেষণা বলছে, এই চিবানোর সুফল কেবল পেটের চৌহদ্দিতেই আটকে নেই; এর সুফল লুকিয়ে আছে আমাদের মগজের কোষেও।
নিয়ম মেনে চিবিয়ে খেলে শুধু যে বুদ্ধি খোলে তা-ই নয়, এটি আলঝেইমার্সের মতো মারাত্মক স্মৃতিভ্রংশ রোগকেও দূরে রাখতে পারে।
হোরেস ফ্লেচারের চর্বণ মতবাদ, চিবানোর আদি ইতিহাস
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের কথা।
হরাস ফ্লেচার নামের এক মার্কিন স্বশিক্ষিত পুষ্টিবিদ একটি ছোট পেঁয়াজ (শ্যালট) গিলে ফেলার আগে গুনে গুনে ৭২২ বার চিবিয়েছিলেন! এই অদ্ভুত অভ্যাসের কারণে তার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘দ্য গ্রেট ম্যাস্টিকেটর’ বা মহাচর্বণকারী। ফ্লেচারের মূল মন্ত্র ছিল—খাবারকে মুখে চিবিয়ে যতক্ষণ না তরল করা হচ্ছে এবং সেটি নিজে থেকেই গলার নিচে নেমে যাচ্ছে, ততক্ষণ চিবিয়েই যেতে হবে।
তার এক অভিনব হিসেবে দেখা যায়, মানুষ যদি এভাবে চিবিয়ে খাওয়া শুরু করে তবে প্রতিদিন গড়ে আধা পাউন্ড (২২৭ গ্রাম) কম খাবারেই পেট ভরবে। আর এর ফলে তৎকালীন মার্কিন অর্থনীতিতে প্রতিদিন সাশ্রয় হতো প্রায় সাড়ে ৫ লাখ ডলার, যা আজকের বাজারে প্রায় ১ কোটি ৯৫ লাখ ডলারের সমান!
আজকের যুগের গবেষকেরা ফ্লেচারের এই চর্বণ-দর্শনকে কিছুটা চরমপন্থী মনে করলেও, সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের ডেন্টাল হেলথ বিভাগের অধ্যাপক ম্যাটস ট্রুলসন স্বীকার করেছেন, ‘কিছু দিক থেকে ফ্লেচার আসলে একদম সঠিক ছিলেন।
মন দিয়ে চিবিয়ে খেলে শুধু হজমই ভালো হয় তা নয়, বরং এটি ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ করে, মানসিক চাপ-উদ্বেগ কমায় এবং মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তিকে দারুণভাবে শাণিত করে।
বিবর্তনের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ৬০ থেকে ৭০ লাখ বছর আগের আদিম মানুষের দাঁত ছিল আজকের বনমানুষদের মতো—বনের রসালো ফলমূল চিবানোর উপযোগী। কিন্তু জলবায়ুর বদলে বনভূমি যখন তৃণভূমি আর সাভানায় রূপ নিল, তখন খাবারের মেন্যুতে যুক্ত হলো শক্ত বীজ, বাদাম আর মাটির নিচের মূল বা টিউবার। এই শক্ত খাবার চিবানোর তাগিদেই মানুষের চোয়াল ও মুখের আকৃতি বড় হলো, দাঁতের মাড়ি ও পেশি হয়ে উঠল আরও শক্তিশালী।
পরবর্তীতে মানুষের হাতে এলো আগুন, রান্না এবং কৃষিকাজ। ফলে খাবার নরম হয়ে আসায় চিবানোর খাটুনিও কমে গেল। জার্মানির ম্যাক্স প্লাংক ইনস্টিটিউটের গবেষক অ্যাডাম ভ্যান কাস্টেরেন জানান, আধুনিক মানুষ দিনে গড়ে মাত্র ৩৫ মিনিট চিবানোর পেছনে ব্যয় করে। অথচ আমাদের নিকটাত্মীয় শিম্পাঞ্জি বা বেবুন দিনে সাড়ে ৪ ঘণ্টা এবং গরিলা বা ওরাংওটাংরা প্রায় ৬ দশমিক ৬ ঘণ্টা চিবিয়ে খাবার খায়! তবে বিবর্তন যেভাবেই হোক, মূল উদ্দেশ্য কিন্তু বদলায়নি; উষ্ণ রক্তের স্তন্যপায়ী হিসেবে খাবার থেকে সর্বোচ্চ শক্তি নিংড়ে নেওয়াই এই চিবানোর আসল রহস্য।
পুষ্টির শোষণ কম-বেশির রহস্য ও কম চিবানোর ক্ষতি
নেদারল্যান্ডসের ইউট্রেক্ট ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের ওরাল ফিজিওলজি বিশেষজ্ঞ আন্দ্রিস ভ্যান ডার বিল্টের মতে, চিবানো হলো পরিপাক বা হজমের প্রথম ধাপ। আমরা যখন চিবোই, তখন মুখে লালা এবং ‘অ্যামাইলেজ’ নামক এনজাইমের ক্ষরণ বাড়ে।
অধ্যাপক ট্রুলসন সতর্ক করে বলেন, আপনি যদি খাবার না চিবিয়েই গিলে ফেলেন, তবে পাকস্থলী ও অগ্ন্যাশয় সেই খাবার সামলানোর জন্য ভেতর থেকে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগই পায় না।
ওরোফেসিয়াল নিউরোসায়েন্টিস্ট অভিষেক কুমার জানান, খাবার চিবিয়ে ছোট টুকরো করলে তার উপরিভাগের ক্ষেত্রফল বেড়ে যায়, ফলে পরিপাক রসগুলো খাবারের ওপর সহজে কাজ করতে পারে। অন্যথায়, বড় টুকরোগুলো পেটের ভেতর দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকে এবং অণুজীবগুলো সেখানে গাঁজন প্রক্রিয়া শুরু করে। ফলশ্রুতিতে পেট ফাঁপা, কোষ্ঠকাঠিন্য ও অস্বস্তিকর অনুভূতির সৃষ্টি হয়।
২০০৯ সালের একটি চমকপ্রদ গবেষণায় ১৩ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে এক মুঠো বাদাম (অ্যালমন্ড) ১০, ২৫ এবং ৪০ বার চিবিয়ে খেতে বলা হয়েছিল। পরবর্তীতে তাদের মল পরীক্ষা করে দেখা গেল, যারা ৪০ বার চিবিয়েছিলেন, তাদের শরীর বাদাম থেকে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি শক্তি ও পুষ্টি শোষণ করতে পেরেছে এবং মলের সঙ্গে চর্বির অপচয় সবচেয়ে কম হয়েছে।
(উল্লেখ্য, ১৯০০-এর দশকে ফ্লেচার বিশ্বাস করতেন, বেশি চিবোলে যে মল তৈরি হয় তা পুরোপুরি শুষ্ক থাকে এবং তার সুবাস নাকি অনেকটা ‘গরম বিস্কুটের’ মতো হয়!)
কম খাবারে পেট ভরা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং তৃপ্তির হরমোন
২০১৩ সালের আরেকটি গবেষণায় ২১ জন অংশগ্রহণকারীকে চিকেন নাগেটের আকারের এক টুকরো পিৎজা ১৫ বার এবং ৪০ বার চিবিয়ে খেতে দেওয়া হয়। দেখা গেল, যারা ৪০ বার চিবিয়েছিলেন, তাদের ক্ষুধা লাগার অনুভূতি নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। এর পেছনের বিজ্ঞান হলো, বেশি চিবোলে শরীর থেকে তৃপ্তিদায়ক হরমোন (CCK এবং GIP) বেশি নিঃসৃত হয় এবং ক্ষুধার হরমোন ‘ঘেরলিন’ (Ghrelin) কমে যায়।
প্রায় ৫০টি গবেষণার এক মেটা-অ্যানালাসিস বলছে, বেশি চিবোলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই কম খাবার খায়। কারণ, আমরা যা খাচ্ছি সেই অনুযায়ী পেট ভরে যাওয়ার সংকেত মগজে পৌঁছাতে প্রায় ২০ মিনিট সময় লাগে। চিবানোর অভ্যাস মূলত মগজকে সেই সময়টুকু দেয়।
ব্রাজিলের ৯২ জন শিশুর ওপর করা এক জরিপেও দেখা গেছে, স্থূল বা অতিরিক্ত ওজনের শিশুরা স্বাভাবিক ওজনের শিশুদের তুলনায় অনেক দ্রুত এবং কম চিবিয়ে খাবার গিলে ফেলে। গবেষক অভিষেক কুমার তাই ওজন কমাতে তরল বা নরম খাবারের বদলে আঁশযুক্ত বা টেক্সচার্ড খাবার (যেমন কমলার জুসের বদলে আস্ত কমলা, ভাতের বদলে ওটমিল বা ফ্ল্যাক্সসিড) খাওয়ার পরামর্শ দেন, যা চিবানোর গতিকে মন্থর করে।
ব্রেন বুস্টার: কামড় ও মগজের গোপন সেতু
নিউট্রিশন আর ডাইজেস্টশনের বাইরে গবেষকদের নজর কেড়েছে আরেকটি বিষয়—বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিবানোর অভ্যাসের ওপর আমাদের মগজের সুস্থতা নির্ভর করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হচ্ছে ‘বাইট-ব্রেন অ্যাক্সিস বা কামড়-মস্তিষ্ক সংযোগ’। দেখা গেছে, দাঁত পড়ে যাওয়ার সঙ্গে আলঝেইমার্স ও ডিমেনশিয়ার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
ইউরোপের ১৪টি দেশে ২৮ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি প্রবীণ মানুষের (যাদের বয়স ৫০ বছরের বেশি) ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, যাদের নিজস্ব দাঁত ভালো বা যারা বাঁধানো দাঁত (ডেন্টচার) ছাড়াই চিবোতে পারেন, তারা শব্দ মনে রাখা, কথা বলার সাবলীলতা বা গণিতের মতো বুদ্ধিবৃত্তিক পরীক্ষায় অনেক ভালো করেছেন।
৫৫ থেকে ৮০ বছর বয়সী ২৭৩ জন মানুষের ওপর করা আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের মুখে প্রাকৃতিক দাঁতের সংখ্যা বেশি, তাদের দীর্ঘমেয়াদি ও সেমান্টিক মেমোরি (পৃথিবীর জ্ঞান ও তথ্য মনে রাখার ক্ষমতা) অনেক তীব্র।
দাঁতের সঙ্গে ব্রেনের সম্পর্ক কী?
কিন্তু দাঁতের সঙ্গে স্মৃতির কী সম্পর্ক? গবেষকেরা বলছেন, আমাদের চিবানোর চোয়াল ও পেশির সঙ্গে মগজের ‘হিপোক্যাম্পাস’ অঞ্চলের একাধিক স্নায়বিক সার্কিটের সরাসরি সংযোগ রয়েছে। আর আলঝেইমার্স রোগে এই হিপোক্যাম্পাসই প্রথম আক্রান্ত হয়।
জাপানি গবেষকদের মতে, চিবানোর ফলে মগজে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়। অধ্যাপক ট্রুলসন সহজ করে বুঝিয়ে বলেন, তত্ত্বটি হলো, চিবানো আসলে একটি পাম্পের মতো কাজ করে, যা সরাসরি মগজে রক্ত পাম্প করে পাঠায়। এই রক্তই মগজকে সতেজ রাখে।
বর্তমানে ট্রুলসনের দল ৮০ জনেরও বেশি রোগীর হারিয়ে যাওয়া দাঁতের জায়গায় কৃত্রিম দাঁত (ইমপ্লান্ট) বসিয়ে এমআরআই স্ক্যানের মাধ্যমে দেখছেন যে, চিবানোর ক্ষমতা ফিরিয়ে দিলে মস্তিষ্কের রক্তনালীর ক্ষত (White matter lesions) কমে মগজকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব কি না।

সংগৃহীত ছবি
মনোযোগ বৃদ্ধি ও মানসিক চাপ মুক্তির দাওয়াই
২১টি গবেষণার একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, কোনো কঠিন কাজ করার সময় চুইংগাম চিবোলে মানুষের মনোযোগের স্তর সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পায় (যদিও এই গবেষণাটি চুইংগাম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মার্স রিগলি দ্বারা অর্থায়িত ছিল)।
তবে ৮০ জনের ওপর করা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি গবেষণায় দেখা গেছে, চিবানোর ফলে ব্রেনের সতর্কতা ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং বুদ্ধিমত্তা বা আইকিউ টেস্টেও তারা ভালো করেন।
অধ্যাপক ট্রুলসন অবশ্য জানিয়েছেন, মনোযোগ বৃদ্ধির এই প্রভাব ১৫ থেকে ২০ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয় না। অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, একসঙ্গে চারটি কম্পিউটারাইজড কাজ করার সময় যারা গাম চিবোচ্ছিলেন, তাদের সতর্কতা প্রায় ২০ শতাংশ বেশি ছিল এবং একইসঙ্গে তাদের লালায় স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’-এর মাত্রা কম ছিল।
গবেষণাগারের বাইরেও চিবানো একটি চমৎকার স্ট্রেস-রিলিভার। তুরস্কের ১০০ জন নার্সিং শিক্ষার্থীর ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষার আগে প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট চুইংগাম চিবানোর ফলে তাদের মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্নতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
কোরিয়ায় নারীদের গাইনোকোলজিক্যাল সার্জারির আগে কিংবা তুরস্কে ৭৩ জন শিশুর শরীরে ক্যানুলা পরানোর সময় চুইংগাম চিবিয়ে প্রাক-অপারেশন উদ্বেগ কমানোর প্রমাণ মিলেছে।
সিঙ্গাপুরের ওরাল প্রসেসিং গবেষক জিয়ানশে চেনের মতে, মানসিক চাপের সময় চিবানো একটি প্রাকৃতিক প্রতিবর্ত ক্রিয়া বা রিফ্লেক্স। অনেকেই স্ট্রেসের সময় অজান্তেই দাঁত কিড়মিড় করেন বা ব্রুক্সিজমে আক্রান্ত হন, যা মূলত একই চোয়ালের পেশি ব্যবহার করে।
তবে জিয়ানশে চেন মনে করেন, চিবানোর সঙ্গে মানসিক শান্তিবস্থার এই যোগসূত্রের প্রমাণগুলো এখনো কিছুটা বিক্ষিপ্ত এবং এর জন্য আরও নিয়মতান্ত্রিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সিজারিয়ান অপারেশনের আগে বা কোনো অমীমাংসিত ধাঁধার সমাধান করার সময় চুইংগাম চিবিয়ে নারীদের উদ্বেগ বা মানসিক চাপ কমেনি।
তবে একটা বিষয় নিশ্চিত—খাবার আমাদের মন ভালো করে। আর চিবানোর মাধ্যমেই খাবারের স্বাদ, গন্ধ ও টেক্সচার পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়, যা খাওয়ার অভিজ্ঞতাকে আনন্দদায়ক করে তোলে।
হরাস ফ্লেচারের মতো শতবার চিবানোর কোনো জাদুকরী বা ধরাবাঁধা সংখ্যা নেই। ডা. ভ্যান ডার বিল্টের শেষ পরামর্শ হলো, খাবারটি গিলে ফেলার মতো উপযোগী না হওয়া পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে চিবিয়ে যান এবং প্রতিটি লোকমা উপভোগ করুন।
অতিরিক্ত চিনিযুক্ত গাম চিবানোর চেয়ে, কোনো মানসিক চাপের কাজের আগে বাদাম বা গাজরের মতো স্বাস্থ্যকর ও শক্ত খাবার চিবানোই হতে পারে আপনার মগজ ও স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে সেরা দাওয়াই।
সূত্র: বিবিসি