ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৮ মে, ২০২৬ ১০:৪৭ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৬ বার
চরম এক বৈশ্বিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির টালমাটাল পরিস্থিতিকে সঙ্গী করে নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে নির্বাচিত বিএনপি সরকার। যার মোট আকার হতে পারে ৯ লাখ ২০ হাজার থেকে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা।
যেখানে বিরাজ করছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, চড়া পণ্যমূল্য, জ্বালানি খাতের অস্থিরতা, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কার, বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ঘাটতি, বাজেট বাস্তবায়নে ধীর গতি। এমন পরিস্থিতিতে রেকর্ড পরিমাণ ঘাটতি নিয়ে নতুন অর্থবছরের জন্য এক ব্যয়-বিলাসী বাজেট ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অভিষিক্ত অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
একইভাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানেরও অভিষেক হতে যাচ্ছে সংসদে প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসে বাজেট অধিবেশন প্রত্যক্ষ করার। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ১১ জুন অর্থমন্ত্রী হিসেবে জাতীয় সংসদে প্রথমবারের মতো বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপন করবেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থ বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকারকে জনতুষ্টির জন্য বেশ কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে।
এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও খাল খনন কর্মসূচি। শুধু ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নেই এ খাতে ৫ বছরে সরকারের ব্যয় হবে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নবম বেতন কাঠামো বাস্তবায়নেও এক বছরে খরচ হবে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি দিতে এসব পণ্য আমদানিতে কর ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। যার ফলে সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে বাড়বে ভর্তুকির পরিমাণ। এর সঙ্গে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ক্যাপাসিটি চার্জ বহাল রাখায় এ খাতেও ভর্তুকির পরিমাণ বাড়বে। যার ফলে বাজেটে সামগ্রিক ব্যয়ের মাত্রা বাড়বে। যদিও বাজেটে মোট আয় ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার। এতে করে নতুন অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ধরা হতে পারে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেওয়া হতে পারে ১ লাখ কোটি টাকা। ঘাটতির বাকি ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। নতুন বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি এডিপির আকার হতে পারে ৩ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং আইএমএফের চাপে পড়ে ভর্তুকি কমাতে দায়িত্ব গ্রহণের দুই মাসেরও কম সময়ের মাথায় সরকারকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে হয়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় চলছে। যার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে হু-হু করে। নিম্ন শ্রেণির মানুষ তো জীবন চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। এর ফলে বেড়েছে মূল্যস্ফীতি। আসছে নতুন বছরে মূল্যস্ফীতির এই চাপ আরও বাড়বে। ফলে প্রবৃদ্ধি সহায়ক বাজেট প্রণয়নের কথা ভুলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে বাজেটে অধিক গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।
জানা গেছে বিপুল ব্যয়ের এই বাজেটে আয়ের খাত ঠিক রাখতে সরকারকে অনেক প্রিয়-অপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ধনীদের সম্পদের ওপর সারচার্জ বৃদ্ধি, করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, মোটরসাইকেল ও চার্জার রিকশার মতো নিম্ন ও মধ্য শ্রেণির মানুষের বাহনের ওপর করারোপের মতো সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। তবে মধ্য, নিম্নবিত্তসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিতে খাদ্যপণ্য আমদানির ওপর কর কমানো হতে পারে। এতে করে নিত্যপণ্যের দাম কমবে। একইভাবে সামগ্রিক আয় বাড়াতে করের আওতা বাড়ানো হচ্ছে। এমনকি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকেও করের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। অন্যদিকে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাজেট বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে। যা সরকারের বার্ষিক ব্যয় বৃদ্ধি করবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এবারের বাজেটটা বিএনপি সরকারের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। কেননা দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর দলটি দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন তারেক রহমান। প্রায় ১৭ বছর ধরে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার দেশকে শোষণ করে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, অনেক দিন পর দেশের মানুষ ভোট দিয়ে একটা সরকার গঠন করেছে। ফলে এ সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। এজন্য প্রথম বাজেটের দিকে নজর থাকবে প্রায় সব শ্রেণির মানুষেরই।
এদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশকে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪০৯ কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭৪ কোটি ডলার বেশি। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৩৩৫ কোটি ডলার এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ২৬৭ কোটি ডলার। মূলত বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় ঋণ পরিশোধ ব্যয়ও দ্রুত বেড়ে গেছে। আসছে বছর ঋণ পরিশোধের এই চাপ আরও বাড়বে। একইভাবে সরকারের ওপর বাজেট ঘাটতির চাপও বাড়বে। কেননা সরকারের রাজস্ব আদায় হচ্ছে না প্রত্যাশা অনুযায়ী। অর্থবছরের ৯ মাসে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে এই ঘাটতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। এই পরিস্থিতিই জানান দিচ্ছে, আসছে বছর বাজেট ঘাটতি আরও বাড়বে। এবং সেই ঘাটতি পূরণে সরকারকে আবারও বড় অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ নিতে হবে। কেননা ঘাটতি অর্থায়নের জন্য দেশীয় উৎস থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাত ঋণ বঞ্চিত হবে। এতে দেশের বিনিয়োগ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। অবশ্য বর্তমানে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি মোটেও সুখকর নয়।
আর্থিক সংকট মোকাবিলায় ব্যয়সংকোচনের কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকারি ব্যয় কমানোর নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। এতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে সরকারকে ধারাবাহিকভাবে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। আগামী ২০২৬-২৭ বছর এই ঋণের মাত্রা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচির ধারা স্বাভাবিক রাখতে প্রথমবারের মতো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আগামী অর্থবছরে এডিপির আকার হতে যাচ্ছে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। চলমান এডিপির চেয়ে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা বেশি। আজ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় আগামী অর্থবছরের এডিপি পাস হতে পারে, যা পরে বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। নতুন এডিপিতে প্রকল্পের সংখ্যা থাকতে পারে ১ হাজার ১২১টি।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন