ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৬ মে, ২০২৬ ১০:১২ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১২ বার
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রার্থিতাকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ব্রাজিল।
২০২৬ সালের ২ জুন নিউইয়র্কে অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে বাংলাদেশ সাইপ্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
শুক্রবার (১৫ মে) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ার ঐতিহাসিক পালাসিও দো প্লানালতোতে দেশটির প্রেসিডেন্টের প্রধান উপদেষ্টা সেলসো আমোরিমের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে দুই দেশ কৌশলগত অংশীদারত্ব, বহুপাক্ষিক সহযোগিতা এবং গ্লোবাল সাউথের সংহতি জোরদারে অঙ্গীকার ব্যক্ত করে।
বৈঠকের শুরুতে সেলসো আমোরিম প্রেসিডেন্ট লুলার শুভেচ্ছা বাংলাদেশের নেতৃত্ব ও জনগণের কাছে পৌঁছে দেন।
তিনি বাংলাদেশকে গ্লোবাল সাউথের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও উদীয়মান কণ্ঠস্বর হিসেবে অভিহিত করেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার প্রশংসা করেন।
দুই নেতা বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের ৫৩ বছরের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। হুমায়ুন কবির উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দক্ষিণ আমেরিকার প্রথম দেশ হিসেবে ব্রাজিল বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে বহুমাত্রিক কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ নিচ্ছে।
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ‘টেট-আ-টেট স্ট্র্যাটেজিক ফোরাম’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব। সেলসো আমোরিম বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের উপদেষ্টা পর্যায়ে নিয়মিত একান্ত বৈঠকের একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের প্রস্তাব দেন।
তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বোঝাপড়া জরুরি।
হুমায়ুন কবির এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সমন্বয় আরও সুদৃঢ় হবে।
বৈঠকে বাংলাদেশ-ব্রাজিল বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা হয়। উভয়পক্ষ জানায়, দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বর্তমানে প্রায় চার বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। তবে এই সম্ভাবনার তুলনায় বর্তমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক এখনও অপর্যাপ্ত বলে মত দেন তারা।
হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের অর্থনীতি একে অপরকে পরিপূরক করতে সক্ষম। বাংলাদেশ ব্রাজিল থেকে তুলা, সয়াবিন, চিনি ও কৃষিপণ্য আমদানি করে, অন্যদিকে ব্রাজিলে তৈরি পোশাক, ওষুধ, পাটজাত পণ্য ও সিরামিক রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি সরাসরি শিপিং ব্যবস্থা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতা কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বৈঠকে চলতি বছরের ব্রাজিলের সাধারণ নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিতব্য ফরেন অফিস কনসালটেশনস (এফওসি) নিয়েও আলোচনা হয়। কৃষি, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, জ্বালানি ও উদ্ভাবনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতি নিয়ে আলোচনায় হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে ‘সমতা, মর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পৃক্ততা’র ভিত্তিতে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার নতজানু বা আত্মসমর্পণমূলক পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাস করে না; বাংলাদেশের কূটনীতি হবে আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক।
তিনি আরও জানান, দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার স্বার্থে সরকার সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে আগ্রহী।
বৈঠকে ব্রিকসের সদস্যপদ পাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহও তুলে ধরা হয়। এ বিষয়ে সেলসো আমোরিম বলেন, তিনি বিষয়টি প্রেসিডেন্ট লুলার সঙ্গে আলোচনা করবেন এবং বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।
এ সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এনডিবি) ঢাকায় একটি শাখা স্থাপনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এনডিবির সদস্য হলেও দেশে ব্যাংকটির কোনো শাখা না থাকায় সীমিতসংখ্যক প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে।
বৈঠকে প্রযুক্তিগত ও কারিগরি সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়। কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল রূপান্তর, জনস্বাস্থ্য, শিল্প উদ্ভাবন ও প্রতিরক্ষা গবেষণায় সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, অত্যন্ত আন্তরিকতা, কৌশলগত বোঝাপড়া ও নবায়িত আস্থার পরিবেশে বৈঠকটি শেষ হয়। কূটনৈতিক মহলে এই বৈঠককে বাংলাদেশ-ব্রাজিল সম্পর্কের কৌশলগত পুনঃসূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।