ঢাকা, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

অরক্ষিত চট্টগ্রামের উপকূল

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১১:৪৩ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১০ বার


অরক্ষিত চট্টগ্রামের উপকূল

চট্টগ্রাম: ভয়াল ২৯ এপ্রিল আজ। ১৯৯১ সালের এইদিনে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা, সীতাকুণ্ড, মীরসরাই, সন্দ্বীপসহ উপকূলীয় এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

 

ঘূর্ণিঝড়ে দেশে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ প্রায় হারিয়েছেন এবং প্রায় ১ কোটি মানুষ তাদের সর্বস্ব হারিয়েছেন। প্রলয়ংকরী এই তাণ্ডবের পর ৩৫ বছরেও উপকূলীয় এলাকাগুলোতে স্থায়ী বেড়িবাঁধ হয়নি।

অরক্ষিত এসব অঞ্চলের বাসিন্দারা ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের খবর শুনলে এখনও নির্ঘুম রাত পার করেন।

 

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল রাতে শুধু বাঁশখালীতেই প্রাণহানির সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি বলে ধারণা করা হয়।

অসংখ্য বসতঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংস হয়ে যায়। বিপুল সংখ্যক গবাদিপশুও ভেসে যায়।

বর্তমানে বাঁশখালীর বাহারছড়া, ছনুয়া, সাধনপুর ও খানখানাবাদ ইউনিয়নে ৬.২১০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের কাজ চলমান রয়েছে। এ প্রকল্পে ৪৯৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সাঙ্গু মোহনায় প্রায় ১,৩০০ মিটার পুরোনো বাঁধ সংস্কারের কাজও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। 

 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গুণগত মান বজায় রেখেই কাজ এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২৪ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পাথর সংকটের কারণে ব্লক কাস্টিং আপাতত বন্ধ রয়েছে, তবে জিও-ব্যাগ ডাম্পিং কার্যক্রম চলমান আছে।

আনোয়ারা উপকূলে ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সেই ট্র্যাজেডির পর উপকূল সুরক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড ৫৭৭ কোটি টাকার বেড়িবাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। বর্তমানে আরও প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি টাকার নতুন উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে।

রায়পুর ইউনিয়নের পরুয়াপাড়া, ছিপাতলী ঘাট, পূর্ব গহিরা ও সরেঙ্গা এলাকায় বাঁধ উন্নয়নের কাজ চলছে। তবে কিছু অংশ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে বাইঘ্যার ঘাট ও জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নের কিছু অংশে প্রায় ১ কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিতে রয়েছে। 

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, আনোয়ারার পারকী সমুদ্র সৈকতের সাপমারা খাল থেকে শুরু করে পরুয়াপাড়া, মধ্যম গহিরা, রায়পুর, বার আউলিয়া, ঘাটকূল, ফকিরহাট, সরেঙ্গা, সাপ মারা খাল হয়ে পারকি বিচ পর্যন্ত, পোল্ডার বি এর অধীনে শিকলবাহা হতে চাতরি, কৈখাইন, পরৈকোড়া, হাইলধর, বারখাইন, তৈলারদ্বীপ, বরুমচড়া, জুঁইদন্ডি, শঙ্খ মুখ পর্যন্ত ৩১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। নতুন প্রকল্পে সাগর উপকূলে ৭.৫ মিটার উচ্চতা ও ৪.৩ মিটার প্রস্থের টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। কাজ শেষ হলে দুই লক্ষাধিক মানুষ নিরাপত্তা পাবে।

১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে সন্দ্বীপে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ মারা যান। বাড়িঘর, ফসলের মাঠ, রাস্তা-ঘাটসহ পুরো সন্দ্বীপ বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর বিদেশি দাতাদের অনুদানে নির্মিত হয় বড় বেড়িবাঁধ। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সন্দ্বীপ বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এই দ্বীপের ১৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ এখনও অরক্ষিত। সরকারিভাবে গত দশ বছরে বড় কয়েকটি প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

সন্দ্বীপের উপকূল সুরক্ষায় ব্লক বেড়িবাঁধ নির্মাণে বিপুল অর্থ বরাদ্দের পরও প্রকল্প বাস্তবায়নে নিম্নমানের কাজ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। স্থানীয়রা জানান, ২৫ কিলোমিটার ব্লক বেড়িবাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও এখনও পর্যন্ত আংশিক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বসানো কংক্রিট ব্লক সরে যাওয়া, ধসে পড়ায় বাঁধের ক্ষতি হয়েছে। অনেক এলাকায় এখনও নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে কালাপানিয়া, আমানউল্লাহ, দীর্ঘাপাড় এবং উড়িরচর ইউনিয়নের উপকূলীয় জনপদ। এর মধ্যে উড়িরচরের দক্ষিণাংশে পরিস্থিতি ভয়াবহ। নদীর তীব্র স্রোত ও জলোচ্ছ্বাসে প্রতিনিয়ত ভূমি বিলীন হচ্ছে।

২৯ এপ্রিল মধ্যরাতে আঘাতহানা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল সীতাকুণ্ডের সলিমপুর থেকে সৈয়দপুর পর্যন্ত ৯টি ইউনিয়ন। প্রায় ২২৫ কিলোমিটার গতিবেগ সম্পন্ন ও ৩০-৩৫ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে উপকূল পরিণত হয়েছিল বিরাণ ভূমিতে। এসময় মারা গিয়েছিল এলাকার প্রায় ৭ হাজার মানুষ। নিখোঁজ হয়েছিল প্রায় ৩ হাজার শিশু-নারী-পুরুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল প্রায় তিনশত কোটি টাকার সম্পদ।

বর্তমানে সীতাকুণ্ডের কুমিরা ও সোনাইছড়ি ইউনিয়নের দুই স্থানে চার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বিলীন হয়ে গেছে। সোনাইছড়ি ইউনিয়নের ঘোড়ামারা এলাকায় চার কিলোমিটার বেড়িবাঁধের তিন কিলোমিটারই বিলীন। কুমিরা ইউনিয়নের আলেকদিয়া এলাকায় প্রায় এক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বিলীন হয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দাবি, বেড়িবাঁধের এসব অংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন হওয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ড সংস্কার করতে পারছে না।

অপরদিকে বাঁশবাড়িয়া সৈকত থেকে কুমিরা ফেরিঘাট পর্যন্ত চার কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে তিন কিলোমিটারে ব্লক বসানো হয়েছে। জোয়ারের আঘাতে এই বেড়িবাঁধের ১৬টি স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব স্থানে ব্লক সরে গিয়ে কিছু অংশে তৈরি হয়েছে গর্ত। বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট এলাকায় সিকদার খালের স্লুইসগেটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

বঙ্গোপসাগরের ভাঙন থেকে রক্ষার জন্য ১৯৯৪ সালে মীরসরাই উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলে চর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট প্রজেক্টের (সিডিএসপি) আওতায় নির্মাণ করা হয় ১১.৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বাঁধ। এরপর এ বাঁধ ঘিরে গড়ে ওঠে শত শত মৎস্য প্রকল্প, যা চট্টগ্রামের মাছের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ পূরণ করে আসছে। মৎস্য খামার মালিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বর্ষণে সেই বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 


   আরও সংবাদ