ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৭ এপ্রিল, ২০২৬ ০৯:৪১ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৯ বার
২০০৭ সালের জানুয়ারির এক রাতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে টেলিফোন করলেন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ। তাদের দুজনের কথোপকথনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাওয়া যায় ‘শান্তির স্বপ্নে, সময়ের স্মৃতিচারণ’ বইটিতে। বইয়ের লেখক তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন নিজেই। বইটির ৩২৮ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘সবার অনুরোধে আমি তাকে (ড. ইউনূস) ফোন করে প্রধান উপদেষ্টা হতে অনুরোধ করে সব রকমের সহায়তার নিশ্চয়তা দিলাম।
তবু তিনি রাজি হলেন না। তিনি বললেন, বাংলাদেশকে তিনি যেমন দেখতে চান সে রকম বাংলাদেশ গড়তে খন্ডকালীন সময় যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশকে তিনি আরও দীর্ঘ সময় ধরে সেবা দিতে আগ্রহী।’
ড. ইউনূস ২০০৭ সালে খন্ডকালীন সময়ের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হতে রাজি ছিলেন না।
কিন্তু তিনিই আবার ২০২৪-এ এসে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হলেন সানন্দে। কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই খুলে যাবে রহস্যের অনেক জট। এ প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই পাওয়া যাবে ইউনূস সরকারের দেড় বছরের দেশবিরোধী এবং উন্নয়নবিনাশী কর্মকান্ডের কারণ।
তার আগে একটু দেখে নেওয়া যাক এক-এগারো এবং ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের মিল কোথায় ছিল।
দুটি সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই প্রেক্ষাপটে। সুশীল সমাজ এবং কয়েকটি বিদেশি রাষ্ট্রের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টায় ২০০৭ সালে বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের বিভাজন সহিংসতায় রূপ নেয়। চরম রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটি অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় বসে। ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল একটি গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে দীর্ঘ পনেরো বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।
ছাত্র-জনতার অভিপ্রায় অনুযায়ী ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এক-এগারো সরকার ছিল পুরোপুরি সুশীল নিয়ন্ত্রিত। অন্যদিকে ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারে জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল। এ দুটি মৌলিক পার্থক্য ছাড়া দুটি সরকারের কার্যক্রম ছিল প্রায় একই ধরনের। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মনে হতেই পারে যে এক-এগারোর অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করাই যেন ছিল ইউনূস সরকারের অন্যতম এজেন্ডা। এক-এগারো সরকার নির্বাচনবিরোধী ছিল। তথাকথিত রাজনৈতিক সংস্কারের নামে তারা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিল। ইউনূস সরকারও ঠিক একই রকম মনোভাব দেখিয়েছে। ইউনূস সরকার দায়িত্ব নিয়েই বলতে শুরু করে, আগে সংস্কার তারপর নির্বাচন। প্রথম আট মাস তারা নির্বাচন নিয়ে কোনো আলোচনাতেই আগ্রহী ছিল না। বরং নির্বাচনের কথা বললে বিরক্ত হতো। দেশ পরিচালনায় যখন ইউনূস সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় এবং বিরোধী দলগুলো নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের ডাক দেয়, তখন জনবিচ্ছিন্ন অন্তর্বর্তী সরকার বাধ্য হয়েই নির্বাচনের পথে হাঁটে। ২০০৭ সালেও এক-এগারো সরকার বলেছিল, আগে সংস্কার তারপর নির্বাচন। ফখরুদ্দীন-মইন উর সরকারও দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ হয়ে জনগণের চাপে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছিল।
এক-এগারোর সময় যে রাজনৈতিক সংস্কারগুলো সামনে আনা হয়েছিল, ২০২৪-এর রাজনৈতিক সংস্কারের ধরন প্রায় একই। সরকারের ক্ষমতা খর্ব করা, প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাহীন করা, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা ছিল এসব সংস্কারের মৌলিক লক্ষ্য। পার্থক্য হলো, এক-এগারোর সময় এসব সংস্কার প্রস্তাব আনা হয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলোর ভিতর থেকে। দলগুলোর ভিতরে বিভক্তি তৈরি করে একটা অংশকে দিয়ে সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে তাদের দুর্বল করা ছিল এক-এগারোর রাজনৈতিক সংস্কার কৌশল। আর ইউনূস সরকারের রাজনৈতিক সংস্কারের কৌশল ছিল ভিন্ন। তারা সংস্কার কমিশনের ছাতার নিচে সব রাজনৈতিক দলকে একত্র করে। তারপর এক-এগারোর অসম্পূর্ণ স্বপ্ন রাজনৈতিক দলগুলোর কাঁধে বন্দুক রেখে বাস্তবায়নের চেষ্টা করে। রাজনৈতিক দলগুলো রাজি হোক বা না হোক, সুশীল সমাজের আবিষ্কৃত সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর নামে চাপিয়ে দেওয়ার এক প্রতারণা করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলো যেখানে আপত্তি জানিয়েছে, সেগুলো তারা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করে। সংবিধান সংস্কার আদেশ এবং গণভোট তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বিদেশি এক ব্যক্তি কীভাবে অযৌক্তিকভাবে অমীমাংসিত বিষয়গুলো প্রতারণা করে গণভোটের চারটি প্রশ্নে সন্নিবেশিত করেছেন, জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। অর্থাৎ এক-এগারোর অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করতে চেয়েছিলেন ড. ইউনূস।
এক-এগারোর সরকার চেয়েছিল বেসরকারি খাত ধ্বংস করতে। এজন্য তারা বেসরকারি খাতের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ করে। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগ তুলে তাদের হয়রানি করা হয়। শীর্ষ দুর্নীতিবাজের কথিত মনগড়া তালিকা করে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংসের চেষ্টা করা হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে চলে চাঁদাবাজি আর লুণ্ঠন। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে প্রায় তেরো শ কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ইউনূস সরকারও এক-এগারোর পদাঙ্ক অনুসরণ করে বেসরকারি খাত ধ্বংসের নেশায় মেতে ওঠে। একদিকে মব বাহিনীর হামলা, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের শিকার হয় হাজার হাজার কলকারখানা; অন্যদিকে মুহূর্তেই বেকার হয়ে পড়েন লাখো শ্রমিক। এক-এগারোর মতোই ইউনূস সরকার বড় বড় বেসরকারি উদ্যোক্তাদের দুর্নীতিবাজ বানিয়ে তাঁদের ইমেজ নষ্টের চেষ্টা করে। তাঁদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের মনগড়া গল্প সাজিয়ে দেশের অর্থনীতির বারোটা বাজিয়েছিলেন ড. ইউনূস। এক-এগারো সরকার যেমন কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই শীর্ষ দুর্নীতিবাজদের মনগড়া তালিকা প্রকাশ করে বেসরকারি খাতকে মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চেয়েছিল, তেমনি ইউনূস সরকারও স্বপ্নে পাওয়া তাবিজের মতো অর্থ পাচারকারীর কল্পিত গল্প বানিয়েছিল। এক-এগারোর সরকার যেভাবে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের প্রেসক্রিপশনে অর্থনীতিকে ঋণনির্ভর করতে চেয়েছিল; ঠিক একই কাজ করেছিল ইউনূস সরকার। এক-এগারো সরকার বিদেশনির্ভর এবং ঋণনির্ভর অর্থনীতির যে ধারা তৈরি করেছিল; তা ইউনূস সরকার আরও এগিয়ে নিয়েছে। এখন এখান থেকে বেরিয়ে আসাই নির্বাচিত সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এক-এগারো সরকার যেমন চেয়েছিল শিক্ষা ধ্বংস করতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে রেখেছিল দিনের পর দিন। ঠিক তেমনি ইউনূস সরকারও শিক্ষা ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠেছিল। মব সন্ত্রাস চালিয়ে শিক্ষক অপমান, শিক্ষাঙ্গনে পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে দেড় বছরে শিক্ষার বারোটা বাজায় ইউনূস সরকার। শিক্ষা এখন এমন অবস্থায় আছে, যেখান থেকে একে সঠিক পথে আনতে অনেক সময় লাগবে। এক-এগারোর সময় দুটি সুশীল সংবাদপত্র সরকারের অংশ হয়ে রাজনৈতিক নেতা এবং ব্যবসায়ীদের চরিত্রহননের জন্য প্রচারণা চালিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও এ সংবাদপত্র দুটি একই ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। এরাই মূলত এক-এগারো এবং ইউনূস সরকারের ধারাবাহিকতার প্রমাণ। এভাবে খতিয়ে দেখলে দেখা যায়, এক-এগারোর অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করাই ছিল ইউনূস সরকারের প্রধান লক্ষ্য। তাই এক-এগারোর অপকর্মের বিচার করলে অবশ্যই ইউনূস সরকারের অপকর্মগুলোও খতিয়ে দেখতে হবে। এক-এগারো কেবল কয়েকজন ব্যক্তির ক্ষমতায় থাকার উচ্চাভিলাষ নয়, এটা বিরাজনীতিকরণের একটি মতবাদ। এ মতবাদের মূল লক্ষ্য দেশের জনগণের অধিকার হরণ করা, দেশের গণতন্ত্র ধ্বংস করা, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করা। এখনই যদি এদের সমূলে নির্মূল করা না যায় তাহলে আবার এরা সংঘবদ্ধ হবে, নতুন করে ষড়যন্ত্র করবে। এরা আসলে রক্তবীজের মতো। এরা সুযোগ পেলেই গণতন্ত্রের ওপর আঘাত হানবে।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন