ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারী, ২০২৬ ১২:০১ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩৮ বার
ঢাকা: সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোতে মূল বেতন দ্বিগুণ বাড়িয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেছে জাতীয় বেতন কমিশন। এই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অর্থের সংস্থান, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং রাজস্ব আয়। এছাড়া বেসরকারি খাতকেও এর প্রভাব সামলাতে হবে। সর্বোপরি এত বিপুল আকারে বেতন বৃদ্ধি হলে সেটা দেশের অর্থনীতিতে নানামুখী চাপ ফেলবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
তারা বলেছেন, পে কমিশনে যে সুপারিশ করা হয়েছে তাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। এ কাঠামো বাস্তবায়ন করতে হলে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। বেসরকারি খাতে একটি ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণসহ ব্যাংকগুলোকে আরেকটু নমনীয় হতে হবে। এজন্য সরকারকে আরও কৌশলী হয়ে সব সেক্টরকে সমন্বিত করে উদ্যোগ নিতে হবে।
অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, বেতন কাঠামোর মূল চ্যালেঞ্জের জায়গাটাই হলো কীভাবে এটা বাস্তবায়ন করবে—যে অর্থটা লাগবে সে অর্থের যোগান কোথা থেকে দেবে। আর এই অর্থের যোগান দিতে গেলেই সরকার নানান ধরনের ভ্যাট-ট্যাক্স আরোপ করবে। রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে, আর রাজস্ব আয় বাড়াতে নানান দিকে চাপ পড়বে। সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে সব জায়গায় চাপ পড়বে।
তারা আরও বলছেন, একটা টাইমলাইন ঠিক করতে হবে যে কখন থেকে বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হবে। এই বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় যাতে সেবা খাতের সুবিধাগুলো জনগণ পেতে পারেন এবং অর্থনৈতিক দক্ষতাও বাড়ে। পাশাপাশি রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অর্থনীতিতে যেন কোনো সমস্যার সৃষ্টি না হয়, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। মোট কথা হচ্ছে সরকারের ঋণের বোঝা না বাড়িয়ে কীভাবে সামাল দেওয়া যায় সেটার দিকেও আমাদের সমান্তরালভাবে নজর দিতে হবে।
গত ২১ জানুয়ারি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে নবম জাতীয় বেতন কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করেন জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে কমিশন।
নতুন বেতন কাঠামোয় সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হচ্ছে ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ। এর ফলে সর্বনিম্ন অর্থাৎ ২০তম ধাপে বেতন ২০ হাজার টাকা আর সর্বোচ্চ প্রথম ধাপে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার সুপারিশ করা হচ্ছে। এর বাইরে এখনকার মতোই অন্যান্য ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা প্রযোজ্য হবে। তাতে ঢাকায় সর্বনিম্ন, অর্থাৎ ২০তম গ্রেডের একজন কর্মীর বেতন দাঁড়াবে প্রায় ৪২ হাজার টাকা। বেতন কমিশন সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০টি স্কেলে বেতন সুপারিশ করে।
সরকারি চাকরিতে বেতন বৃদ্ধির প্রভাব যাবে বেসরকারিতে
এ বিষয়ে গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বাংলানিউজকে বলেন, বেতন কাঠামোটা অনেক দিন পরে করা হলো। দীর্ঘদিন একই জায়গায় বেতন স্কেল রাখাটাও আসলে ঠিক না। সবারই তো ক্রয়ক্ষমতার ব্যাপার আছে। সেটা আমাদেরকে ধারণার মধ্যে নিতে হবে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে বেতন কাঠামোতে যে সুপারিশ করা হয়েছে সেখানে বড় সমস্যা তৈরি হবে—এত টাকার যোগান কোথা থেকে আসবে সেটা সরকারকে চিন্তা করতে হবে।
তার মতে, সরকারের রাজস্বের অবস্থা খুবই নড়বড়ে এবং এর মধ্যে যদি অতিরিক্ত প্রায় এক লাখ কোটি টাকা যোগান দিতে হয়, তাহলে চিন্তা করতে হবে যে এই যোগানকৃত অর্থ যদি আমাদের এই রাজস্ব থেকে দিতে হয়, তাহলে উন্নয়ন বাজেটকে বড় অংশে কাট করতে হবে। তারপরে বাংলাদেশ সরকারের ধারণক্ষমতার কথা চিন্তা করতে হবে—এটা এক নম্বর। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, যদি এই বড় মাত্রার স্কেল খুব তাড়াতাড়ি বাস্তবায়ন করা হয়, আমাদের এখনো মূল্যস্ফীতির চাপ অত্যধিক—এটা মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দেবে, কোনো সন্দেহ নেই। কাজেই পুরোটা একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকার বাজেট থেকে টাকা নিলেও মূল্যস্ফীতির চাপ পড়বে।
তিনি বলেন, পাবলিক সেক্টর-প্রাইভেট সেক্টর আলাদা বলে থাকি। কিন্তু পাবলিক সেক্টরের সঙ্গে প্রাইভেট সেক্টরের যারা কাজ করে তাদেরও কিন্তু একটা মজুরির যোগাযোগ আছে। সুতরাং পাবলিক সেক্টরে যদি মজুরি বাড়ে, প্রাইভেট সেক্টরকে রেসপন্ড করতে হয়। এটা ডাইরেক্টলি বলি আর ইনডাইরেক্টলি বলি—সে সম্পর্কটা থাকে। সেখানে প্রাইভেট সেক্টরের ওপর কিন্তু একটা বড় মাত্রার চাপ আছে।
দেশে এমনিতেই কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আপনি যদি বাংলাদেশে দেখেন—সার্ভেতে বলা হচ্ছে গত এক বছরে আমাদের প্রায় ২০ লাখ কর্মসংস্থান কমেছে। এখানে যদি আবার অতিরিক্ত বাড়তি মজুরির একটা প্রেসার আসে, প্রাইভেট সেক্টরের পক্ষে এটা নেওয়াটা অত্যন্ত দুঃখের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। সব মিলিয়ে আমি বলব যে একটা চ্যালেঞ্জিং সিচুয়েশনে দাঁড়াচ্ছে। আগামীতে যে সরকার ক্ষমতায় আসুক, যে রাজনৈতিক দলের সরকারই ক্ষমতায় আসুক—তাদের জন্য এটা একটা বড় মাত্রার দুশ্চিন্তার কারণ হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার হচ্ছে খুবই দুর্বল সরকার। এই মুহূর্তে সরকারের উচিত ছিল না এই কমিশন তৈরি করা। মূলত আমলাদের চাপে এই সরকার এই কাজটা করছে। যেহেতু দুর্বল সরকার ছিল, সবাই সরকারকে চাপ দিয়েছে, চেষ্টা করেছে। আর এই সরকার কী করছে? তারা কাগজ তৈরি করছে। এগুলো তো উনারা বাস্তবায়ন করবেন না। ওনারা এটার দায়টা পরের সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বাংলানিউজকে বলেন, এই পে কমিশন সুপারিশটা দিয়েছেন, সেটার মধ্যে যৌক্তিকতা আছে। এই কারণে যে গত পে কমিশন যখন বাস্তবায়িত হয়েছে, তার পর থেকে বেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছে বাংলাদেশে। সেটাকে বিবেচনায় রেখে তারা যে প্রস্তাবটা করেছে সেটা আগের থেকে দ্বিগুণের মতো। এটা ঠিক যে আমাদের যারা সরকারি কর্মচারী, তাদের একটা শোভন জীবনধারণ করার মতো এটা প্রয়োজনও ছিল। যাতে তারা অন্য কোনো দিকে মনোযোগ না দিয়ে তাদের কাজে মনোযোগী হতে পারেন এবং একটা ভালো জীবনধারণ করতে পারেন। সুতরাং সেখানে তাদের জন্য যে প্রস্তাব করা হয়েছে সেটা অযৌক্তিক কিছু না। কিন্তু এটার সঙ্গে আরও কয়েকটি বিষয় দেখতে হবে।
‘এক নম্বর হলো: সরকার আগামী বাজেট থেকে কতটুকু নিতে পারবে এবং কীভাবে, কোন টাইমলাইনে এটাকে বাস্তবায়ন করা হবে—সেটা আগামী সরকারকে বিবেচনায় রাখতে হবে। এটা নিশ্চয়ই একবারে করা যাবে না। সরকারের যে রাজস্ব আয়, সেটা থেকে একবারে করা সম্ভব হবে না। দুই নম্বর হলো: সরকারি কর্মচারীদের যখন বেতন বৃদ্ধি করা হয়, তার সঙ্গে সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক যে দায়বদ্ধতা, তাদের যে জবাবদিহিতা—সেগুলো যাতে নিশ্চিত করা হয়। সেটাও কিন্তু একটা প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের নিয়োগ, পদায়ন এবং তাদের দক্ষতার ভিত্তিতে তাদের যে প্রমোশন—সেগুলো নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে একটা জবাবদিহিতা থাকতে হবে এবং যেখানে জনগণ তাদের কাছ থেকে পরিসেবা চান—সেটা শিক্ষা হোক, স্বাস্থ্য হোক, সামাজিক সুরক্ষা হোক—সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।’
‘তৃতীয় হচ্ছে, রাজস্ব খাতে একটা চাপ তৈরি হবে। এ কারণে ব্যয়ের একটা চাপ সৃষ্টি হবে—সেটা সরকারি কর্মচারীদের পারফরম্যান্স থেকেই ব্যয়টা উঠে আসতে হবে। যেমন এখানে তো রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা–কর্মচারীরাও রয়েছেন। রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। তারপরে সরকারি বিভিন্ন যেসব সেবা ব্যবসায়ীদের দেওয়া হয়, সেখানে তারা কস্ট অব ডুইং বিজনেস যদি কমাতে পারেন, তখন কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যও ভালো হবে, বিনিয়োগও ভালো হবে। সেখান থেকে সরকার রাজস্ব আদায় বেশি করতে পারবেন’, যোগ করেন মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে যে লিকেজ আছে, দুর্নীতি আছে—সেগুলো কিন্তু কমিয়ে নিয়ে এসে এবং নির্মূল করে এই টাকাটা নিতে হবে। সুতরাং এই যে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ওপরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে, সেটা আমাদের রাজস্ব আয় একই রকম রাখলে সরকারের পক্ষে তা দেওয়া সম্ভব হবে না। তাহলে অন্যান্য খাত থেকে কাটতে হবে।
ব্যবসা-বিনিয়োগ বাড়ালে অতিরিক্ত অর্থ আদায় সম্ভব
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ (বিআইএসএস)-এর গবেষণা পরিচালক এবং অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বাংলানিউজকে বলেন, আসলে এই পে কমিশনটা আরও আগেই গঠন করা উচিত ছিল। যখন ২০১৫ সালে পে কমিশন গঠন করা হলো, তাদের প্রতিবেদনে যেটা বলা হয়েছিল—প্রতিবছর একটা সমন্বয় করা হবে, কিন্তু আসলে সেই সমন্বয় সেভাবে হয়নি, যার ফলে মূল্যস্ফীতি যতটুকু বেড়েছে, সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের কিন্তু সেভাবে আয় বাড়েনি। যার ফলে প্রকৃত আয়টা অনেকটাই কমে গেছে। এখন এই অবস্থায় নতুন বেতন কাঠামো গঠন করা ছাড়া কোনো গতি ছিল না।
তিনি বলেন, পে কমিশনের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে দ্বিগুণ বা তার বেশি বেতন-ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সে কারণে বিভিন্ন রকমের চাপ পড়বে অর্থনীতিতে। এই এত অর্থের সংস্থান হবে কিভাবে—সেটা বড় প্রশ্ন। তার কারণ এই মুহূর্তে যে ব্যবসা-বাণিজ্য, তার যে গতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি—সেটা কিন্তু একেবারে নিম্ন পর্যায়ে চলে এসেছে। ৩ দশমিক ৯ শতাংশ মাত্র জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে গত অর্থবছরে। এই অবস্থায় আসলে রাজস্ব আয়ের টার্গেট পূরণ করতে পারছে না এনবিআর।
এখন এই অতিরিক্ত অর্থটা কোথা থেকে আসবে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বাড়ানো, বিনিয়োগ বাড়িয়ে যদি অর্থনীতির গতি বাড়ানো যায়, তাহলে সেক্ষেত্রে তখন কিন্তু অতিরিক্ত এই অর্থ আদায় করা সম্ভব হবে। তবে এত বিপুল পরিমাণে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। ঘাটতি রয়ে গেছে। তো তার মধ্যে যদি আমরা রাজস্ব আদায়টা বাড়াতে পারি, তাহলে সেক্ষেত্রে যে অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হবে, সেটা কিছুটা হয়তো আমরা সেখান থেকে নিয়ে আসতে পারব।
ড. মাহফুজ কবির বলেন, সুপারিশ করা বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে হলে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে, ব্যাংকিং বা নন-ব্যাংক খাত থেকে হয়তো ঋণ নিতে হবে, সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়াতে হবে আর বিদেশি ঋণও হয়তো নিতে হতে পারে সরকারকে। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, এর একটা সামাজিক প্রভাব আছে, যেমন বেসরকারি খাতের বেতনও বাড়াতে না পারলে তখন কী হবে? তখন সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটা সফট লোনের ফান্ড তৈরি করতে পারে। সেটা করতে পারলে সমতা তৈরি হবে। না হলে আবার বৈষম্যের সৃষ্টি হবে।
তিনি বলেন, অনেকেই বলছেন মূল্যস্ফীতি আরও এক দফা বেড়ে যেতে পারে। তবে আমরা তো একটা উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে আছি এখন। এই অবস্থায় মূল্যস্ফীতি একটা অজুহাত হিসেবে হয়তো আনাটা ঠিক হবে না। তার কারণ আমাদের তো যে একটা পলিসি চলছে—অনেক দিন ধরে, প্রায় আড়াই-তিন বছরের মতো—আমরা কিন্তু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করছি। এটা করে কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। মূল্যস্ফীতি কিন্তু কমে যায়নি। বরং আমরা ডিসেম্বরে এসে দেখতে পেলাম যে মূল্যস্ফীতি আরও একবার বেড়ে গেছে। এজন্য আমাদের সংকোচনমূলক ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। প্রাইভেট সেক্টরে ঋণ সরবরাহ করতে হবে, সুদের হার কমাতে হবে। এভাবে যদি আমরা অর্থনীতিকে চালিয়ে নিয়ে আসতে পারি, তাহলে মূল্যস্ফীতি হয়তো বড় কোনো সমস্যা হবে না।
‘মানুষের জীবনযাত্রার যে অবস্থা, তাতে ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে, বেকারত্ব বেড়ে গেছে। এখন বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে হবে, মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে। এজন্য ঋণের সরবরাহ বাড়াতে হবে, সুদের হার কমাতে হবে। সেরকম একটা নীতি যদি আগামী সরকার গ্রহণ করে, তাহলে সে ক্ষেত্রে অর্থনীতির পথচলা কিন্তু মসৃণ হবে। তখন কিন্তু আর এই যে অতিরিক্ত যেমন কর দিতে হয়—তেমন কোনো সমস্যা হবে না। এই ক্ষেত্রে একটা ফান্ড দরকার। বর্তমান অর্থনীতিতে সেই ফান্ডটা কি সরকার দিতে পারবে?’
অর্থনীতিবিদ মাহফুজ কবির আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার সে কাজটা করবে না। কারণ তাদের হাতে আসলে তিন সপ্তাহ সময় নেই। তবে সরকার কিছু নীতিগত হয়তো নির্দেশনা দিয়ে দিতে পারে। কিন্তু পুরো বাস্তবায়ন করতে হবে রাজনৈতিক সরকারকে। সুতরাং তাদের কৌশলী হতে হবে। তাদের যে নির্বাচনী ইশতেহার, সেখানে পরিষ্কার করে বলতে হবে যে তারা কীভাবে এটাকে বাস্তবায়ন করবে।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে গেলে বেসরকারি খাতে যারা আছেন, তাদের মনে প্রভাব ফেলবে জানিয়ে তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে কর্মকর্তা–কর্মচারীদের ওপর যেন এটা বৈষম্য সৃষ্টি না করে, তাদের যেন বেতন বাড়াতে পারে, মজুরি বাড়াতে পারে—সেটার জন্য ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে যেন মূল্যস্ফীতির চাপ নতুন করে তৈরি না হয়, সেটার জন্য আমাদের যে মুদ্রানীতি আছে, সেটার প্রয়োজনীয় সংশোধনী নিয়ে আসতে হবে। সেটাকে নমনীয় করতে হবে। এইভাবে করে কিন্তু আমরা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারি। এটাও সত্য যে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। মানুষের তো আয় বৃদ্ধি দরকার। এই কারণেই পে কমিশন বাস্তবসম্মতভাবে সমাজের সবার সহযোগিতা নিয়ে কিভাবে বাস্তবায়ন করা যায়—সেই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
‘এছাড়া আমাদের যারা দৈনিক মজুরির ওপর নির্ভরশীল—যে সমস্ত মানুষ রিকশাসহ বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে—তাদের ক্ষেত্রে সরকারের একটা উপায় রয়েছে। সেটা হলো প্রত্যেকটা খাতের জন্যই কিন্তু ন্যূনতম মজুরি। অর্থাৎ ন্যূনতম একটা মজুরি নির্ধারণ করে দিতে হবে। এভাবে যদি মজুরি সমন্বয়টা করা যায়, তাহলে বৈষম্য হয়তো কিছুটা কমতে পারে।’
বিআইএসএসর গবেষণা পরিচালক বলেন, মোট কথা বেসরকারি খাতের জন্য ন্যূনতম একটা মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। আর নির্বাচনের পরে যে সরকার গঠিত হবে, তাদের একটা ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। অন্তত ১০০ দিনের মধ্যে তারা যেন খুব দৃশ্যমান অগ্রগতি করেন এই ক্ষেত্রে—তাহলে দেখা যাবে এই সমস্যাগুলো থাকবে না। কারণ বেসরকারি খাতে যেসব মানুষ রয়েছেন, তাদেরও যাতে বেতন-মজুরি বাড়তে পারে—সেজন্য তাদের কর্তব্য গ্রহণ করতে হবে।
এত দ্রুত আসলে অর্থনীতির যে চাকা, সেটা ঘোরানো সম্ভব নয় জানিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনের পর নতুন সরকার এলেও কিন্তু সেটা আসলে সেভাবে করতে পারবে না। আর এই অন্তর্বর্তী সরকার আসলে একটা কমিশনের প্রতিবেদন দিয়ে গেছে, কিন্তু সেটার বাস্তবায়ন তো করবে রাজনৈতিক সরকার। সুতরাং তাদের ওপর একটা বড় মানসিক চাপ ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে। আর এখান থেকে পিছু আসারও তেমন একটা সুযোগ নেই। তার কারণ এই এত সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারী—তাদের মধ্যে যদি আবার অসন্তোষ তৈরি হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে কিন্তু এই নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়ে তাদের পথচলা মুশকিল হবে। সুতরাং এটা বাস্তবায়ন করতে হবে, এজন্য অর্থের সংস্থান কিভাবে হবে—সেটা সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
জানা গেছে, দেশে সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীর সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। সে হিসেবে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত এক লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই থেকে পুরো মাত্রায় কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ লক্ষ্যে ২০২৫–২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে পে-স্কেলের জন্য পরিচালন ব্যয় ২২ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো আংশিকভাবে কার্যকর করার অংশ হিসেবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সুপারিশ অনুসারে বেতন কোন ধাপে কত বাড়বে
কমিশনের প্রতিবেদনে সর্বোচ্চ ধাপে বেতনকাঠামো নির্ধারিত ৭৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে বর্তমানে মূল বেতন ৬৬ হাজার টাকা। এটি বাড়িয়ে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা সুপারিশ করা হয়েছে। এভাবে তৃতীয় ধাপে ৫৫ হাজার ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ১৩ হাজার, চতুর্থ ধাপে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ, পঞ্চম ধাপে ৪৩ হাজার থেকে ৮৬ হাজার, ষষ্ঠ ধাপে ৩৫ হাজার ৫০০ থেকে ৭১ হাজার, সপ্তম ধাপে ২৯ হাজার থেকে ৫৮ হাজার, অষ্টম ধাপে ২৩ হাজার থেকে ৪৭ হাজার ২০০, নবম ধাপে ২২ হাজার থেকে ৪৫ হাজার ১০০, দশম ধাপে ১৬ হাজার থেকে ৩২ হাজার, ১১তম ধাপে ১২ হাজার ৫০০ থেকে ২৫ হাজার, ১২তম ধাপে ১১ হাজার ৩০০ থেকে ২৪ হাজার ৩০০, ১৩তম ধাপে ১১ হাজার থেকে ২৪ হাজার, ১৪তম ধাপে ১০ হাজার ২০০ থেকে ২৩ হাজার ৫০০, ১৫তম ধাপে ৯ হাজার ৭০০ থেকে ২২ হাজার ৮০০, ১৬তম ধাপে ৯ হাজার ৩০০ থেকে ২১ হাজার ৯০০, ১৭তম ধাপে ৯ হাজার থেকে ২১ হাজার ১০০, ১৮তম ধাপে ৮ হাজার ৮০০ থেকে ২১ হাজার, ১৯তম ধাপে ৮ হাজার ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার ৫০০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন নতুন প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে—সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা প্রবর্তন, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন, সার্ভিস কমিশন গঠন, বেতন গ্রেড ও স্কেলের যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস, সরকারি দপ্তরসমূহে ভাতাসমূহ পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে মানবসম্পদ উন্নয়ন।
সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের জন্য বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হচ্ছে। এত দিন ১১তম থেকে ২০তম ধাপের কর্মচারীদের জন্য যাতায়াত ভাতা ছিল। এ যাতায়াত ভাতা নতুন বেতন কমিশন ১০ম ধাপ থেকে ২০তম পর্যন্ত দেওয়ার সুপারিশ করেছে।
কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের পাশাপাশি পেনশনভোগীদের পেনশনের হারও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ছে। মাসে ২০ হাজার টাকার কম পান—এমন পেনশনভোগীদের পেনশন বাড়ছে ১০০ শতাংশের মতো। যারা মাসে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার পেনশন পান, তাদের বাড়ছে ৭৫ শতাংশ। আর যারা মাসে ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশন পান, তাদের বাড়ছে ৫৫ শতাংশ।
৭৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনধারীদের চিকিৎসা ভাতা ১০ হাজার টাকা দেওয়ার সুপারিশ করা হচ্ছে। এমনিতে বয়সভেদে আট হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা। ৫৫ বছরের কম বয়সীদের চিকিৎসা ভাতা দেওয়ার সুপারিশ করা হচ্ছে পাঁচ হাজার টাকা।
এছাড়া প্রথম থেকে দশম ধাপ পর্যন্ত সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়িভাড়া তুলনামূলক কম হারে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ১১তম থেকে ২০তম ধাপে বাড়িভাড়ার হার তুলনামূলক বেশি থাকবে।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রতিবেদন দাখিলের পর সামরিক ও বিচার বিভাগের জন্য আলাদা বেতন কমিশন চূড়ান্ত করা হবে।