আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:২৭ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ১১ বার
ইউক্রেনের একাধিক শহরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। বৃহস্পতিবার দিনিপ্রোর ব্যস্ত রেলস্টেশনে হামলায় ১৪ জনসহ দেশজুড়ে অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন।
হামলায় আহত হয়েছেন আরও অনেকে। আবাসিক ভবন, রেলস্টেশন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে দেশটিতে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দিনিপ্রো, চেরনিহিভ, ক্রেমেনচুক ও রাজধানী কিয়েভে এসব হামলা চালানো হয়। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসন অঞ্চলে ছয় দিনের স্থানীয় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে।
এতে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা তৈরি হলেও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে রুশ হামলা অব্যাহত রয়েছে।
ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী সেরহি কোরেৎস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, রাশিয়া পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক মানুষকে হত্যা করছে।
ট্রেন, রেলস্টেশন ও আবাসিক ভবনে হামলা চালানো হচ্ছে। এসব হামলার কোনো যুক্তি নেই, এমন কর্মকাণ্ডের পক্ষে কোনো ব্যাখ্যাও থাকতে পারে না।
কিয়েভের সামরিক প্রশাসন জানায়, বৃহস্পতিবার রাত ১১টার কিছু আগে রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। এতে একজন নিহত হন। হামলায় কয়েকটি গুদামে আগুন ধরে যায়। এ ছাড়া দিনিপ্রো নদীর পূর্ব তীরে একটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এর কয়েক ঘণ্টা আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার হামলাকে অত্যন্ত নিষ্ঠুর বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সবাই যখন উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগের অপেক্ষায়, তখনই রাশিয়া নতুন করে হামলা চালাচ্ছে। এটি ইচ্ছাকৃত।
জেলেনস্কি আরও বলেন, রাশিয়া নতুন করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে ইউক্রেনের গোয়েন্দারা তথ্য পেয়েছেন। রাশিয়ার হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করতে ইউক্রেনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। এ বিষয়ে তিনি মিত্র দেশগুলোর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন।
খেরসনে ছয় দিনের যুদ্ধবিরতি
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় দক্ষিণ ইউক্রেনের খেরসন অঞ্চলে ছয় দিনের স্থানীয় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। তবে এই যুদ্ধবিরতি শুধু ওই অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য। রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা ওলেশকি শহরে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলা শুরুর পর থেকে শহরটি যুদ্ধের মধ্যে আটকে রয়েছে।
ইউক্রেন ও রাশিয়া-উভয় পক্ষই জানিয়েছে, ওই এলাকায় মাইন অপসারণের কাজ শেষ হয়েছে। ফলে এখন শহরটিতে ত্রাণ পাঠানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি যেসব বাসিন্দা শহর ছেড়ে যেতে চান, তাদের নিরাপদে বের হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
তবে খেরসনে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইউক্রেনের অন্য এলাকাগুলোতে রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে রেলপথসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশটির অর্থনীতি। ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ক্ষেপণাস্ত্রের তীব্র সংকট রয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাশিয়া হামলা বাড়াচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
রেলস্টেশনে ভয়াবহ হামলা
দিনিপ্রো শহরের প্রধান রেলস্টেশনে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন ছাড়ার প্রস্তুতি চলছিল। ঠিক সেই সময় জেট ইঞ্জিনচালিত একটি ড্রোন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে আঘাত হানে। ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় রেল সংস্থা উক্রজালিজনিতসিয়া এ তথ্য জানিয়েছে।
হামলার পর প্ল্যাটফর্মজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে মরদেহ ও বিস্ফোরণের ধাতব টুকরা। মেঝেতে জমে যায় রক্ত। তখনো বাজছিল বিমান হামলার সতর্কসংকেত। এর মধ্যেই পুলিশ কালো ব্যাগে করে মরদেহ সরিয়ে নিচ্ছিল।
স্টেশনের ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন ৬৭ বছর বয়সী স্বিতলানা শেরবাক। হামলার পর তিনি বলেন, ‘আর এসব কেন? তারা আসলে কী অর্জন করতে চাইছে? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’
দিনিপ্রো শহরের আরেকটি হামলায় শিক্ষার্থীদের আবাসিক ভবনে আগুন ধরে যায়। আঞ্চলিক গভর্নর ওলেক্সান্দর হানঝা এ তথ্য জানান। তিনি আরও বলেন, বৃহস্পতিবারের হামলায় শহরটির প্রায় তিন লাখ ৫০ হাজার পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে।
ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে রাশিয়ার হামলায় নিয়মিত বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছেন। তবে মস্কো বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
চেরনিহিভ ও ক্রেমেনচুকেও প্রাণহানি
উত্তর ইউক্রেনের চেরনিহিভ শহরের একটি ব্যস্ত সড়কে ড্রোন হামলায় দুই কিশোরী নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ২৩ জন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে চারটি শিশু রয়েছে।
শহরটির সামরিক প্রশাসনের প্রধান দিমিত্রো ব্রিঝিনস্কি বলেন, হামলার শিকার ব্যক্তিরা সবাই সাধারণ মানুষ ছিলেন। তারা প্রতিদিনের মতো কাজে যাচ্ছিলেন এবং নিজেদের দৈনন্দিন কাজ করছিলেন।
মধ্য ইউক্রেনের ক্রেমেনচুক শহরে আবাসিক ভবনে রাশিয়ার হামলায় নিহত হয়েছেন তিনজন। আহত হয়েছেন আরও ৩২ জন। আঞ্চলিক গভর্নর এ তথ্য জানিয়েছেন। হামলায় কয়েকটি ব্যক্তিগত ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া শহরে তিনটি পৃথক ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এসব হামলায় শহরের কয়েকটি বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আহত হয়েছেন ছয়জন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা।
শান্তি আলোচনার উদ্যোগের মধ্যেই হামলা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরুর চেষ্টা চলছে। এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে হামলা চালাল রাশিয়া।
আগামী মাসে ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আবারও ত্রিপক্ষীয় আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়াতে ইউক্রেনের মিত্র দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির শীর্ষ উপদেষ্টা কিরিলো বুদানভসহ দেশটির কর্মকর্তারা। তাদের মতে, রাশিয়ার হামলা বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স।