ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭:৩৫ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৯ বার
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি ফ্ল্যাটে গোপনে চলছিল ভেজাল ও অনুমোদনহীন ওষুধ তৈরির কারবার। সেখানে তৈরি ও বাজারজাতের জন্য রাখা হয়েছিল শিশুদের সিরাপ থেকে শুরু করে ক্যাপসুল, শ্যাম্পু, ফেসওয়াশ, হাইজিন ওয়াশ ও ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য।
অভিযানে প্রায় এক কোটি টাকার ওষুধ ও তৈরির সরঞ্জাম জব্দের পাশাপাশি চক্রটির তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
একইসঙ্গে এসব অনুমোদনহীন ওষুধ রোগীদের প্রেসক্রাইব করা চিকিৎসকদেরও খুঁজছে ডিবি।
তদন্তে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের নাম পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন– আব্দুল্লা আল-মামুন (৪২), মো. সাজু (৩৩) ও মো. সজীব (২৬)।
বুধবার (৭ অক্টোবর) ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মোহাম্মদপুর থানাধীন ঢাকা উদ্যান রোডের ব্লক-সি এলাকার একটি ভবনের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়।
সেখান থেকেই ওই তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অভিযানে বিভিন্ন ধরনের সিরাপ, ক্যাপসুল, শ্যাম্পু, ফেসওয়াশ, হাইজিন ওয়াশ, সাবান, পাউডার ও ট্যাবলেটসহ বিপুল পরিমাণ ভেজাল ওষুধ উদ্ধার করা হয়।
জব্দ করা সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে– ১৯২টি KIDZ Omega Liquid 100ml সিরাপ, ১০০ বক্স LACTOFLEX Capsules, ৩০টি Facy GLOW Face Wash, ১৫০টি Detox Plus Shampoo, ৭০টি Pedia Vox Kid Syrup, ৩০০ পাতা Osearc-CD ক্যাপসুল, ৫ কেজি Oriva Hapes সাদা পাউডার, ৫০টি BIOKET Active Shampoo, ৮০০টি KIDICARE Syrup Plus 100ml, ৭০টি ZERO DAN Shampoo, ৪০টি KETCOR-Z Shampoo ও ১০টি Nutramide Syrup।
এছাড়া ১৫০টি INTA CLEAN HYGIENE WASH-এর খালি মোড়ক, মোড়কবিহীন ৮০ বোতল Hygiene Wash, ৩০০টি PERMIMITE Soap-এর খালি মোড়ক, ৮০টি Spiruva (Spirulina) লিফলেট, ১০০টি ফেসওয়াশের পলিথিন, ৩০০টি লেবেলবিহীন সিরাপের বোতল, ৪০০টি সাদা প্লাস্টিকের কৌটা, ১০০টি লেবেলবিহীন সাদা ট্যাবলেট এবং ৫০০টি সবুজ রঙের খালি ক্যাপসুল সেল উদ্ধার করা হয়েছে।
ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত তিনটি সিলিন্ডার, একটি ফুয়েল লাগানোর মেশিন, দুটি ক্যাপসুল ভরার মেশিন, ১০ কেজি ফুয়েল (পলিথিন), ছয়টি ক্যাপসুল ভরার যন্ত্রাংশ এবং দুটি লেভেল লাগানোর সাঁচও জব্দ করা হয়েছে।
ডিবিপ্রধান বলেন, উদ্ধার করা সামগ্রীর মধ্যে শিশুদের ব্যবহারের কয়েকটি সিরাপ ও লিকুইড পণ্য রয়েছে। ভেজাল ও অনুমোদনহীন এসব ওষুধ শিশুদের জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
ভেজাল ওষুধ ক্রয়-বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে নিজেদের হেফাজতে রাখার অভিযোগে গ্রেপ্তার তিনজনের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হয়েছে।
ভেজাল ওষুধ সাধারণ মানুষ কীভাবে শনাক্ত করবে– এমন প্রশ্নের জবাবে মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ভেজাল ওষুধ চেনা অত্যন্ত কঠিন। তবে ওষুধের মোড়ক ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির প্যাকেজিং ভালোভাবে দেখলে অনেক ক্ষেত্রে ভেজাল ওষুধ শনাক্ত করা সম্ভব।
তিনি বলেন, অভিযানে এমন কিছু ওষুধ পাওয়া গেছে, যেগুলো দেশে প্রচলিত নয় এবং প্রতিবেশী দেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এসব ওষুধ নির্দিষ্ট কিছু চিকিৎসকের মাধ্যমে রোগীদের প্রেসক্রাইব করানো হতো বলেও জানান তিনি।

অভিযানে প্রায় এক কোটি টাকার ওষুধ জব্দ করা হয়েছে উল্লেখ করে চক্রটি এ পর্যন্ত বাজারে কত টাকার ওষুধ সরবরাহ করেছে জানতে চাইলে ডিবিপ্রধান বলেন, এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। অভিযানে পাওয়া কাগজপত্র পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে এর সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, জব্দ করা ওষুধের একটি দীর্ঘ তালিকা রয়েছে। এর মধ্যে বিদেশি ওষুধও রয়েছে, যেগুলো দেশে বৈধভাবে আমদানি করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
অভিযানে শিশুদের ব্যবহারের কিছু ওষুধও পাওয়া গেছে বলে জানান ডিবিপ্রধান। এর মধ্যে কিডোকেয়ার নামে একটি সিরাপকে নকল হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। এছাড়া শিশুদের জন্য ব্যবহৃত কিড ওমেগা এবং ভিটামিন ডি৩ সংক্রান্ত কিছু ওষুধও জব্দ করা হয়েছে।
অনুমোদনহীন ওষুধ চিকিৎসকদের মাধ্যমে প্রেসক্রাইব করা হতো এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবিপ্রধান বলেন, কোনো চিকিৎসকই ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অনুমোদনহীন ওষুধ প্রেসক্রাইব করতে পারেন না। তদন্তে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের নাম পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, মামলার পর তদন্ত শুরু হয়েছে। চক্রটি কার কাছে ওষুধ বিক্রি করেছে, কোথায় কোথায় সরবরাহ করেছে এবং কোনো ডিসপেনসারি বা বিক্রয়কেন্দ্রে এসব ওষুধ রয়েছে কি না, এসব বিষয় তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে।
চক্রটি কতদিন ধরে এ ব্যবসা করছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন মাস ধরে এ ব্যবসা পরিচালনার কথা জানিয়েছে। যে বাসাটি ব্যবহার করে কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল, সেটিও প্রায় তিন মাস আগে ভাড়া নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
চক্রটির নেটওয়ার্ক সারা দেশে রয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী তাদের কার্যক্রম ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে জানা গেছে। তবে তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তাদের নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।
ডিবি ওয়ারী বিভাগ জানিয়েছে, রাজধানীতে ভেজাল ও অনুমোদনহীন ওষুধের কারবারের সঙ্গে জড়িতদের তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি এসব ওষুধ প্রেসক্রাইব করার সঙ্গে কোনো চিকিৎসক জড়িত থাকলে তদন্তে তাদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।