ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৯ অগাস্ট, ২০২৬ ১০:০৩ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৪ বার
রাজধানীর দ্রুতগামী বৈদ্যুতিক গণপরিবহন মেট্রোরেল। অফিসগামী যাত্রীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের যাতায়াতের জন্য এটি এখন অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যের মাধ্যম।
কিন্তু এই নিরাপদ বাহনটিকেই যেন মাদক কারবারিরা তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নতুন রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে। সাম্প্রতিক কিছু মাদক জব্দ ও অপরাধী ধরা পড়ার ঘটনায় এই বিষয়টিই সামনে আসছে।
যাত্রীদের কারও কারও মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে এবং তল্লাশির ঝুঁকি কম থাকায় কারবারিরা এখন মেট্রোরেলকে বেছে নিচ্ছে।
সাধারণত মেট্রোরেল শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চলাচল করে।
শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত এ সেবা চালু থাকে। উত্তরা উত্তর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৬-এর প্রায় ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে ৩৮ থেকে ৪০ মিনিট।
প্রতিটি স্টেশনে এমআরটি পুলিশ এবং আনসার সদস্যরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি ক্যামেরা ও কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করেন। তবে অতিরিক্ত যাত্রীচাপের কারণে প্রতিটি যাত্রীকে আলাদাভাবে তল্লাশি করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। অপরাধীরা এই সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সাম্প্রতিক অভিযান ও গ্রেপ্তার
সোমবার (১৭ আগস্ট) সকালে মিরপুর-১০ মেট্রো স্টেশনে এমআরটি পুলিশের সহায়তায় অভিযান চালিয়ে ১ হাজার ৭০২ পিস ইয়াবাসহ জামাল মোল্যা (৪৩) নামের এক মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে মিরপুর মডেল থানা পুলিশ।
ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বাসিন্দা জামালকে স্টেশনের গেট থেকে আটক করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে ইয়াবা ছাড়াও একটি মোবাইল ফোন ও নগদ ১ হাজার ৪০০ টাকা উদ্ধার করা হয়।
মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুর রহমান জানান, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এর আগে ৩১ জুলাই রাত ৮টার দিকে কারওয়ান বাজার মেট্রোরেল স্টেশনে দুই ব্যক্তিকে সন্দেহজনক অবস্থায় দেখে আনসার সদস্যরা। ধাওয়া করে একজনকে আটক করা হয় এবং তল্লাশি চালিয়ে তার কাছ থেকে সাত পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। পরে তাকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এছাড়া গত বছরের ২৪ নভেম্বর শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল স্টেশন থেকে ৮ কেজি গাঁজাসহ মাহাবুবুর হাওলাদার (৫০) ও তার মেয়ে সুমিকে (৩০) আটক করে এমআরটি পুলিশ।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, শেওড়াপাড়া থেকে উঠে মতিঝিল স্টেশনে নেমে গন্তব্যে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের। পরে তাদের কাফরুল থানায় হস্তান্তর করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করা হয়।

মেট্রোরেলের নিয়মিত যাত্রী জাহাঙ্গীর আলম , আমার বাড়ি উত্তরা এলাকায়। মেট্রোরেলে উত্তরা থেকে প্রতিদিন অফিসে যাতায়াত করি। গণপরিবহনটিতে আমার মতো অনেকেই নিয়মিত যাতায়াত করে থাকেন। তবে এর মধ্যে কোন মানুষের মনে কী আছে বলা মুশকিল।
তিনি বলেন, মেট্রোরেলে যাত্রীচাপ থাকায় এমআরটির পক্ষে প্রত্যেক যাত্রীকে তল্লাশি করা কঠিন কাজ। এজন্য মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ আধুনিক আর্চওয়ে বা মেটাল ডিটেক্টর ব্যবহার করে যাত্রীদের দ্রুত তল্লাশির কাজটি করতে পারে। এতে মেট্রোরেল এলাকা যেমন নিরাপদ থাকবে ঠিক সাধারণ যাত্রীদের তল্লাশির নামে ভোগান্তি পোহাতে হবে না।
তিনি আরও বলেন, মেট্রোরেলের নিরাপত্তায় মাঝে মধ্যে তল্লাশি চালিয়ে স্টেশনে যাত্রীদের কাছ থেকে গ্যাস লাইটার জব্দ করা, পানির বোতল রেখে দেওয়ার মতো ঘটনা দেখা গেছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ডিআইজি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টির ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অপরাধীদের শনাক্ত ও তাদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে।
মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের দাবি, স্টেশনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং এমআরটি পুলিশ ও আনসার সদস্যরা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। তবে যাত্রী নিরাপত্তার পাশাপাশি মাদক নির্মূলে গোয়েন্দা তৎপরতা ও তল্লাশি কার্যক্রম আরও বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এমআরটি পুলিশের পরিদর্শক (অপারেশন) মোহাম্মদ মহসিন বলেন, গত আগস্ট থেকে মেট্রো স্টেশনে সন্দেহভাজনদের পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীদের ওপর নজরদারি ও তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। নিয়মিত সন্দেহভাজনদের তল্লাশির অংশ হিসেবেই ইয়াবার চালানটি জব্দ করা সম্ভব হয়। আটক ব্যক্তির কাছ থেকে ইয়াবার পাশাপাশি ১,৪০০ টাকা এবং একটি চাইনিজ স্মার্টফোন ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জামালকে আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ পরিচালনা করেছে।
মেট্রোরেলে মাদকের চালান পারাপার প্রতিরোধ এবং সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারে ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
এমআরটি পুলিশের কর্মকর্তা মহসিন আরও বলেন, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রতিটি স্টেশনে আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম স্থাপনের উদ্যোগ হবে।
যাত্রীর দেহসহ ব্যাগ ও লাগেজ তল্লাশির জন্য স্টেশনে গেট স্ক্যানার, লাগেজ স্ক্যানার ও আর্চওয়ে মেটাল ডিটেক্টর থাকলে এ ধরনের অপরাধ রোধ করা হবে।
এসব আধুনিক যন্ত্রপাতি কার্যকর হলে প্রতিটি যাত্রীর মালামাল ও দেহ আরও নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে, যা মেট্রোরেলে মাদকসহ যাবতীয় অবৈধ বস্তু পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ করতে সহায়তা করবে।