ঢাকা, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক ভাষণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক


প্রকাশ: ২৬ জুলাই, ২০২৬ ০৯:৩৪ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৭ বার


ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক ভাষণ

হোয়াইট হাউস সংবাদদাতা সমিতির বার্ষিক নৈশভোজের পুন-আয়োজিত অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিক ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে একের পর এক তীব্র ব্যক্তিগত আক্রমণ ও বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করেন। প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা তার ভাষণের বেশিরভাগ অংশেই উপস্থিত সাংবাদিক ও অতিথিদের মধ্যে করতালির বদলে নেমে আসে বিস্মিত নীরবতা।

 

শুরুতে হোয়াইট হাউস সংবাদদাতাদের প্রথম নৈশভোজে এক বন্দুকধারীর হামলার চেষ্টায় অনুষ্ঠানটি ভণ্ডুল হয়ে যায়। সেই ঘটনার পর গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) পুনরায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ট্রাম্প সাংবাদিকদের সামনে উপস্থিত হলেও প্রশাসনের তথ্য ফাঁসকারীদের খুঁজে বের করতে সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করার পক্ষে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।

 

দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, অনুষ্ঠানে মঞ্চের সামনে বসেছিলেন সেই সাংবাদিকরাই, যারা দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্প প্রশাসনকে কঠোরভাবে কভার করে আসছেন। সাধারণত ট্রাম্প এমন শ্রোতাদের সামনে বক্তব্য দেন না, যারা তার সমর্থক নন।

ফলে উপস্থিত সাংবাদিকরা পেশাগত নিরপেক্ষতা বজায় রেখে প্রায় পুরো সময়ই নিরাবেগ মুখে তার বক্তব্য শোনেন।

 

শুরুতে হাসি, পরে তীব্র আক্রমণ
ভাষণের শুরুতে ট্রাম্প কয়েকটি হালকা রসিকতা করেন, যা উপস্থিতদের মধ্যে কিছুটা হাসির সৃষ্টি করে।

তবে খুব দ্রুতই ভাষণের সুর বদলে যায়। এরপর তিনি একের পর এক সাংবাদিক, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও বিভিন্ন পরিচিত ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে কটাক্ষ শুরু করেন। এমনকি তার নির্বাচনী সমাবেশগুলোর তুলনায়ও এদিনের বক্তব্য ছিল আরও বেশি তিক্ত।

 

তিনি দাবি করেন, একসময় সিএনএনের সাংবাদিক ক্যাটলান কলিন্সকে, ট্রান্সজেন্ডার সোশ্যাল মিডিয়া তারকা ডিলান মুলভেনির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছিলেন। কলিন্সকে তিনি “তরুণ ও আকর্ষণীয় নারী” বলে উল্লেখ করেন এবং পরে সেটি নিয়েও কৌতুক করেন। এরপর ট্রাম্প বলেন, তিনি হোয়াইট হাউসে সপ্তাহে দুই দিন করে লড়াইয়ের আয়োজন করবেন। তিনি বলেন, “আমরা সবচেয়ে স্থূল মানুষদের একজন ক্রিস ক্রিস্টিকে লড়াই করাব।” এ বক্তব্যের পর পুরো হলরুম প্রায় নীরব হয়ে যায়। এরপর তিনি কংগ্রেসম্যান জেরি ন্যাডলারকে নিয়ে কৌতুক করে বলেন, “ওরা বিশাল এক টুকরো চিজকেকের জন্য লড়াই করবে।”

পরে ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর অ্যাডাম শিফকে উদ্দেশ করে ট্রাম্প বলেন, “আমি কিছু মানুষকে ঘৃণা করি। উনি একজন মিথ্যাবাদী। আমি তাকে ‘তরমুজ-মাথা’ বলি। জীবনে এত বড় মাথা আর এত চিকন ঘাড় একসঙ্গে দেখিনি।” এ মন্তব্যেও উপস্থিতদের অনেকের মধ্যে অস্বস্তি দেখা যায়। কেবল বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লাটনিককে হাসতে দেখা যায়।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে তদন্তের পক্ষে ট্রাম্প
অনুষ্ঠানটি এমন সময় অনুষ্ঠিত হয়, যখন ট্রাম্প প্রশাসন জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ জোরদার করেছে। ডিনারের কয়েক ঘণ্টা আগে ওভাল অফিসে ট্রাম্প বলেন, “আমরা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নই। আমরা তথ্য ফাঁসকারীদের বিরুদ্ধে। তাদের ধরার সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে সাংবাদিকদের মাধ্যমে। সাংবাদিকদেরও জানা উচিত, এ ধরনের তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়।”

তিনি আরও বলেন, নিউইয়র্ক টাইমস-এর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সমন প্রত্যাহার করা হলেও মামলাটি এখনো শেষ হয়নি এবং এ বিষয়ে আরও অনেক দূর এগোতে হবে।

প্রচলিত রীতি থেকে ভিন্ন ডিনার
হোয়াইট হাউস সংবাদদাতাদের এই বার্ষিক নৈশভোজে সাধারণত প্রেসিডেন্টরা নিজেদের নিয়েও রসিকতা করেন এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে হালকা পরিবেশে কথা বলেন। কিন্তু ট্রাম্প এদিন নিজের প্রশাসন নিয়ে খুব কম কথা বললেও সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আক্রমণ চালিয়ে যান।

তিনি বলেন, “আজ একটু সমালোচনা করব, যদি কিছু মনে না করেন। এখানে ট্রাম্প-বিরোধী মানসিকতার মানুষের সবচেয়ে বড় সমাবেশ হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, আগে যে ভাষণ প্রস্তুত করেছিলেন, তাতে সাংবাদিকদের আরও বেশি আক্রমণ করার পরিকল্পনা ছিল।

ওবামার সেই কৌতুকের প্রসঙ্গ
ট্রাম্প বলেন, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে তিনি একবার দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর অতিথি হিসেবে এই ডিনারে অংশ নিয়েছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে ওবামা তার নাগরিকত্ব নিয়ে ট্রাম্পের অভিযোগকে কেন্দ্র করে কৌতুক করেছিলেন।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ওই ঘটনার পরই ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নেন। তবে ট্রাম্প বলেন, এ ধারণা সঠিক নয়; বরং তিনি ওই অনুষ্ঠানের ব্যাপক প্রচার উপভোগ করেছিলেন।

সাংবাদিক সংগঠনের সমালোচনা
অনুষ্ঠানের আগে সোসাইটি অব প্রফেশনাল জার্নালিস্টস (SPJ) এক খোলা চিঠিতে হোয়াইট হাউস সংবাদদাতা সমিতির প্রতি আহ্বান জানায়, যেন তারা ট্রাম্প প্রশাসনের সাংবাদিকবিরোধী অবস্থানের নিন্দা জানায়।

সংগঠনটি লিখেছিল, “যিনি ধারাবাহিকভাবে প্রথম সংশোধনীর ওপর আঘাত হানছেন, তার সামনেই প্রথম সংশোধনী উদযাপন করা ভণ্ডামির শামিল।”

বন্দুক হামলার স্মৃতি ও কড়া নিরাপত্তা
গত ২৫ এপ্রিল ওয়াশিংটনের ওয়াশিংটন হিলটন হোটেলে অনুষ্ঠিতব্য সংবাদদাতা নৈশভোজ শুরু হওয়ার আগেই এক বন্দুকধারী হামলার চেষ্টা চালায়। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনায় অনুষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়।

৩১ বছর বয়সী কোল টমাস অ্যালেনের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্টকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। এফবিআই জানায়, হামলার আগে তিনি বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের কাছে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর একটি তালিকা পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।

ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেন, “বুলেটপ্রুফ ভেস্টের সঙ্গে মানানসই জুতা খুঁজে পাওয়া সহজ ছিল না। অনেকেই ভেস্ট পরতে চাননি, কারণ এতে ২০ পাউন্ড মোটা দেখাবে। আমাকেও একটি ভেস্ট দেওয়া হয়েছিল। আমি বলেছিলাম, ‘আমি এটা পরব না।’”

এবারের অনুষ্ঠানটি ওয়াশিংটন ডিসির ওয়ালডর্ফ অ্যাস্টোরিয়া হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়। নিরাপত্তাজনিত কারণে অতিথির সংখ্যা ৭০০-এরও কম রাখা হয়, যেখানে মূল অনুষ্ঠানে আড়াই হাজারের বেশি অতিথির উপস্থিত থাকার কথা ছিল।

পরিচ্ছন্ন বার্তার বদলে নতুন বিতর্ক
এপ্রিলের হামলার পর কয়েক ঘণ্টার জন্য ট্রাম্পের আচরণে নমনীয়তা দেখা গেলেও পরদিনই তিনি সিবিএস নিউজের উপস্থাপক নোরা ও'ডনেলকে “জাতীয় লজ্জা” বলে আখ্যা দেন। এরপর তার প্রশাসন আবারও সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়।

সম্প্রতি নির্বাচনী অখণ্ডতা নিয়ে তার ভাষণ সম্প্রচার না করায় কয়েকটি টেলিভিশন নেটওয়ার্কের সম্প্রচার লাইসেন্স বাতিলের আহ্বান জানান ট্রাম্প। একই সঙ্গে কাতারের উপহার হিসেবে পাওয়া বোয়িং ৭৪৭ উড়োজাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় নিউইয়র্ক টাইমস-এর সাংবাদিকদের ফোন রেকর্ড সংগ্রহের উদ্যোগও নেয় বিচার বিভাগ।

সাংবাদিকদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে পরিচিত এই ঐতিহ্যবাহী নৈশভোজ এ বছর পরিণত হয় সংবাদমাধ্যম, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং প্রেসিডেন্টের ভাষাশৈলী নিয়ে নতুন বিতর্কের মঞ্চে।


   আরও সংবাদ