ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

পুলিশের ইউনিফর্মে ফিরছে ‘খাকি’

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ৫ মে, ২০২৬ ০৯:২৩ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৮ বার


পুলিশের ইউনিফর্মে ফিরছে ‘খাকি’

নানা আলাপ-আলোচনার পর অবশেষে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রবর্তিত পুলিশের পোশাকের রং পরিবর্তন করা হচ্ছে। বর্তমান সরকার বলছে, পুলিশের শার্ট আগের রংয়েরই (মেট্রো) থাকছে এবং প্যান্ট হবে খাকি রংয়ের।

পুলিশের বিদ্যমান পোশাকের পরিবর্তনের ঘোষণায় বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে। তারা বলছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকার যে নতুন পোশাক বিবেচনা করছে, তা বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের জন্য গর্ব, একতা ও পেশাদারিত্বের প্রতীক।

 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশ বাহিনীর সংস্কারের পাশাপাশি পোশাক পরিবর্তনের দাবি ওঠে। সেই ধারাবাহিকতায় পুলিশ, র‌্যাব ও আনসারের নতুন পোশাকের রং নির্ধারণ করা হয়।

পুলিশের পোশাক হবে লোহার (আয়রন) রঙের, র‌্যাবের জলপাই (অলিভ) রঙের, আর আনসারের সোনালি গম (গোল্ডেন হুইট) রঙের।

 

তবে সেই সময় পুলিশের নতুন পোশাকের রং নিয়ে বাহিনীর অভ্যন্তরেই দেখা দেয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

অনেক সদস্যের মতে, সেই পোশাকের রং ছিল ‘রুচির দুর্ভিক্ষের প্রতিচ্ছবি’! এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের সেই সময়ের নতুন পোশাক নিয়ে ট্রল চলতে থাকে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আবারও পুলিশের পোশাকের রং নিয়ে আলোচনা ওঠে।

 

সোমবার (৪ মে) সচিবালয়ে বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের (রোহিঙ্গা) সমন্বয়, ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক জাতীয় কমিটির প্রথম সভা শেষে সাংবাদিকরা পুলিশের ইউনিফর্ম পরিবর্তনের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা লক্ষ্য করেছি, সারা দেশে এবং পুলিশ বাহিনীর মধ্যে বিদ্যমান পোশাক নিয়ে কেউ সন্তুষ্ট নয়। দৃশ্যমান এই পোশাকটি ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্যও হয়নি। ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও এটি মানানসই নয়। এ কারণে পুলিশ বাহিনীর আবেদনের প্রেক্ষিতে বিষয়টি আমরা বিবেচনা করছি।’

তিনি বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী একটি পোশাক প্রবর্তনের বিষয়টিও আমরা বিবেচনায় নিয়েছি। আগের শার্ট, যেটি মেট্রো এবং সারা দেশে ব্যবহৃত হতো, তা বহাল রাখা হয়েছে। তবে প্যান্ট বা পায়জামার ক্ষেত্রে খাকি রং নির্ধারণ করা হয়েছে।’

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে একটি গ্রহণযোগ্য পোশাক চূড়ান্ত করা হয়েছে। এটি পরিধানে যেতে কিছুটা সময় লাগবে, কারণ কাপড় উৎপাদন ও প্রস্তুতির বিষয় রয়েছে। এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিলেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, আজ সেটি জানানো হলো।’

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পুলিশ বাহিনীর ওপর আরোপিত সেই ইউনিফর্ম পরিবর্তন করে নতুন পোশাকের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর একজন সদস্য হিসেবে দায়িত্ববোধ, পেশাদারিত্ব ও বাহিনীর প্রতি অঙ্গীকারের বিষয়টি ইউনিফর্ম পরার মধ্য দিয়েই প্রতিফলিত হয়। ইউনিফর্ম পরার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব পালনে আরও সচেতন ও জবাবদিহিতার অনুভূতি জাগ্রত হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন পুলিশ সদস্যের গর্ব, একতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে পোশাকের মান ও নকশা সার্বিক বিবেচনায় উন্নত হওয়া প্রয়োজন। একটি মানসম্মত ও সুপরিকল্পিত ইউনিফর্ম বাহিনীর পরিচিতি ও ভাবমূর্তিকে আরও দৃঢ় করে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকার যে নতুন পোশাক বিবেচনা করছে, তা বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের জন্য গর্ব, একতা ও পেশাদারিত্বের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।

এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের লজিস্টিকস শাখা থেকে এই পরিবর্তনের সপক্ষে ‘পুলিশ ড্রেস রুলস, ২০২৫’ সংশোধনের চলতি বছরের এপ্রিলে একটি প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অতিরিক্ত ডিআইজি মো. সারোয়ার জাহান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে জানানো হয়, ইতিপূর্বে শার্টের রঙ লোহার মতো এবং প্যান্টের রঙ কফি নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে এই রঙ নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ায় এবং সাধারণ মানুষের মাঝেও এটি নিয়ে নেতিবাচক আলোচনা শুরু হওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পুনরায় রঙ নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করেন।

পরিবর্তিত নতুন প্রস্তাবনা অনুযায়ী, দেশের সব মেট্রোপলিটন পুলিশের শার্টের রঙ হবে হালকা অলিভ বা জলপাই। অন্যদিকে এপিবিএন, এসপিবিএন, এসবি, সিআইডি এবং র‍্যাব বাদে পুলিশের অন্যান্য সব ইউনিটের জন্য শার্টের রঙ নির্ধারণ করা হয়েছে গাঢ় নীল। তবে উভয় ক্ষেত্রেই প্যান্টের রঙ হবে খাকি (টিসি টুইল)। এই নতুন রূপরেখা কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি বিধিমালা সংশোধনের খসড়া ইতোমধ্যেই চূড়ান্ত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, পুলিশের এই ইউনিফর্ম পরিবর্তনের ফলে সরকারের ওপর অতিরিক্ত কোনো আর্থিক চাপ পড়বে না। যেহেতু ইউনিফর্মগুলো নিয়মিত সরবরাহ ও প্রাপ্যতার ভিত্তিতে প্রদান করা হয়, তাই বর্তমান বাজেটের মধ্যেই এই সমন্বয় করা সম্ভব হবে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে নতুন পোশাকের কার্যক্রম শুরু করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

মূলত বাহিনীর সদস্যদের সন্তুষ্টি এবং পেশাগত গাম্ভীর্য বজায় রাখতেই এই রঙ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

‘পুলিশের পোশাক শুধু কাপড় নয়, এটা সম্মান, দায়িত্ব আর পরিচয়ের প্রতীক’
৩৯ বছর ১০ মাস কর্মজীবন শেষ করে প্রায় দেড় বছর আগে অবসরে যাওয়া পুলিশ পরিদর্শক বাচ্চু মিয়া বর্তমান ও পূর্ববর্তী সময়ের পুলিশ পোশাক নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়ন তুলে ধরে বাংলানিউজকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুলিশের জন্য যে পোশাক সরবরাহ করা হয়েছিল, তা কোনোভাবেই একটি পেশাদার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপযোগী ছিল না। 

তার ভাষায়, ওই পোশাকগুলো পুলিশের পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না, বরং অনেক ক্ষেত্রে সিকিউরিটি গার্ডদের পোশাকের চেয়েও নিম্নমানের মনে হতো।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, কী বিবেচনায় তৎকালীন কর্মকর্তারা এমন পোশাক বরাদ্দ দিয়েছিলেন, তা তার মতো একজন সাবেক কর্মকর্তার কাছেও বোধগম্য নয়। তার মতে, একটি দেশের পুলিশ বাহিনীর পোশাক শুধু দাপ্তরিক বিষয় নয়, এটি বাহিনীর পরিচয়, মর্যাদা ও জনগণের আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

বাচ্চু মিয়া জোর দিয়ে বলেন, পুলিশের পোশাকে অবশ্যই একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে, যা দেশের অন্যান্য সব ধরনের পোশাক থেকে আলাদা। পোশাক দেখেই যেন সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে, এটি পুলিশের সদস্য—উল্লেখ করেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেওয়া পুলিশের পোশাক জনতা তাদের প্রাইভেট সিকিউরিটি কর্মী মনে করত।

বর্তমান সরকারের ঘোষণায় আগের স্বীকৃত ও পরিচিত পুলিশ পোশাকে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তার মতে, এই সিদ্ধান্ত পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও জনমনে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সবশেষে তিনি বলেন, পুলিশের পোশাক শুধু কাপড় নয়, এটা সম্মান, দায়িত্ব আর পরিচয়ের প্রতীক।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বাংলানিউজকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুলিশের পোশাক পরিবর্তন নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। তখন আমি নিজের আলোচনায় ওই রঙের পোশাকের বিরোধিতা করেছি। বাংলাদেশের যে আবহাওয়া এবং মানুষের মধ্যে, অপরাধীদের মধ্যে, পুলিশের পোশাক দেখে বা পুলিশ দেখে নিরাপত্তার প্রশ্নের যে বিষয় তৈরি হয় এবং একই সঙ্গে অপরাধীরা যে সতর্ক থাকে, এই বৈশিষ্ট্যের জায়গাটা তৈরি হবে না। পরে যেটা দেখা গেল, মূল যারা স্টেকহোল্ডার অর্থাৎ মূল যারা অংশীজন, অর্থাৎ পুলিশের সঙ্গে পোশাক পরিবর্তন নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি—এটা পুলিশের পক্ষ থেকেই কথা বলা হয়েছে।

‘যাই হোক, পুলিশের যে পছন্দের পোশাক কিংবা যে পোশাক পরে তারা তাদের কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে এবং যে রঙের পোশাক পরলে একজন পুলিশকে দূর থেকে দেখা যাবে এবং আমাদের যে আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্য—এই প্রেক্ষাপটগুলো বিবেচনা করলে, এখন আমরা এটা বলতে পারি যে আসলে পুলিশকে যে রঙের পোশাক দেওয়া হয়েছে, সেটা পরিবর্তন করা প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার যে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটাকে আমরা সাধুবাদ জানাই, ইতিবাচক মনে করি।তবে এটাও ঠিক যে শুধু পোশাক পরিবর্তন করলে হবে না। পুলিশের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আছে, সেই অভিযোগগুলোরও পরিবর্তন আসুক। অভিযোগগুলোরও একটা সংশোধন আসুক। আমরা চাই যে পুলিশ জনআস্থার প্রতি সম্মান এবং মর্যাদা রেখে তাদের দায়িত্ব পালন করুক। পোশাক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তাদের মধ্যে এই পরিবর্তনটা আসুক—এটা আমরা প্রত্যাশা করি।


   আরও সংবাদ