ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১৮:১৫ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩০ বার
অমর একুশে গ্রন্থমেলার পরিসর বাড়লেও গবেষণামূলক বই বের হচ্ছে কি না, তা নিয়ে ভাবা দরকার বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একইসঙ্গে বইমেলাকে আগামীতে আন্তর্জাতিক পরিসরে আয়োজনের সুযোগ রয়েছে কি না এবং মানুষের বই পড়ার অভ্যাস বাড়ছে কি না, এসব বিষয় নিয়েও বর্তমানে চিন্তাভাবনা করার অবকাশ আছে বলেও তিনি মনে করেন।
বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ৩টায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বইমেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি বই পড়ার গুরুত্ব, ইন্টারনেটের কারণে বই পড়ার হার কমে যাওয়া এবং মানুষের মধ্যে বই পড়ার প্রবণতা বাড়ানোসহ একাধিক বিষয়ে কথা বলেন।
বক্তব্য শেষে তিনি বইমেলার উদ্বোধন ঘোষণা করেন। পরে তিনি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বইমেলা ঘুরে দেখেন। তার আগে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে সম্মাননা স্মারক ও নগদ তিন লাখ টাকা তুলে দেন।
বক্তব্যে তিনি বলেন, মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে আমরা সগৌরবে প্রতি বছর একুশ পালন করে থাকি।
দিবসটি এখন শুধু বাংলাদেশের নয়। অমর একুশে এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারা বিশ্বেই পালিত হচ্ছে। ৫২’র ভাষা আন্দোলনের শহীদদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে এই বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলা একাডেমির সৃজনশীল কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ অমর একুশে বইমেলা।
তবে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী বছরগুলোয় অমর একুশে বইমেলা ‘অমর একুশে আন্তর্জাতিক বইমেলা’ হিসেবে আয়োজনের সুযোগ রয়েছে কি না, সেটি আমি আপনাদের সকলকে ভেবে দেখার অনুরোধ জানাই।
তারেক রহমান বলেন, অমর একুশে আন্তর্জাতিক বইমেলা অনুষ্ঠিত হলে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি বহু ভাষা ও সংস্কৃতি শেখা, জানা এবং বোঝার ক্ষেত্রে আমাদের নাগরিকদের আগ্রহী করে তুলতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি। বর্তমান গ্লোবাল ভিলেজের এই সময়ে মাতৃভাষার পাশাপাশি আরও একাধিক ভাষার সঙ্গে পরিচিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সমৃদ্ধি ও সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। এজন্য আমাদের জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নিজেদের সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে।
একইসঙ্গে বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য কাজ শুরু করা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় বইমেলার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই বইমেলার আয়োজন হয়। তবে আমাদের বইমেলা অন্য দেশের বইমেলার মতো নয়। আমাদের বইমেলা আমাদের মাতৃভাষা, ভাষার অধিকার আদায় এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্মারক হিসেবে চিহ্নিত। তবে প্রতিবছর মেলার আকার-আয়তন বাড়লেও সেই হারে গবেষণাধর্মী বই প্রকাশিত হচ্ছে কি না কিংবা মানুষের বই পড়ার অভ্যাস বাড়ছে কি না, এ বিষয়গুলো নিয়েও বর্তমানে চিন্তাভাবনা করার অবকাশ আছে।
বইমেলা শুধু একটি নির্দিষ্ট মাসে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছর দেশের সব বিভাগ, জেলা ও উপজেলায় আয়োজন করা যায় কি না, সে বিষয়ে প্রকাশকদের উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বই পড়ার গুরুত্ব, বাংলাদেশের মানুষের পাঠাভ্যাস এবং ইন্টারনেটের প্রভাব নিয়ে কথা বলেন। বলেন, বই পড়ার গুরুত্ব সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। জার্মান দার্শনিক মার্কাস সিসেরোর একটি উক্তি এখানে প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছিলেন, ‘বই ছাড়া ঘর আত্মা ছাড়া দেহের মতো।’ সম্ভবত আরেকজন বক্তাও একই কথা বলেছেন তার বক্তব্যে। বিজ্ঞানী ও গবেষকরা বলছেন, বই শুধু বিদ্যা অর্জন বা অবসরের সঙ্গী নয়; বই পড়া মস্তিষ্কের জন্য এক ধরনের ব্যায়াম। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরি করে, যা মানুষের স্মৃতিশক্তি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা বাড়ায়। এমনকি আলঝেইমার বা ডিমেনশিয়ার মতো রোগের ঝুঁকিও ক্ষেত্রবিশেষে কমাতে সহায়তা করে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি মানুষের বই পড়ার অভ্যাসে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে ইন্টারনেট আসক্তি তরুণ প্রজন্মকে বইবিমুখ করে তুলছে। ইন্টারনেটে অবশ্যই বই পড়া যায়। তবে গবেষকরা বলছেন, বইয়ের পাতায় মুদ্রিত অক্ষর পড়ে যে গভীরভাবে জ্ঞান অর্জন করা যায়, দিনের পর দিন কম্পিউটার মনিটরের সামনে বসে তা একইভাবে সম্ভব হয় না। বরং এর কিছু শারীরিক ও মানসিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে।
যুক্তরাজ্য কিংবা কানাডার মতো অনেক উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা বলছেন, ইন্টারনেট ব্যবহারের আসক্তি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। সময়ের প্রেক্ষিতে জনজীবনে ইন্টারনেট হয়তো অনিবার্য হয়ে উঠেছে, তবে এর নেতিবাচক দিক সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে বইয়ের প্রতি তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ বাড়ানোর উপায় খুঁজে বের করতে হবে।
তিনি বলেন, বিশ্বের ১০২টি দেশের নাগরিকদের পাঠাভ্যাস নিয়ে একটি জরিপ প্রকাশিত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনের জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা বই পড়ার শীর্ষে রয়েছেন। সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে আফগানিস্তান। তবে বইপ্রেমীদের এই তালিকায় দুঃখজনকভাবে ১০২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। এটি উদ্বেগের বিষয়, ভয় পাওয়ার নয়।
বাংলাদেশের একজন মানুষ গড়ে বছরে তিনটি বই পড়েন। বই পড়ার পেছনে ব্যয় করেন বছরে গড়ে ৬২ ঘণ্টা। সুতরাং অমর একুশে বইমেলাকে নিছক একটি উৎসব হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এই মেলা আমাদের কীভাবে আরও বইপ্রেমী করে তুলতে পারে, সেটি নিয়েও কাজ করার সুযোগ রয়েছে। আজকের এই বইমেলা আমাদের নিয়মিত বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলবে; এ প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি।’
এর আগে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পরে পবিত্র কোরআনসহ বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করা হয়। এরপর সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। সংগীতশিল্পী ফেরদৌস আরার নেতৃত্বে সুরসপ্তকের শিল্পীরা পরিবেশন করেন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি।
ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
অনুষ্ঠানে দুপুর ২টায় মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বক্তব্য রাখেন বাংলা একাডেমির সভাপতি আবুল কাসেম ফজলুল হক, মহাপরিচালক অধ্যাপক আজম এবং সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী জোবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য পদত্যাগ করা উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খান, উপ-উপাচার্য মামুন আহমেদসহ একাধিক কবি, শিল্পী ও বিশিষ্টজন উপস্থিত ছিলেন।
এ বছর বইমেলা চলবে ১৫ মার্চ পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা চলবে। মেলায় শিশুদের জন্য ‘শিশুপ্রহর’ থাকবে। ছুটির দিন সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শিশুদের জন্য বিশেষ আয়োজন থাকবে। এ বছর মোট ৫৪৯টি স্টল এবং ৮৭টি লিটল ম্যাগ থাকছে। মেলায় বই বিক্রি হবে ২৫ শতাংশ কমিশনে।