ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:৩৮ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৪ বার
বুধবার বিকেলে রাজধানীর ব্যস্ততম ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের গেট দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। হাসপাতালের ভবন ঘেঁষা খোলা জায়গায় প্রায় অর্ধমৃত অবস্থায় পড়ে আছেন এক ব্যক্তি। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে তিনি আর বেঁচে নেই। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায় শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে, তিনি এখনও জীবিত।
তার শরীরজুড়ে পুরোনো ক্ষত। পচে যাওয়া জখম থেকে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। ক্ষতস্থানে ও সারা শরীরে বসে আছে হাজার হাজার মাছি। দীর্ঘদিনের অবহেলায় ক্ষতগুলো রক্তাক্ত ও সংক্রমিত।
এতটাই দুর্বল তিনি যে মাছি তাড়ানোর শক্তিটুকুও নেই। মাঝে মাঝে কেবল আঙুল নড়ানোর চেষ্টা করেন, যেন শেষ শক্তি দিয়ে সরাতে চান যন্ত্রণা।
হাসপাতালের ভেতরেই এমন দৃশ্য দেখে উপস্থিত মানুষ হতবাক ও ক্ষুব্ধ।
নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার দাইরাদি গ্রামের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলছেন, গত কয়েকদিন ধরেই লোকটাকে এখানে শুয়ে থাকতে দেখছি।
নড়াচড়া করতে পারেন না। পায়ে বড় ক্ষত হাজার হাজার মাছি বসে আছে। ভাই, হয়তো লোকটা বাঁচবে না। কিন্তু একটা মানুষ হাসপাতালেই বিনা চিকিৎসায় এভাবে পড়ে থাকবে, এটা কীভাবে সম্ভব?
হাসপাতাল প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই পরিচয়হীন, ভবঘুরে ও অসহায় মানুষদের জন্য আলাদা চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা সেবার কারণে এই হাসপাতালকে নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র মানুষের ভরসার জায়গা বলা হলেও বাস্তবে ভবঘুরে ও নাম-পরিচয়হীন মানুষদের জন্য নেই আলাদা ওয়ার্ড, নেই বিশেষ ইউনিট।
ফলে অনেকেই অসুস্থ অবস্থায় পড়ে থাকেন হাসপাতাল চত্বরে। ধীরে ধীরে অবস্থা খারাপ হয়, এবং একসময় মৃত্যুবরণ করেন বিনা চিকিৎসায়।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান জানান, গত জানুয়ারি মাসেই হাসপাতাল চত্বরসহ আশপাশের এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে মোট ১৫ জনের মরদেহ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদ আলম বলেন, চানখারপুল মোড়, শহীদ মিনার এলাকা, বকশিবাজার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ফুটপাত ও হাসপাতাল চত্বর থেকে প্রায়ই নাম-পরিচয়হীন ভবঘুরেদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারকৃত মরদেহগুলোর অধিকাংশই অসুস্থ ও মাদকাসক্ত থাকে। পরে এসব মরদেহ দাফনের ব্যবস্থা করে মানবিক সংগঠন আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম।
এ প্রসঙ্গে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, হাসপাতাল একটি উন্মুক্ত স্থান হওয়ায় ভবঘুরে ও পরিচয়হীন অসুস্থ মানুষ প্রায়ই এখানে প্রবেশ করেন। অনেককে উদ্ধার করে ভর্তি করা হলেও তারা চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকতে চান না। এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সমাজকল্যাণ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে একজনকে নিয়োগও দেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি নাম-পরিচয়হীন রোগীদের জন্য আলাদা একটি কক্ষ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সুতরাং এখন থেকে ভাসমান ছিন্নমূল মানুষদের আলাদা চিকিৎসা দেওয়া হবে।
যদিও রাত প্রায় ৯টার দিকে হাসপাতাল ত্যাগ করার সময়ও সেই ব্যক্তি একই জায়গায় পড়ে ছিলো।
সচেতন মহলের প্রশ্ন, একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালের গেটেই যদি একজন মানুষ বিনা চিকিৎসায় পড়ে থাকেন, তবে মানবিকতা কোথায়? এই মানুষগুলোর হয়তো পারিবারিক পরিচয় নেই, স্বজন নেই। কিন্তু তারাও মানুষ। তাদেরও তো রয়েছে বাঁচার অধিকার।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা নতুন সরকার অচিরেই এই মানুষগুলোর জন্য গড়ে তুলবেন একটি স্বতন্ত্র, কার্যকর ও মানবিক চিকিৎসা ব্যবস্থা।