আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারী, ২০২৬ ১২:৩৮ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩ বার
সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরসহ আরও সাতটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত শান্তি পর্ষদে (বোর্ড অব পিস) যোগ দিতে সম্মত হয়েছে। এক যৌথ বিবৃতিতে দেশগুলো এ তথ্য জানিয়েছে।
এই সাত দেশের সঙ্গে আগেই অংশগ্রহণের কথা প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেছে ইসরায়েল।
বুধবার সন্ধ্যায় ট্রাম্প দাবি করেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও এই বোর্ডে যোগ দিতে সম্মত হয়েছেন।
তবে রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা এখনো আমন্ত্রণটি পর্যালোচনা করছে।
প্রথমদিকে ধারণা করা হয়েছিল, এই বোর্ডের উদ্দেশ্য গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটানো এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন তদারক করা। কিন্তু প্রস্তাবিত সনদে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজার নাম সরাসরি উল্লেখ নেই। বরং এটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যা জাতিসংঘের কিছু কার্যক্রমকে কার্যত পাশ কাটাতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে সৌদি আরব জানিয়েছে, মুসলিম-প্রধান দেশগুলোর এই জোট সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসর, জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও কাতার গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি সুসংহত করা, পুনর্গঠনে সহায়তা করা এবং তারা যাকে ‘ন্যায়সংগত ও টেকসই শান্তি’ বলছে, সেটি এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যকে সমর্থন করছে।
সুইজারল্যান্ডে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, পুতিন তার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। ট্রাম্পের ভাষায়, “তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তিনি গ্রহণ করেছেন। অনেকেই গ্রহণ করেছেন।
”
তবে রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, পুতিন দ্রুত প্রতিক্রিয়ায় জানান, বিষয়টি এখনো বিবেচনাধীন। তিনি বলেন, রাশিয়া জব্দ করা রুশ সম্পদ থেকে ১০০ কোটি ডলার দেওয়ার জন্য প্রস্তুত এবং তিনি এই বোর্ডকে মূলত মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ হিসেবেই দেখছেন।
এই নতুন সংস্থায় ঠিক কতটি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। কানাডা ও যুক্তরাজ্য আমন্ত্রিত দেশগুলোর মধ্যে থাকলেও তারা এখনো প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। এরই মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, আলবেনিয়া, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বেলারুশ, হাঙ্গেরি, কাজাখস্তান, মরক্কো ও ভিয়েতনাম এতে যোগ দিয়েছে।
বুধবার ভ্যাটিকানও নিশ্চিত করেছে, পোপ লিও এই বোর্ডে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছেন। ভ্যাটিকানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কার্ডিনাল পিয়েত্রো পারোলিন জানান, পোপ অংশ নেবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগবে।
অন্যদিকে, স্লোভেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট গোলব এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার মতে, এই বোর্ড ‘আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর বিপজ্জনক হস্তক্ষেপ’ করছে।
ফাঁস হওয়া একটি নথিতে বলা হয়েছে, বোর্ড অব পিসের সনদ কার্যকর হবে, যদি অন্তত তিনটি রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এতে বাধ্য থাকতে সম্মত হয়। সদস্য রাষ্ট্রগুলো তিন বছরের জন্য (নবায়নযোগ্য) সদস্যপদ পাবে। আর যেসব দেশ এক বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন করবে, তারা স্থায়ী আসন পেতে পারে।
সনদে বোর্ডটিকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এতে ডোনাল্ড ট্রাম্প চেয়ারম্যান থাকবেন এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধির ভূমিকাও পালন করবেন। নির্বাহী বোর্ডের সদস্য নিয়োগ, অধীনস্থ সংস্থা গঠন বা বাতিলের ক্ষমতাও তার হাতে থাকবে।
গত শুক্রবার হোয়াইট হাউস বোর্ডটির সাত সদস্যবিশিষ্ট প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী বোর্ডের নাম ঘোষণা করে। এতে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার।
জাতিসংঘের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য দূত নিকোলাই ম্লাদেনভকে গাজা বিষয়ক প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে গাজার পুনর্গঠন ও নিরস্ত্রীকরণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং এই বোর্ডের কার্যক্রম ২০২৭ সালের শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত থাকবে বলে নথিতে বলা হয়েছে।
শনিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানায়, গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ডের গঠন ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় না করেই করা হয়েছে এবং এটি ইসরায়েলের নীতির পরিপন্থী।
ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানায়, তুরস্ক ও কাতারের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত ইসরায়েলের অজ্ঞাতসারেই নেওয়া হয়েছে।
শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপে হামাস ও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এতে জীবিত ও মৃত ইসরায়েলি জিম্মিদের বিনিময়ে ইসরায়েলি কারাগারে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি, গাজা থেকে আংশিকভাবে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং মানবিক সহায়তা বাড়ানোর বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ইসরায়েল বলেছে, হামাস শেষ নিহত জিম্মির মরদেহ হস্তান্তর না করা পর্যন্ত তারা দ্বিতীয় ধাপে যাবে না।
দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়ন নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। হামাস আগে জানিয়েছে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের নিশ্চয়তা ছাড়া তারা অস্ত্র ত্যাগ করবে না। অন্যদিকে, ইসরায়েলও গাজা থেকে পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহারের অঙ্গীকার করেনি।
এদিকে যুদ্ধবিরতিও ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। হামাস-নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ৪৬০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। অপরদিকে, একই সময়ে ফিলিস্তিনি হামলায় ইসরায়েলের তিন সেনা নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলায় প্রায় ১২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর জবাবে ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, সেই অভিযানে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজার ৫৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
সূত্র: বিবিসি