ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭:৪৬ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ২৪ বার
নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত একটি রুশ প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিরোধের জেরে দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামোয় বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এর ফলে রোববার (৪ অক্টোবর) রাত থেকে লাখ লাখ ব্যবহারকারীর কার্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ও আন্তঃব্যাংক লেনদেন ব্যাহত হচ্ছে।
কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারী স্থানীয় পেমেন্ট প্রসেসর ইনফরমেশন টেকনোলজি কনসালট্যান্টস লিমিটেড (আইটিসিএল) ও রুশ প্রতিষ্ঠান কম্পাস প্লাসের মধ্যে সফটওয়্যার মাইগ্রেশন নিয়ে বিরোধ থেকেই এ সংকটের সূত্রপাত।
আইটিসিএল জানায়, ব্রাসেলসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওপেনওয়ের তৈরি এন্টারপ্রাইজ পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ‘ওয়ে৪’ দিয়ে তাদের বর্তমান প্ল্যাটফর্ম প্রতিস্থাপনের উদ্যোগের কথা জানতে পেরে কম্পাস প্লাস আইটিসিএলের সার্ভারে একটি ক্ষতিকর স্ক্রিপ্ট বসিয়ে দেয়।
আইটিসিএলের দাবি, ওই স্ক্রিপ্ট প্রতি আট ঘণ্টা পরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সার্ভারগুলো রিস্টার্ট করে। এতে রাউটিং টেবিল মুছে গিয়ে পুরো নেটওয়ার্কে ডেটা প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা বন্ধ হয়ে যায়।
আইটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কাজী সাইফুদ্দিন মুনির বলেন, সমস্যা শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিকাশসহ সব অংশীদার ব্যাংককে সতর্ক করা হয়েছে।
আগস্টে আইটিসিএল ১২ থেকে ১৮ মাসের রূপান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কম্পাস প্লাসের প্ল্যাটফর্ম পর্যায়ক্রমে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানালে বিরোধ তীব্র হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এর প্রতিক্রিয়ায় কম্পাস প্লাস কারিগরি সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়। একই সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে ১৫ লাখ মার্কিন ডলার মাইগ্রেশন ফি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সমর্থনযুক্ত আগাম পেমেন্ট গ্যারান্টি দাবি করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ
অচলাবস্থা নিরসনে সোমবার ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান ও আইটিসিএলকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে পূর্বঘোষণা ছাড়া সেবা বন্ধ করে দেওয়ায় আইটিসিএলের ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, এটি স্পষ্টতই একটি কারিগরি সমস্যা। তবে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় কার্ডধারীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।
তিনি জানান, হঠাৎ সেবা বন্ধ করে দেওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সদস্য ব্যাংকগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, যেকোনো পূর্বনির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ কাজের আগে জাতীয় গণমাধ্যম, টেলিভিশন ও সরাসরি টেক্সট মেসেজের মাধ্যমে গ্রাহকদের পর্যাপ্ত সময় আগে অবহিত করা বাধ্যতামূলক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টের তথ্যমতে, আইটিসিএলের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কাজ প্রথমে অক্টোবরের শেষের দিকে হওয়ার কথা ছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, রোববার সন্ধ্যায় আইটিসিএল হঠাৎ করে জানায়, জরুরি ভিত্তিতে তাদের সেবা অফলাইনে নিতে হবে।
তিনি বলেন, আইটিসিএল জরুরি পরিস্থিতির কথা বললেও পূর্বঘোষণা ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ পেমেন্ট অবকাঠামো বন্ধ করে দেওয়া নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
শিল্প ও গ্রাহক পর্যায়ে প্রভাব
দেশের ৩৩টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে প্রাথমিক পেমেন্ট প্রসেসিং ও গেটওয়ে অবকাঠামো সরবরাহ করে আইটিসিএল। ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (এনপিএসবি), এটিএম, পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) টার্মিনাল, ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন (সিআরএম) এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং ফান্ড ট্রান্সফারসহ (আইবিএফটি) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনা করে প্রতিষ্ঠানটি।
খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশের ব্যাংকিং-কার্ড লেনদেনের প্রায় ৭০ শতাংশই আইটিসিএলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
আইটিসিএলের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, রোববার (৪ অক্টোবর) রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর দুপুর ১২টা পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে হঠাৎ সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশজুড়ে লাখ লাখ গ্রাহক রেস্তোরাঁ, দোকানপাট ও এটিএম বুথে চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
অনেক গ্রাহক মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সাধারণ লেনদেন করা কিংবা নিজেদের অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্সও দেখতে পারেননি।
হঠাৎ সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্রাহকদের আস্থা ও ব্যাংকগুলোর সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন সদস্য ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
ট্রাস্ট ব্যাংকের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) মাহফুজুর রহমান বলেন, আইটিসিএল রোববার সন্ধ্যায় বিষয়টি ব্যাংককে জানায়, যেদিনই তারা সেবা বন্ধ করে দেয়। ফলে গ্রাহকদের বিষয়টি জানানোর জন্য ব্যাংকের হাতে পর্যাপ্ত সময় ছিল না।
তিনি বলেন, এটি ছিল সম্পূর্ণ অপেশাদার একটি পদক্ষেপ। এর ফলে সদস্য ব্যাংকগুলোর ওপরও গ্রাহকদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মাহফুজুর রহমান জানান, ট্রাস্ট ব্যাংকের ডেবিট কার্ড আন্তর্জাতিক ভিসা ও দেশীয় এনপিএসবি নেটওয়ার্কে সচল থাকলেও তাদের ক্রেডিট কার্ড, প্রিপেইড কার্ড ও কিউ-ক্যাশ এটিএম নেটওয়ার্ক পুরোপুরি অচল রয়েছে।