আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:৫৩ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ২২ বার
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক সামরিক অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ইরানের ওপর প্রভাব খাটানোর জন্য চীনের সহায়তা চেয়েছে সৌদি আরব। রিয়াদের অনুরোধের পর বেইজিং ব্যক্তিগতভাবে তেহরানকে হুতিদের ওপর নিজেদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত তিন ইরানি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স।
সূত্রগুলোর ভাষ্য, গত এক সপ্তাহে হুতিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল এবং কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে।
এতে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়েছে।
প্রকাশ্যে চীন সংযম, সংলাপ এবং নিরাপদ নৌ চলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানালেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে তেহরানের কাছে দেওয়া বার্তায় আরও সরাসরি অবস্থান নিয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানি সূত্রগুলো।
তাদের দাবি, সংঘাত যাতে লোহিত সাগর ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথে আরও ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য ইরানকে হুতিদের ওপর তার প্রভাব কাজে লাগাতে বলেছে বেইজিং।
তবে চীনের বার্তাটি কীভাবে তেহরানের কাছে পৌঁছানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি চীন সফর করলেও ওই সফরের সময়ই বার্তাটি দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
চীনের উদ্বেগের জবাবে তেহরান জানিয়েছে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের অবসান প্রয়োজন-এমনটাই জানিয়েছেন সূত্রগুলো।
তিন ইরানি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, হুতিদের ওপর প্রভাব খাটাতে ব্যর্থ হলে ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ বা অন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেয়নি চীন। রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, ইয়েমেন ও লোহিত সাগরে উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে পড়ুক, তা তারা চায় না। একই সঙ্গে সব দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি সম্মান এবং মানুষের জীবনযাত্রার জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা না করার আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং।
হরমুজ ও লোহিত সাগর নিয়ে উদ্বেগ
ইরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বেইজিংয়ের বর্তমান উদ্বেগের অন্যতম কারণ। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চীন ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং দেশটির তেলের প্রধান ক্রেতা। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের সমুদ্রপথে রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনেছে চীন। দৈনিক গড় সরবরাহের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল।
লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুতিদের তৎপরতা বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচলও সংকুচিত থাকার পরিস্থিতিতে লোহিত সাগরের নৌপথে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হলে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ একই সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান কর্মসূচির পরিচালক অ্যালেক্স ভাতানকা বলেন, ইরান হরমুজ প্রণালিকে চাপের মধ্যে রাখার সক্ষমতা রাখে। তবে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত চীনের মতো দেশগুলোর স্বার্থকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। চীনের তেল আমদানির প্রায় অর্ধেক আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। একই সঙ্গে চীন ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বছরে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য রয়েছে।
বেইজিংয়ের আহ্বানে তেহরানের অবস্থান কী হবে?
চীনের অনুরোধের পর তেহরান হুতিদের ওপর বাস্তবে কতটা প্রভাব খাটাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন তিন ইরানি সূত্র।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাত এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের জন্য চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। ইরানের তেলশিল্পে বিনিয়োগ এবং নিষেধাজ্ঞায় ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতাও চীনের রয়েছে।
এর আগে ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চুক্তি হয়েছিল। কয়েক বছরের বৈরিতার পর ওই উদ্যোগের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
তবে চীনের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও দেশটির ভেতরে সমালোচনা রয়েছে। ২০২১ সালে দুই দেশ ২৫ বছরের সহযোগিতা চুক্তি করলেও তেলবহির্ভূত বাণিজ্য ও চীনা বিনিয়োগ প্রত্যাশার তুলনায় কম বলে সমালোচকদের একটি অংশ মনে করে। একই সময়ে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে চীনের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বেড়েছে।
সব মিলিয়ে হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা চীনকে একদিকে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে, অন্যদিকে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ও জ্বালানি পরিবহনপথের স্থিতিশীলতা নিয়ে সক্রিয় হতে বাধ্য করছে। তবে বেইজিংয়ের আহ্বানে তেহরান কতটা সাড়া দেবে এবং হুতিদের ওপর তার প্রভাব কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে আছে।