ঢাকা, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

নেপালে ভয়াবহ বন্যার পর নতুন আতঙ্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক


প্রকাশ: ২৮ অগাস্ট, ২০২৬ ০৭:৫২ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৪ বার


নেপালে ভয়াবহ বন্যার পর নতুন আতঙ্ক

 

ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত নেপাল ও তিব্বতে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছাতে আন্তর্জাতিক মহলে তৎপরতা শুরু হয়েছে। এর মধ্যেই বন্যার উৎপত্তিস্থলে তৈরি হওয়া একটি হ্রদের পানি ক্রমেই বাড়ছে।

 

যেকোনো সময় হ্রদটি ফেটে নতুন করে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ।

বুধবার নেপাল ও তিব্বতে আঘাত হানা আকস্মিক বন্যায় অন্তত ৩৮৯ জন নিহত এবং ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি নিখোঁজ রয়েছেন।

 

 

পাহাড়ি উপত্যকা দিয়ে প্রবল স্রোত নেমে এসে পুরো গ্রাম নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

নিখোঁজদের মধ্যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার শত শত পর্যটক রয়েছেন।

 

 

দুর্গম এলাকায় কয়েক ডজন সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক ধ্বংস হওয়ায় উদ্ধার তৎপরতাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

উদ্ধারকারীরা দুর্যোগস্থল থেকে কয়েকশ কিলোমিটার দূরে নেপালের চিতওয়ান জেলায় মরদেহ পেয়েছেন।

 

 

আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য কাঠমান্ডুতে নেওয়া হচ্ছে। নেপালি সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে শতাধিক মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

নেপালে বন্যা: হিমালয়ে কী ঘটেছিল, সামনে কী ঝুঁকি

নেপালে বন্যা: হিমালয়ে কী ঘটেছিল, সামনে কী ঝুঁকি

 

 

বুধবারের বন্যার ভিডিওতে দেখা যায়, মানুষ প্রাণ বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করার সময় সীমান্তবর্তী এলাকায় পানির বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে। বন্যার পানি, স্রোতের গতি ও প্রবল শক্তির কারণে অনেকের হাতে পালানোর জন্য পর্যাপ্ত সময়ও ছিল না।

 

নেপালে ট্রাক, বাড়িঘর, সড়ক ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পানির তোড়ে ভেসে গেছে। তিব্বতে চীনা কর্মকর্তারা সীমান্তবর্তী একটি স্থানে ভূমিধসের পর ‘বড় ধরনের প্রাণহানির’ আশঙ্কা জানিয়েছেন।

 

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিভাগের প্রধান টম ফ্লেচার বন্যাকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, জরুরি সহায়তা দল মোতায়েন করা হয়েছে এবং চিকিৎসা, আশ্রয় ও পানির জরুরি চাহিদা মেটাতে প্রাথমিকভাবে ২০ লাখ ডলারের তহবিল বরাদ্দ করা হয়েছে।

 

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবারও নতুন বিপদের আশঙ্কায় সতর্ক করেছে। বন্যার উৎপত্তিস্থলে তৈরি হওয়া ফুলে ওঠা হ্রদ থেকে বাসিন্দা ও উদ্ধারকারীদের দূরে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, সোসিয়াল ও পুরুপকিয়াংজাংবু নদীর সংযোগস্থলে তৈরি হওয়া ‘বাধ হ্রদ’ উপচে পড়ছে এবং যেকোনো সময় তা ভেঙে যেতে পারে।

 

‘আমি এখন একা’

নেপালের বাগমতী প্রদেশের রাসুয়া জেলার বাসিন্দা ৩৬ বছর বয়সী গিরিলাল বুধাথোকি জানান, তিনি বাড়ির বাইরে থাকায় বন্যার সময় স্ত্রী ও চার সন্তানকে হারিয়েছেন।

 

তিনি বলেন, ‘হঠাৎ বিশাল পানির ঢল এলো। চারপাশ পুরো অন্ধকার হয়ে গেল। কী ঘটছে বুঝতে পারছিলাম না। হঠাৎ ভারী কিছু আমাকে আঘাত করে মাটিতে ফেলে দেয়।’

 

পরে বাড়ির জায়গায় ফিরে স্ত্রী-সন্তানদের খুঁজেও পাননি তিনি। বুধাথোকি বলেন, ‘আমি মরিয়া হয়ে স্ত্রী ও সন্তানদের খুঁজেছি, কিন্তু পাইনি। তারা বের হতে পারেনি। আমার স্ত্রীও ভেসে গেছে। এখন আমি একা।’

 

রাসুয়া জেলার চিলিমে একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত কমল খারেল জানান, বন্যার সময় তিনি অফিসে ছিলেন। তার ভাষায়, ‘মনে হচ্ছিল বিশাল ভূমিকম্প হয়েছে। বাইরে গিয়ে দেখি সবকিছু ঝড় আর উত্তাল পানিতে ভেসে যাচ্ছে।’

 

তিনি ও তার কয়েকজন সহকর্মী একটি পাহাড়ে উঠে আশ্রয় নেন। বৃহস্পতিবার সকালে সেনাবাহিনী তাদের উদ্ধার করে। খারেল বলেন, ‘আমি কখনো এত উঁচু ঢেউ দেখিনি। সমুদ্রে ছাড়া এমন ঢেউ দেখা যায় না।’

 

বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলার মানুষ নিখোঁজ স্বজনদের খবর জানতে সেনাবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের বাইরে জড়ো হন। ওই কেন্দ্র থেকেই হেলিকপ্টারে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এলাকাটি বিদ্যুৎবিহীন ছিল; অন্ধকারে মানুষের একমাত্র ভরসা ছিল মোবাইল ফোনের আলো।

 

আরও পড়ুন

যে গ্রামকে বন্যা ছোঁয়নি, ত্রিশূলী এবার কেড়ে নিলো

যে গ্রামকে বন্যা ছোঁয়নি, ত্রিশূলী এবার কেড়ে নিলো

 

 

নুওয়াকোটের সোলি গ্রামের প্রায় ২৫টি বাড়ির বেশির ভাগই ধ্বংস হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন কাঠমান্ডুভিত্তিক সাংবাদিক নিরাজন পৌডিয়াল। তার বাবা-মা ও অন্য স্বজনেরা ওই গ্রামে থাকতেন। পরিবারের খোঁজে সেখানে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এখনও কোনো খবর পাইনি। আমার আশঙ্কা, হয়তো আর কোনো খবরই পাব না।’

 

নিখোঁজ শত শত বিদেশি

নেপালের পুলিশ ও পর্যটন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশটিতে নিখোঁজ ৮২৬ জনের মধ্যে ৫০০ জনের বেশি বিদেশি। তাদের মধ্যে ভারতের ১৭৭, যুক্তরাষ্ট্রের ৯০, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪, যুক্তরাজ্যের ৩৩ এবং কানাডার ২৫ জন রয়েছেন।

 

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, তিব্বতের অংশে অন্তত ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক।

 

নেপালের পুলিশ বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত ৩৮৯টি মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে। তিব্বতের অংশে তিনজনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।

 

নিহত ও নিখোঁজদের অনেকেই তিব্বতের কৈলাস মানসসরোবর তীর্থস্থানে যাওয়ার পথে ছিলেন। হিন্দু ও বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কাছে উচ্চভূমির এই স্থানটি অত্যন্ত পবিত্র।

 

প্রাথমিকভাবে নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহের নিচের অংশ ধসে গিয়ে বন্যার সৃষ্টি হতে পারে। তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, প্রথমে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে যে কম্পন শনাক্ত হয়েছিল, সেটি আসলে হিমবাহের পাথর ও বরফ ধসে পড়ার ফলে সৃষ্টি হওয়া ভূকম্পন। সেখানে কোনো ভূমিকম্প হয়নি।

 

জলবায়ু সংকটে বাড়ছে দুর্যোগ

আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের নেপাল শাখার ভারপ্রাপ্ত পরিচালক শ্রীজনা গুরুং বলেন, দেশটির বিভিন্ন সম্প্রদায় একের পর এক ‘জলবায়ু ধাক্কার’ মুখোমুখি হচ্ছে।

 

তিনি বলেন, নেপালে বন্যা ও ভূমিধস নতুন নয়, তবে জলবায়ু সংকট এসব দুর্যোগকে আরও ঘন ঘন ও তীব্র করে তুলছে। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছানো, নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজছেন এমন পরিবারগুলোকে সহায়তা করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা।

 

বাড়িঘর ও জীবিকা হারানো শিশু ও পরিবারগুলোর চিকিৎসা, খাবার, আশ্রয় ও স্বাস্থ্যসামগ্রী জরুরি প্রয়োজন বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার কথাও বলেন গুরুং।

 

এদিকে তিব্বতে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখনও স্পষ্ট নয়। চীনের সবচেয়ে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোর একটি তিব্বত। বিদেশি সাংবাদিকদের সেখানে প্রবেশের সুযোগ সীমিত এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের যোগাযোগও অত্যন্ত সীমিত।

 

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বন্যা নিয়ে কেবল সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেছে এবং মূলত উদ্ধার তৎপরতার ওপর জোর দিয়েছে।

 

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মায়া ওয়াং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, তিব্বতে দ্রুত রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে। বন্যা মোকাবিলায় চীনা কর্তৃপক্ষ আরও কিছু করতে পারত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

 

তিব্বতিদের তথ্য পাওয়ার সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক গবেষক ও সাংবাদিকদের অবাধে সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি দুর্যোগের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন ওয়াং।


   আরও সংবাদ