ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

প্রকল্পনির্ভরতা-অর্থসংকটে থমকে আছে হাতি সংরক্ষণ

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ১৩ অগাস্ট, ২০২৬ ০৯:২০ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৭ বার


প্রকল্পনির্ভরতা-অর্থসংকটে থমকে আছে হাতি সংরক্ষণ

‘বিশ্বজুড়ে ঐক্য গড়ি, হাতির জীবন রক্ষা করি’, এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে উদযাপিত হলো বিশ্ব হাতি দিবস। তবে বন উজাড়, আবাসস্থল সংকোচন, খাদ্যাভাব এবং মানুষ-হাতি দ্বন্দ্বের কারণে বিশালাকার এই প্রাণীটি বাংলাদেশে বর্তমানে মহাবিপন্ন প্রজাতিতে পরিণত হয়েছে।

 

পরিবেশবিদ ও বন কর্মকর্তাদের মতে, হাতি ও এদের আবাসস্থল রক্ষা করা মানে কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রাণী নয়, বরং সার্বিকভাবে বনাঞ্চল, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশকে রক্ষা করা।

২০১৫ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে স্থায়ী বন্য হাতির সংখ্যা ২৬৮, পরিযায়ী হাতি ৯৩ এবং পোষা হাতি রয়েছে ৯৬।

২০২৭ সালের মধ্যে পুনরায় সারা দেশে হাতি জরিপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

বাংলাদেশে হাতি সংরক্ষণে ২০১৮ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত ১০ বছর মেয়াদি ‘বাংলাদেশ এলিফ্যান্ট কনজারভেশন অ্যাকশন প্ল্যান’ গ্রহণ করা হয়।

এতে ১১৮ কার্যক্রমের মধ্যে ৪০ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, ৪৩ মধ্যম এবং ৩৫টি নিম্ন অগ্রাধিকারভিত্তিক কার্যক্রম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

 

এলিফ্যান্ট কনজারভেশন অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ) আবু নাসর মোহাম্মদ ইয়াসিন নেওয়াজ।

 

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ১০ বছর মেয়াদি এই পরিকল্পনার মেয়াদ প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এলেও অর্থাভাবে ১০ শতাংশ কাজও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কেবল প্রকল্পনির্ভর হলে চলবে না। সরকারের পরিচালন ব্যয় (রাজস্ব বাজেট) থেকে রেগুলার কোডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট বরাদ্দ দিতে হবে। বর্তমানে বন বিভাগের ডিএফওদের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নিজস্ব কোনো স্থায়ী বাজেট কোড নেই। প্রজেক্ট এলে কাজ হয়, প্রজেক্ট শেষ হলে কাজও বন্ধ হয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, বন বিভাগ যে ইকোসিস্টেম সার্ভিস বা পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করছে, তা সরাসরি রাজস্ব আয়ে না দেখা গেলেও এর আর্থিক মান লাখো কোটি টাকার। তাই প্রকল্প প্রতিযোগিতায় না ফেলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নিয়মিত বাজেট বরাদ্দ দেওয়া জরুরি।

মৃত্যুমুখে হাতি ও মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব

বন বিভাগের বনাঞ্চল খণ্ডায়ন, বনের ভেতর অপরিকল্পিত উন্নয়ন, খাদ্যাভাব এবং অবৈধ অনুপ্রবেশের ফলে মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশাল দৈহিক কাঠামোর কারণে একটি হাতির প্রতিদিন ১৫০-২০০ কেজি লতাপাতা ও ৬০-৭০ কিলোমিটার চলাচলের প্রয়োজন হয়, যা বর্তমানে সংকুচিত হয়ে এসেছে।

চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, গুলি করে, মাইনে, অসুস্থতায় ও দুর্ঘটনায় অসংখ্য হাতির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কেবল ২০২৫ ও ২০২৬ সালেই বৈদ্যুতিক শক, গুলি ও শারীরিক নির্যাতনে মারা গেছে একাধিক হাতি।

অন্যদিকে ২০১১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত হাতির আক্রমণে ৩২২ জন মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ৩ হাজার ২১৫টি বাড়িঘর ও ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সময় ক্ষতিগ্রস্তদের সরকার ১৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়েছে।

শেরপুরের মধুটিলা রেঞ্জের এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের (ইআরটি) সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক জানান, তাদের এলাকাভিত্তিক ১০ সদস্যের একটি স্বেচ্ছাসেবী টিম হাতি লোকালয়ে এলে গ্রামবাসী ও হাতি, উভয়কেই সুরক্ষায় কাজ করে।

তিনি বলেন, হাতি বনের ভেতর খাবার ও পানি না পেয়ে বাধ্য হয়ে লোকালয়ে আসে। বনে পর্যাপ্ত বাঁশ, কলাগাছ ও জলাশয় খনন করলে এই দ্বন্দ্ব অনেক কমে যাবে। আমরা টর্চলাইট, বাঁশি ও হ্যান্ডমাইক নিয়ে স্বেচ্ছায় কাজ করলেও মাঠপর্যায়ে অবকাঠামোগত সহায়তার ঘাটতি রয়েছে।

বর্তমানে সারা দেশে মাত্র ২ জন ভেটেরিনারি সার্জন বা ডাক্তার দিয়ে বিশাল বন্যপ্রাণী চিকিৎসা চালানো হচ্ছে, যেখানে অন্তত ৫০ জন ডাক্তার প্রয়োজন। পাশাপাশি বন পর্যবেক্ষণ ও লজিস্টিক সাপোর্টের তীব্র ঘাটতি রয়েছে।

৩৯.৯৪ কোটি টাকার নতুন উদ্যোগ

সংকট মোকাবিলায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বন অধিদপ্তর ৩৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে একটি নতুন হাতি সংরক্ষণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নযোগ্য এ প্রকল্প চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট ও রংপুরের ১১ জেলায় কাজ করবে।

প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে, জলাধার খনন ৩০, ট্রি টাওয়ার ও সল্ট লিক স্থাপন; হাতির খাদ্য উপযোগী বাগান ও বাঁশ বাগান যথাক্রমে ৩৫০ হেক্টর ও ৫০ হেক্টর, ইকোলজিক্যাল বাউন্ডারি (বায়োফেন্সিং) ১০ কিলোমিটার, এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি) ১৫৯টি গঠন, সাফারি পার্কে দুটি এবং কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের প্রশিক্ষণ ৮শ জন।

সারা দেশে আবাসিক হাতির সংখ্যা প্রায় ২৬৮। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম দক্ষিণের বন বিভাগে হাতির সংখ্যা ৬৫, কক্সবাজার উত্তরে হাতির সংখ্যা ৫৪, কক্সবাজার দক্ষিণে সংখ্যা ৬৩, লামায় হাতির সংখ্যা ৩০, বান্দরবানে হাতির সংখ্যা ১১, পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণে হাতির সংখ্যা ২৮, পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তরে হাতির সংখ্যা ১৭টি।

অনাবাসিক হাতির সংখ্যা প্রায় ৯৩

ময়মনসিংহ বন বিভাগে হাতির সংখ্যা ৫১, সিলেট (মৌলভীবাজার) হাতির সংখ্যা সাত, সিলেট (সুনামগঞ্জ) হাতির সংখ্যা ৫, পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর (কাসালং) হাতির সংখ্যা ১৩, বান্দরবান হাতির সংখ্যা ১৭, আবদ্ধ হাতির সংখ্যা প্রায় ৯৬। এর মধ্যে ব্যক্তি মালিকানায় ৮২, সাফারি পার্কে ১১, চিড়িয়াখানায় ৩টি।

চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে হাতি মৃত্যুর তথ্য

(২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই)

বৈদ্যুতিক শকজনিত কারণে মৃত্যু ২০১৬ সালে তিন, গুলি করে হত্যা এক, অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যু এক, বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যু দুটি। ২০১৭ সালে বৈদ্যুতিক শকজনিত কারণে মৃত্যু একটি, মাইন বিস্ফোরণে মৃত্যু একটি, অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যু চার, দুর্ঘটনাজনিত কারণে মৃত্যু ৫টি।

২০১৮ সালে মাইন বিস্ফোরণে হাতির মৃত্যু এক, অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যু চার, দুর্ঘটনাজনিত কারণে মৃত্যু এক, বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যু একটি।

২০১৯ সালে বৈদ্যুতিক শকজনিত কারণে হাতির মৃত্যু ২টি, অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যু ৫টি, দুর্ঘটনাজনিত কারণে মৃত্যু ৩টি, বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যু একটি।

২০২০ সালে বৈদ্যুতিক শকজনিত কারণে হাতির মৃত্যু ৪, গুলি করে হত্যা ৩, অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যু ১০, প্রসবজনিত জটিলতায় মৃত্যু একটি, বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যু ২টি। ’২১ সালে বৈদ্যুতিক শকজনিত কারণে হাতির মৃত্যু ৬, গুলি করে হত্যা এক, অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যু ৪, দুর্ঘটনাজনিত কারণে মৃত্যু ৩, প্রসবজনিত জটিলতায় মৃত্যু এক, বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যু ২টি। ’২২ সালে বৈদ্যুতিক শকজনিত কারণে হাতির মৃত্যু ২, অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যু এক, বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যু এক, অজ্ঞাত কারণে মৃত্যু (মৃতদেহ ডিকম্পোজড থাকায়) ২টি। ’২৩ সালে বৈদ্যুতিক শকজনিত কারণে হাতির মৃত্যু এক, গুলি করে হত্যা এক, অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যু ৬, দুর্ঘটনাজনিত কারণে মৃত্যু ২টি, প্রসবজনিত জটিলতায় মৃত্যু এক, অজ্ঞাত কারণে মৃত্যু (মৃতদেহ ডিকম্পোজড থাকায়) এক। ’২৪ সালে অসুস্থতাজনিত কারণে হাতির মৃত্যু ৪টি, দুর্ঘটনাজনিত কারণে মৃত্যু এক, অজ্ঞাত কারণে মৃত্যু (মৃতদেহ ডিকম্পোজড থাকায়) ৭টি। ’২৫ সালে বৈদ্যুতিক শকজনিত কারণে হাতির মৃত্যু ৫টি, গুলি করে হত্যা এক, অবৈধভাবে শিকার/শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু এক, অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যু ৪টি, দুর্ঘটনাজনিত কারণে মৃত্যু ৪টি, প্রসবজনিত জটিলতায় মৃত্যু ২টি, বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যু এক, অজ্ঞাত কারণে মৃত্যু (মৃতদেহ ডিকম্পোজড থাকায়) একটি। ’২৬ সালে গুলি করে হাতি হত্যা করা হয় দুটি, অবৈধভাবে শিকার/শারীরিক নির্যাতনে একটি মৃত্যু, অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যু একটি, দুর্ঘটনাজনিত কারণে মৃত্যু একটি।

ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বনভূমির পরিবর্তিত ব্যবহার, বনের অভ্যন্তরে বনজ সম্পদ আহরণের জন্য মানুষের অবৈধ অনুপ্রবেশ, খাদ্যের সন্ধানে হাতির লোকালয়ে আসা, এগুলো হাতি ও মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করছে।

হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব সৃষ্টির সমীকরণ

ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বনভূমির পরিবর্তিত ব্যবহার, বনের অভ্যন্তরে বনজ সম্পদ আহরণের জন্য মানুষের অবৈধ অনুপ্রবেশ, খাদ্যের সন্ধানে হাতির লোকালয়ে আসা, এগুলো হাতি ও মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশ হাতি সংরক্ষণ কর্মপরিকল্পনা

হাতি-মানুষ দ্বন্দ্ব ও হাতির অবৈধ শিকার; আবাসস্থল ধ্বংস এবং খাদ্যের সংকট; আইনের প্রয়োগ এবং সুরক্ষা; গবেষণা এবং তার সুষ্ঠু প্রায়োগিক ব্যবস্থাপনা; প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং দক্ষতার উন্নয়ন; শিক্ষা, সচেতনতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা।

বাংলাদেশের হাতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে এই অ্যাকশন প্ল্যানে ৪০ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারভিত্তিক, ৪৩ মধ্য এবং ৩৫টি নিম্ন অগ্রাধিকারভিত্তিক কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।

বন্যহাতি দ্বারা ক্ষতিগ্রস্তদের প্রদত্ত ক্ষতিপূরণের পরিমাণ

২০১১-২০২৬ সাল পর্যন্ত বন্য হাতির আক্রমণে ৩২২ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া বাড়িঘর ও ফসলের ক্ষতি হয়েছে ৩ হাজার ২১৫টি। এতে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে ১৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

পরিবেশবিদদের মতে, সাময়িক প্রকল্পের পাশাপাশি সরকারের মূল বাজেটে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে স্থায়ী খাত সৃষ্টি না করলে বাংলাদেশে হাতি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।


   আরও সংবাদ