ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

বিপাকে শিক্ষামন্ত্রী!

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ১৫ জুলাই, ২০২৬ ১০:০৪ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৬ বার


বিপাকে শিক্ষামন্ত্রী!

আওয়ামী লীগ আমলে খোদ আওয়ামী লীগের নেতারাও স্বীকার করতেন, মন্ত্রী ছিলেন একজন—এহছানুল হক মিলন! পরীক্ষায় নকলকে কার্যত জাদুঘরে পাঠিয়ে তিনি দেশের মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। সেই সুফল পেয়েছিল গোটা প্রজন্ম।

আওয়ামী লীগের ‘আই অ্যাম জিপিএ ফাইভ’ যুগে অনেকেই আফসোস করে বলতেন, এহছানুল হক মিলন যদি থাকতেন!

 

অবশেষে বিএনপি ক্ষমতায় এলো। শিক্ষামন্ত্রীর চেয়ারে আবারও বসলেন সেই মিলন।

মানুষের মুখে রব উঠল, অবশেষে কাজের মানুষকে পাওয়া গেল! কিন্তু বিএনপি সরকারের চার-পাঁচ মাস না যেতেই সরকারের সবচেয়ে বিতর্কিত মন্ত্রীর নাম হয়ে উঠল এহছানুল হক মিলন। তার পদত্যাগের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন শিক্ষার্থীরা।

স্থবির হয়ে পড়েছে রাজধানী ঢাকা। ফিরে এসেছে সেই স্লোগান—‘স্টেপ ডাউন মিলন!’

 

ভারতে শিক্ষার্থীদের ‘তেলাপোকা’ বলে বিতর্কে পড়ে বড় বিপাকে পড়েছিল সরকার।

সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার বদলে যেন একই ভুল করলেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলে মন্তব্য করেন। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সড়কে নেমে আসেন। পরে সংসদ ভবনের দিকে অগ্রসর হয়ে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে।

 

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে সংঘটিত এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। এর ফলে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়, ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। অনেকের কাছে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনের স্মৃতি যেন আবার ফিরে আসে। ভারতের ‘ককরোচ পার্টি’র আদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হয় ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’।

গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বগুড়া এবং দেশের বিভিন্ন জেলা জলাবদ্ধতায় ডুবে যায়। ঠিক সেই সময় চলছিল এইচএসসি পরীক্ষা। বৃষ্টিতে ভিজে, হাঁটুপানি মাড়িয়ে, কাদামাখা পোশাকেই পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। অভিভাবক থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহলের নীতিনির্ধারকরা মত দেন, কয়েক দিনের জন্য পরীক্ষা পেছানো যেত। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে শিক্ষামন্ত্রী, পরীক্ষা যথাসময়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। ফলও হয় তেমনই।

কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের মাঠ হাঁটুপানিতে তলিয়ে যায়। পরীক্ষার্থীদের প্লাস্টিকের নৌকায় করে কেন্দ্রে যেতে হয়। বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজেও একই চিত্র দেখা যায়। ঢাকায় নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থীদের হাঁটুপানি মাড়িয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। এর মধ্যেই পদার্থবিজ্ঞান প্রশ্নপত্রে দুটি ভুল ধরা পড়ে। এত বড় দুর্যোগ ও ভোগান্তির মধ্যেও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড ছাড়া দেশের অন্য সব শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষা যথারীতি অনুষ্ঠিত হয়।

সমালোচনার মুখে অবশেষে সংসদে মুখ খুলেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়েছিল যে বৃষ্টি আর হবে না, তাই পরীক্ষা স্থগিত করা হয়নি। কিন্তু এই ব্যাখ্যা বিরোধী বেঞ্চেও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা প্রশ্ন তোলেন, শিক্ষার্থীরা যখন পরীক্ষা পেছানোর অনুরোধ জানিয়েছিল, তখন এইচএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা এক-দুদিন পিছিয়ে দিতে সমস্যা কোথায় ছিল?

চাপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা দেন, পদার্থবিজ্ঞানের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুল থাকায় ওই প্রশ্ন দুটির পূর্ণ নম্বর সবাই পাবেন। পাশাপাশি যেসব কেন্দ্রে বিশেষ সমস্যা হয়েছে, সেখানে প্রয়োজনে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থাও করা হবে। কিন্তু ততক্ষণে পরিস্থিতি অনেক দূর গড়িয়েছে। শিক্ষার্থীরা এই আশ্বাসে আর আস্থা রাখতে রাজি নন। তাদের অভিযোগ, এর আগেও মন্ত্রী একাধিক প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে তাদের দাবি আরও কঠোর হয়ে ওঠে—শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা, সব শিক্ষার্থীর জন্য পুনঃপরীক্ষা এবং পরদিনের পরীক্ষা অবিলম্বে স্থগিত করা।

এই দাবিকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের মিছিল গিয়ে পৌঁছে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে। অধিবেশন চলাকালে সংসদের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন শত শত শিক্ষার্থী। সেখানে ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান ধ্বনিত হয়। একপর্যায়ে তারা সংসদ ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন।

এই দৃশ্য অনেকের কাছেই ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাবলির কথা মনে করিয়ে দেয়। বিশ্লেষকদের শঙ্কা, দেশে আন্দোলনকে উসকে দেওয়ার মতো শক্তির অভাব নেই। একবার শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা বলা কঠিন। প্রশ্ন উঠেছে, সরকার যখন স্থিতিশীলতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে, তখন কেন এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? কেন এমন অবস্থার সৃষ্টি হলো, যাতে সরকার অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের মুখে পড়ল? ইতিহাস বলছে, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে অবহেলা করে কোনো সরকারই দীর্ঘমেয়াদে স্বস্তিতে থাকতে পারেনি।

সমালোচনা শুধু বিরোধী দল থেকেই আসেনি; এসেছে খোদ বিএনপির ভেতর থেকেও। বন্যাদুর্গত চট্টগ্রামে ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রশ্ন তোলেন, পরীক্ষা পিছিয়ে দিলে এমন কী ক্ষতি হতো? তার ভাষায়, ‘একজন কিশোর যদি বন্যার পানিতে পরীক্ষা দিতে যেতে গিয়ে প্রাণ হারায়, সেটি হবে অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা।’ নিজ দলের একজন জ্যেষ্ঠ নেতার মুখে এমন বক্তব্য পরিস্থিতির গভীরতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

এদিকে সরকার গোটা দেশকে একটি স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে যেতে চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) বলছে, দেশ ইতিবাচক স্থিতিশীলতার দিকে এগোচ্ছে। ঠিক এমন একটি সময়ে এই ঘটনাটি পুরো সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে। একদিকে চট্টগ্রাম তখনও বন্যাকবলিত, অন্যদিকে রাজধানীতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ—এই দুই পরিস্থিতির মধ্যে সরকার চাইলে শিক্ষার্থীদের প্রতি আরও মানবিক অবস্থান নিতে পারত। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী পরীক্ষা নির্ধারিত সময়েই নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। সেই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ও জনমতের মূল্য এখন সরকারকেই দিতে হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, এহছানুল হক মিলনের এই একগুঁয়েমি শেষ পর্যন্ত বিএনপি সরকারকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে। শেষ পর্যন্ত কি তাকে পদত্যাগই করতে হবে?


   আরও সংবাদ