ঢাকা, শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

কেপ ভার্দের রূপকথা থামিয়ে শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনা

স্পোর্টস ডেস্ক


প্রকাশ: ৪ জুলাই, ২০২৬ ০৯:৪১ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩৪ বার


কেপ ভার্দের রূপকথা থামিয়ে শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনা

পুরো গ্যালারিটাই ছিল আর্জেন্টিনার। কিন্তু বিশ্বকাপে অভিষেকেই ইতিহাস গড়া কেপ ভার্দে সহজে মাথা নোয়ানোর দল নয়; সেটি তারা প্রমাণ করল দারুণ লড়াই করেও।

নির্ধারিত সময়ের নাটক গড়াল অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে আবার এগিয়ে গিয়েও সমতায় ফিরল আফ্রিকার দলটি।

শেষ পর্যন্ত মেসির কর্নার থেকে আসা আত্মঘাতী গোলে স্বস্তির জয় নিয়ে শেষ ষোলোয় উঠল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

 

মায়ামিতে নকআউট পর্বের রোমাঞ্চকর ম্যাচে কেপ ভার্দেকে ৩-২ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা।

নির্ধারিত সময়ে ম্যাচ ছিল ১-১ সমতায়। আর্জেন্টিনার হয়ে গোল করেন মেসি ও লিসান্দ্রো মার্তিনেস।

অতিরিক্ত সময়ে মেসির কর্নার থেকে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর হেড দিনেই বোর্হেসের হাতে লেগে জালে জড়ালে সেটি আত্মঘাতী গোল হিসেবে ধরা হয়। কেপ ভার্দের হয়ে গোল করেন ডেরয় দুয়ার্তে ও সিডনি লোপেস কাবরাল।

 

শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ ছিল আর্জেন্টিনার কাছে। তবে কেপ ভার্দে নিজেদের গুটিয়ে রাখেনি। সুযোগ পেলেই আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করেছে তারা। নবম মিনিটে ডান দিক দিয়ে এগিয়ে ভেতরে ঢুকে শট নেন রায়ান মেন্দেস। তার প্রচেষ্টা প্রতিপক্ষের গায়ে লেগে সহজেই জমা পড়ে এমিলিয়ানো মার্তিনেসের হাতে।

প্রথম ভাগে বল বেশি পায়ে থাকলেও কেপ ভার্দে গোলরক্ষক ভোজিনহাকে বড় পরীক্ষায় ফেলতে পারছিল না আর্জেন্টিনা। ১৬তম মিনিটে প্রথমবার বিপজ্জনকভাবে দেখা দেন মেসি। বক্সে কঠিন কোণ থেকে শট নিলেও বল পোস্টের বাইরে দিয়ে যায়।

দুই মিনিট পর বক্সের বাইরে ভালো জায়গায় ফ্রি-কিক পায় আর্জেন্টিনা। মেসিকে ফাউল করেন কাবরাল, যদিও রিপ্লেতে কেপ ভার্দের খেলোয়াড়ের কিছুটা দুর্ভাগ্যই মনে হয়েছে। ২৫ গজ দূর থেকে মেসির নেওয়া ফ্রি-কিক সরাসরি চলে যায় ভোজিনহার হাতে।

২২তম মিনিটের দিকে গ্যালারিতে শিস শোনা যায়, যখন কেপ ভার্দে নিজেদের মধ্যে বল ঘুরিয়ে আত্মবিশ্বাস দেখাচ্ছিল। তারা ভয় না পেয়ে খেলছিল, আক্রমণেও উঠছিল সুযোগ পেলেই। ২৫তম মিনিটে ডান দিক থেকে রদ্রিগো দে পলের ক্রস হেডে পরিষ্কার করেন বোর্হেস। এরপরই হয় হাইড্রেশন ব্রেক।

ব্রেকের পরই আসে মেসির মুহূর্ত। ২৯তম মিনিটে নিজেদের অর্ধ থেকে দারুণ লম্বা পাস বাড়ান লিসান্দ্রো মার্তিনেস। মেসির দৌড় মেপে দেওয়া সেই বল বক্সে পেয়ে বাইরের পায়ের ছোঁয়ায় নিয়ন্ত্রণে নেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। এরপর এগিয়ে আসা ভোজিনহার ওপর দিয়ে বল তুলে জালে পাঠান তিনি।

চলতি বিশ্বকাপে তার গোল হলো সাতটি। গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও সবার ওপরে উঠে যান আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে টানা আট ম্যাচে গোল করার কীর্তিও গড়েন তিনি।

গোল হজমের পরও ভেঙে পড়েনি কেপ ভার্দে। ৩৯তম মিনিটে ডান দিক দিয়ে আক্রমণে যাওয়ার পর মোরেইরার শেষ বলটি না হলো ক্রস, না হলো শট। শেষ পর্যন্ত সেটি গোল কিক হয়ে যায়। কয়েকবার সুন্দরভাবে বল এগিয়ে নিলেও ভালো ফিনিশিংয়ের অভাবে এমিলিয়ানো মার্তিনেসকে তেমন কোনো পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি তারা।

প্রথমার্ধের শেষ দিকে আবার আক্রমণে ওঠে আর্জেন্টিনা। যোগ করা সময়ের শুরুতে লাউতারো মার্তিনেস বল ছেড়ে দেন এনসো ফের্নান্দেসের দিকে। বক্সের বাইরে থেকে তার শট ভালো হলেও নিচু হয়ে বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে সেটি ঠেকিয়ে দেন ভোজিনহা।

বিরতির পর শুরুটা ছিল কিছুটা ধীর। বরং কেপ ভার্দে বল পায়ে আগের চেয়ে বেশি সময় কাটাতে থাকে। ৫৩তম মিনিটে প্রথমবার পরীক্ষায় পড়েন এমিলিয়ানো মার্তিনেস। বক্সের বাইরে থেকে দুয়ার্তের শট নিচু হয়ে বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে ঠেকান আর্জেন্টিনা গোলরক্ষক।

৬ মিনিট পরই মায়ামিতে স্তব্ধতা নামিয়ে আনে কেপ ভার্দে। ডান দিক দিয়ে বল নিয়ে বক্সে ঢোকেন রায়ান মেন্দেস। তার পাস পেয়ে দুরহ কোণ থেকে ডান পায়ের শটে বল জালে পাঠান ডেরয় দুয়ার্তে। লিসান্দ্রো মার্তিনেসের পায়ের ফাঁক গলে বল চলে যায় এমিলিয়ানোর পাশ দিয়ে। গ্যালারির এক কোণে থাকা কেপ ভার্দে সমর্থকরা তখন উল্লাসে ফেটে পড়েন।

গোল হজমের পর দ্রুত পরিবর্তন আনে আর্জেন্টিনা। লাউতারোর বদলে নামেন হুলিয়ান আলভারেস, থিয়াগো আলমাদার জায়গায় আসেন নিকো গনসালেস। এরপরও কাঙ্ক্ষিত ছন্দ খুঁজে পেতে কষ্ট হচ্ছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।

৬৫তম মিনিটে আবারও আর্জেন্টিনার ত্রাতা হয়ে ওঠেন ভোজিনহা। বক্সে মেসির শট শরীর বড় করে ঠেকিয়ে দেন কেপ ভার্দে গোলরক্ষক। কিছুক্ষণ পর কেভিন পিনা হলুদ কার্ড দেখেন। ৭০তম মিনিটে দূরপাল্লার ফ্রি-কিক নেন মেসি, কিন্তু বল কেপ ভার্দের রক্ষণদেয়ালে লেগে ফিরে আসে।

৭৩তম মিনিটে বক্সের ঠিক বাইরে বিপজ্জনক জায়গায় আবার ফ্রি-কিক পায় আর্জেন্টিনা। মেসি দ্রুত শটে ভোজিনহাকে চমকে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু গোলরক্ষক সতর্ক ছিলেন। দ্রুত সরে গিয়ে দারুণ সেভে বল ঠেকিয়ে দেন তিনি।

শেষ দিকে কেপ ভার্দে কার্যত দেয়াল তুলে দাঁড়ায়। ৮২তম মিনিটে লোপেসের দারুণ সেভে নিশ্চিত গোল থেকে বঞ্চিত হয় আর্জেন্টিনা। তার কাটব্যাক ঠেকানো না গেলে ফাঁকা জালে বল পাঠানোর অপেক্ষায় ছিলেন এনসো ফের্নান্দেস।

৮৪তম মিনিটে রদ্রিগো দে পলের বদলে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে নামায় আর্জেন্টিনা। দুই মিনিট পর ক্র্যাম্পে ভুগতে থাকা ফাকুন্দো মেদিনার বদলে নামেন নিকোলাস তাগলিয়াফিকো। 

যোগ করা সময় ছিল আট মিনিট। নির্ধারিত সময়ের পর লোপেসের হাতে বল লাগার দাবি উঠলেও রেফারি সাড়া দেননি। কিছুক্ষণ পর দূর থেকে শট নেন পারেদেস, কিন্তু সেটি সরাসরি জমা পড়ে ভোজিনহার হাতে। যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে আবার ফ্রি-কিক আদায় করেন মেসি। তার জোরাল শট ডিফ্লেক্ট হয়ে ভোজিনহাকে প্রায় বিপদে ফেলেছিল, তবে দ্রুত প্রতিক্রিয়ায় সেটিও সামলে নেন কেপ ভার্দে গোলরক্ষক।

শেষ মুহূর্তে দুই দলই জয়সূচক গোলের খোঁজে মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু আর গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

অতিরিক্ত সময় শুরু হতেই আবার এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ৯২তম মিনিটে কর্নার থেকে আসা বলে আলেক্সিস মাক আলিস্তারের হেড পাস পেয়ে দূরের পোস্টে নিয়ন্ত্রণ নেন লিসান্দ্রো মার্তিনেস। এরপর বাঁ পায়ের দারুণ শটে বল পাঠান টপ কর্নারে। ভোজিনহার কিছুই করার ছিল না।

আর্জেন্টিনার সেই গোলের পর আবারও কঠিন সমীকরণে পড়ে কেপ ভার্দে। তারা টানা দুই কর্নার আদায় করলেও এমিলিয়ানোকে পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি। শ মিনিটে আরও দুই পরিবর্তন আনে আফ্রিকান দলটি। ডেরয় দুয়ার্তে ও কেভিন পিনার বদলে নামেন ইয়ানিক সেমেদো ও জিলসন বেঞ্চিমল।

১০৪তম মিনিটে আবারও বিস্ময় জাগায় কেপ ভার্দে। বাম দিক থেকে বল পেয়ে ভেতরে কাট করেন সিডনি লোপেস কাবরাল। এরপর ডান পায়ের দুর্দান্ত কার্লিং শটে বল পাঠান টপ কর্নারে। এমিলিয়ানো মার্তিনেসের ঝাঁপ দেওয়ারও সুযোগ ছিল না। গোলটি ছিল চলতি আসরের অন্যতম সেরার একটি।

সমতায় ফেরার পর কাবরাল ছুটে যান গ্যালারির দিকে, উদ্‌যাপন করেন বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে। অন্যদিকে একটু আগেও যে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের গানে-লাফে কাঁপছিল মায়ামি স্টেডিয়াম, সেখানে নেমে আসে স্তব্ধতা।

অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে আবারও চাপ বাড়ায় আর্জেন্টিনা। ১০৯তম মিনিটে ডান দিক থেকে মেসির ফ্রি-কিক বক্সে এলে কেপ ভার্দে রক্ষণ সেটি সামলে নেয়। পাল্টা আক্রমণে উঠে দূরপাল্লার শট নেন সেমেদো, তবে তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।

১১১তম মিনিটে ঘুরে যায় ম্যাচের মোড়। মেসির কর্নারে বক্সে লাফিয়ে হেড নেন ক্রিস্তিয়ান রোমেরো। বল বোর্হেসের হাতে লেগে দিক বদলে জালে জড়ায়। ভোজিনহা দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া আর কিছু করতে পারেননি। আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মঘাতী গোল হলেও আর্জেন্টিনাকে আবার এগিয়ে দেওয়ার পেছনে অবদান ছিল মেসির নিখুঁত কর্নার ও রোমেরোর হেড।

শেষ দিকে আরেকবার প্রাণপণ চেষ্টা করে কেপ ভার্দে। ১১৭তম মিনিটে প্রায় একই জায়গা থেকে ফ্রি-কিক নেন লোপেস কাবরাল, যেখান থেকে কিছুক্ষণ আগে তিনি অসাধারণ গোল করেছিলেন। এবার তার শট ছিল কিছুটা মাঝ বরাবর, তবে এমিলিয়ানো মার্তিনেসকে এক হাতে ঝাঁপিয়ে বল বাইরে পাঠাতে হয়।

যোগ করা সময়ে আবারও আর্জেন্টিনার গোলমুখে ভয় ছড়ায় কেপ ভার্দে। পাওলো বল জালে ঠেলে দেওয়ার আগেই সাহসীভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেটি থামান এমিলিয়ানো। শেষ তিন মিনিটে এন্ড-টু-এন্ড ফুটবলে কেপ ভার্দে সবকিছু ঢেলে দেয়, আর তাদের পেছনের ফাঁকা জায়গা কাজে লাগাতে চায় আর্জেন্টিনা। তবে আর গোল হয়নি।

শেষ বাঁশি বাজতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আর্জেন্টিনা। নিশ্চিত করে শেষ ষোলো। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ আগের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো মিসর।

কেপ ভার্দের অবিশ্বাস্য বিশ্বকাপ-যাত্রা শেষ হলো মাথা উঁচু করেই। অভিষেক আসরে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ার এই লড়াই তাদের ফুটবল ইতিহাসে আলাদা জায়গা নিয়েই থাকবে।


   আরও সংবাদ